পাবনায় শিশু ধর্ষণের পর হত্যা: পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, বিতর্কিত মন্তব্যে ক্ষোভ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
পাবনা

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ২৯
পাবনায় শিশু ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে ভাঙচুর, পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ। ছবি: সংগৃহীত
পাবনায় শিশু ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে ভাঙচুর, পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ। ছবি: সংগৃহীত

পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি কুলুনিয়া গ্রামে ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এলাকাবাসী এখনো বিক্ষুদ্ধ। ক্ষোভের জের ধরে ইতোমধ্যে শনিবার সকাল পর্যন্ত অভিযুক্ত প্রধান আসামি মোস্তফা কামালের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে তারা।

একই সঙ্গে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, অভিযোগ নিতে অর্থ গ্রহণ এবং নিহত শিশুকে নিয়ে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তার বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ নিহত শিশুর শারীরিক গঠন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন জানিয়ে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

শিশুটির স্বজন ও স্থানীয়রা জানায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বাড়ির কাছাকাছি জায়গা থেকে নিখোঁজ হয় ১০ বছর বয়সী কলি। পরিবারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পাবনা সদর থানায় অভিযোগ জানানো হলেও, পুলিশ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। নিখোঁজের পর টানা পাঁচ দিন পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রতিকার না পেয়ে বাধ্য হয়ে স্বজন ও এলাকাবাসী পাবনা শহরের আব্দুল হামিদ সড়কে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনের পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। অবশেষে নিখোঁজের সপ্তম দিনে, ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে শিশু কলির বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার পর গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে, মরদেহ উদ্ধারের দিনই জড়িত সন্দেহে প্রতিবেশী মোস্তফা কামাল ও ইয়াছিনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান জেলা পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ। আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যা ও ধর্ষণের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলেও জানান তিনি। এসব তথ্য জানানোর সময় পুলিশের এই কর্মকর্তা শিশুটির চেহারা এবং শারীরিক গঠন নিয়েও মন্তব্য করেন।

জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য মন্তব্য করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীরা।

নিহত কলির বাবা কামাল প্রামাণিকের ভাষ্য, সন্তান নিখোঁজের পর পুলিশ সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। উল্টো মামলা দায়ের ও তদন্তের নামে তাদের কাছ থেকে দফায় দফায় ঘুষ নেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মরদেহ উদ্ধারের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার নিহত শিশুর শারীরিক গঠন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন।

অভিযুক্ত মোস্তফা কামালের বাড়িতে তাণ্ডবের সময় পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারিকুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, ঘটনার সময় উত্তেজিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে ওসি তারিকুল ইসলাম বলছেন, “এখন আগুন দিয়েন না। পুলিশ তো এখানে বছর ভরে থাকবে না। আমরা চলে যাওয়ার পর যা ইচ্ছা কইরেন।”

বক্তব্য জানতে চাইলে পাবনা সদর থানার ওসি মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি। কোনোভাবেই তাদের নিবৃত্ত করা যায়নি।”

আগুন দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, ‘বিব্রতকর প্রশ্ন করবেন না’ মন্তব্য করে ফোন কেটে দেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।

শিশু কলি নিখোঁজের পর থেকে প্রধান আসামির বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা। হিউম্যান রাইটস এন্ড ডিফেন্ডার- পাবনা জেলা শাখার সদস্য সচিব আব্দুর রব মন্টু বলেন, ‘পুরো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তেমন সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়নি। মানববন্ধনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের পর শিশুটির মরদেহ উদ্ধার হয়। অভিযুক্তের বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় ওসি যে মন্তব্য করেছেন সেটি নিবৃত্ত করার পরিবর্তে উসকে দেওয়ার মত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবার সংবাদ সম্মেলনে এসপি সাহেব যে মন্তব্য করেছেন সেটিও আপত্তিকর। ওরকম একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে একটি শিশুর দৈহিক গঠন নিয়ে এভাবে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। বক্তব্য দেবার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আরো সচেতন ও সতর্ক থাকা উচিত।’

এদিকে শিশুটির পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে জেলা পুলিশ। পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ দাবি করেছেন, একটি সম্পূর্ণ ‘ক্লুলেস’ হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুততম সময়ে উন্মোচন এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

পুলিশ সুপার বলেন, “মামলা নেওয়ার জন্য যদি কোনো পুলিশ সদস্য টাকা নিয়ে থাকে তবে সেটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর সংবাদ সম্মেলনে যে মন্তব্য করেছি, সেটি কাউকে আঘাত করতে করা হয়নি। যদি কেউ এ নিয়ে আঘাত পান তবে সেটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।”

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত