লোডশেডিংয়ে গ্রামাঞ্চলে তীব্র অসন্তোষ, চাপে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীরা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকটের প্রায় পুরো চাপই গিয়ে পড়ছে গ্রামাঞ্চলের ওপর। জাতীয় গ্রিডের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। এতে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গ্রাহক অসন্তোষের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা। বিভিন্ন জেলায় কর্মীদের মারধর, অবরুদ্ধ ও হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। হামলা ও ভাঙচুর করা হচ্ছে উপকেন্দ্র ও কার্যালয়।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জুন রাত আটটায় সারা দেশে যখন ২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হচ্ছিল, তার মধ্যে ২ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটই ছিল আরইবির আওতাধীন এলাকায়। অর্থাৎ ওই সময়ে দেশের মোট বিদ্যুৎ-ঘাটতির প্রায় ৯৬ শতাংশই সইতে হয়েছে গ্রামাঞ্চলের মানুষের।

লোডশেডিংয়ের কারণে মাঠপর্যায়ে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তুলে ধরে গত ২৮ জুন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে আরইবি। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো কোনো এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। এর জেরে দেশের অন্তত ১০টি জেলার ১৪টি স্থানে উপকেন্দ্রে হামলা, দায়িত্বরত কর্মীদের মারধর, অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুরের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।

গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পল্লী বিদ্যুতের কার্যালয় ও কর্মীদের ওপর হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২৩ জুন অতিরিক্ত বিল ও লোডশেডিংয়ের জেরে ক্ষুব্ধ একদল যুবক চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের চির্কা উপকেন্দ্রে প্রবেশ করে লাইনম্যান মো. ইব্রাহিমকে মারধর করেন। এরপর তাঁরা মো. আবদুল কাদের নামের আরেক লাইনম্যানকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে উত্তর ধানুয়া গ্রামে আটকে রেখে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।

গত ২৮ জুন সকালে ফুটবল বিশ্বকাপ ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা আঞ্চলিক কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। কেন্দুয়া পল্লী বিদ্যুতের উপমহাব্যবস্থাপক মো. ওমর ফারুক জানান, সে সময় উপজেলায় ২৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ৭ মেগাওয়াট। ফলে আটটি ফিডারের মধ্যে মাত্র দুটি চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল।

একই দিন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে ঢুকে কর্মরত লাইনম্যানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৩৩ কেভি অটোমেটিক সার্কিট রিক্লোজার বন্ধ করে দেয় একদল লোক। এতে কিছুক্ষণের জন্য পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। শেরপুরে প্রতিদিন ৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৫ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়ায় পালাক্রমে লোডশেডিং করা হচ্ছে। বিশ্বকাপ চলাকালে বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনে হুমকির মুখে রাখছেন। নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়েছে সমিতি কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, শহর ও গ্রামের মধ্যে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য সহনীয় করতে হবে। অন্যথা মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যরাতে বাড়ে সংকট

পিজিসিবির হিসাব বলছে, গত কয়েকদিনে মধ্যরাত থেকে শুরু করে ভোররাত পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। গত ২৮ জুন রাত ২টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ৭৩ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট। গত ২৯ জুন রাত ২টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ৪৫৪ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট। তবে গতকাল রাত থেকে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। ফলে লোডশেডিং কমেছে।

পিডিবি-র উৎপাদনে দায়িত্বরত সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, সাধারণত মধ্যরাতের পর কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় চাহিদা কমার কথা থাকলেও ইজিবাইক চার্জ দেওয়ার কারণে চাহিদা বাড়ছে।

গত রোববার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বয়লারের টিউবে লিকেজ সমস্যায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় প্রায় ৩০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কমে গেছে। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে এবং ঢাকাতেও লোডশেডিং হবে।

তিনি আরও বলেন, আগামী দুইদিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক হলে লোডশেডিংয়ের মাত্রাও কমে আসবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত