ad

শরৎচন্দ্রের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী/শরৎসাহিত্য কীভাবে পড়ব, কেন পড়ব

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ১৬
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী আমাদের সামনে একই সঙ্গে দুটি প্রশ্ন উপস্থিত করে। এক. এত দূরের একটি সময়ের জীবন, সমাজ ও মানুষকে ধারণ করে লেখা শরৎসাহিত্যকে আজ কীভাবে পড়ব, এবং দুই. আমাদের সময়ের পাঠককে কেনই বা শরৎসাহিত্যকে নতুন ভাবনায় পড়তে হবে? এই দুটি প্রশ্নের উত্তর আলাদা কোনো পথে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ শরৎচন্দ্রকে পড়ার পদ্ধতির মধ্যেই তাঁর সাহিত্যিক উপযোগিতার কারণটি নিহিত।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকর্মকে যদি কেবল অতীতের একটি নির্দিষ্ট সমাজের বয়ান হিসেবে পড়া হয়, তাহলে তার ঐতিহাসিক মূল্য ধরা পড়লেও অন্তর্নিহিত ব্যক্তির মানবিক অভিঘাতের অনুরণন সহজে অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। আবার যদি তাঁকে আমাদের সময়ের লেখক করে তোলার জন্য সমকালীনতার ছাঁচে জোর করে বসানো হয়, তাহলে তাঁর সময়ের স্বাতন্ত্র্য এবং সীমাবদ্ধতা উভয়ই আড়াল হয়ে যায়। ফলে শরৎচন্দ্রের যথার্থ পাঠ শুরু হতে পারে এমন একটি দূরত্ব থেকে, যেখানে তাঁর সময়কে তাঁর নিজস্ব সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বোঝা হবে এবং সেই বাস্তবতার ভেতর দিয়ে নির্মিত মানুষের সংকটের সঙ্গে আমাদের বর্তমানের সম্পর্কটিও অনুসন্ধান করা সহজসাধ্য হবে।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে এইভাবে পড়তে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে তাঁর মানুষের প্রতি দৃষ্টির কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তিনি সামাজিক পরিচয়ে আবদ্ধ যেসমস্ত মানুষের অবয়ব উন্মোচন করেন তাদের কেউ বিধবা, কেউ চরিত্রহীন, কেউ অবাধ্য, কেউ দরিদ্র, কেউ পতিতা, কিংবা কেউ অসামাজিক কিন্তু সমাজের দেওয়া পরিচয়টিকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নিলে সেই নামের নিচে চাপা পড়ে থাকা মানুষগুলো ভয়, আকাঙ্ক্ষা, অপমান, ভালোবাসা, আত্মমর্যাদা ও সিদ্ধান্তের অন্তর্গত দ্বন্দ্বসমেতই একান্ত পরিপূর্ণ মানুষ। বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি সাপেক্ষেও মানুষ দেখার এই অন্তর্দৃষ্টি কার্যকর। কারণ এই একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে এসেও মানুষ মূল্যায়িত হচ্ছে একটি অভিযোগ, একটি পরিচয়, একটি সম্পর্ক কিংবা একটি সামাজিক ঘটনার ভিত্তিতে। ফলে তাদের বহুমাত্রিক অস্তিত্ব, শ্রম, মেধা এবং দীর্ঘদিনের অর্জন সামাজিক বিচারের কাছে গৌণ হয়ে পড়ছে। আর এই জায়গা থেকেই সমাজকেও শরৎচন্দ্রের সাহিত্য নতুনভাবে চেনায়।

সমাজ শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাসের এমন একটি সক্রিয় শক্তি, যা মানুষের ইচ্ছা, সম্পর্ক, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। তাঁর পল্লীসমাজ উপন্যাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই সমাজের মানুষগুলোর শিক্ষা, সংস্কারবোধ কিংবা উন্নতিসাধনের ইচ্ছা তখনই কার্যকর হয়ে উঠছে, যখন তা স্থানীয় সামাজিক ক্ষমতার অনুমোদন পায়। ফলে উপন্যাসটি দেখায় ব্যক্তিগত সদিচ্ছার সঙ্গে পল্লিসমাজের প্রচলিত ক্ষমতা, স্বার্থ ও মানসিকতার সংঘর্ষ।

তিনি সামাজিক পরিচয়ে আবদ্ধ যেসমস্ত মানুষের অবয়ব উন্মোচন করেন তাদের কেউ বিধবা, কেউ চরিত্রহীন, কেউ অবাধ্য, কেউ দরিদ্র, কেউ পতিতা, কিংবা কেউ অসামাজিক কিন্তু সমাজের দেওয়া পরিচয়টিকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নিলে সেই নামের নিচে চাপা পড়ে থাকা মানুষগুলো ভয়, আকাঙ্ক্ষা, অপমান, ভালোবাসা, আত্মমর্যাদা ও সিদ্ধান্তের অন্তর্গত দ্বন্দ্বসমেতই একান্ত পরিপূর্ণ মানুষ।

এই দৃষ্টি থেকে শরৎচন্দ্রের সমাজ ধারণাটিকে আরও গভীরভাবে বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করা যায়। বর্তমানে আমরা এমন এক সামাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি যেখানে প্রতিনিয়ত যেকোনো কিছুর পুরস্কার বা শাস্তি কোনো সাংগঠনিক পদ্ধতিতে না হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার অনুমোদন, গুজব, অপবাদ, চরিত্রহনন, সামাজিক বর্জন কিংবা জনমতের প্রত্যাশার চাপের মধ্য দিয়ে হচ্ছে। লঘু অপরাধেও ব্যক্তিকে এমনভাবে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, যেখানে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠার সুযোগটুকুও থাকে না। যদিও শরতের সময়ের সঙ্গে আজকের মিডিয়া ট্রায়াল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনবিচারের সরাসরি ঐতিহাসিক সমতা টানা ঠিক হবে না, কারণ প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা ও সামাজিক পরিসর সম্পূর্ণ ভিন্ন; কিন্তু তারপরও ভাইরাল হওয়া থেকে সেলিব্রিটি, অভিযোগ থেকে গুজব, গুজব থেকে জনমত এবং জনমত থেকে সামাজিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যে মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, তার একটি পুরোনো রূপ শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে দৃশ্যমান ছিল এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। এই দৃষ্টিতে চরিত্রহীন-এর মতো উপন্যাসকে দেখলে এর কাহিনি তখন আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় বলে মনে হবে না বরং চরিত্র নামক সামাজিক নির্মাণটি কীভাবে একজন নারীর অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নারীচরিত্রের ক্ষেত্রে এই শরৎপাঠ আরও সূক্ষ্ম বিচারিক বোধ তৈরি করে, কারণ শরৎচন্দ্র নারীর ওপর আরোপিত সামাজিক বিধিনিষেধের বিপরীতের জীবনকে গভীর মানবিকতায় চিত্ররূপ দিলেও তাঁর সমস্ত নারীচিন্তাকে সমকালোত্তীর্ণ বলে গ্রহণ করার কোনো যুক্তি থাকে না। কারণ তাঁর নারীচরিত্রের মধ্যে আত্মমর্যাদা, প্রেম, যৌনতা, স্বাধীন ইচ্ছা ও সামাজিক প্রতিবাদের শক্তি যেমন আছে, তেমনি কোথাও কোথাও তাঁর সময়ের পিতৃতান্ত্রিক নৈতিকতার সীমারেখায় নারী নিজেও নিষ্ক্রিয়। উদাহরণ হিসেবে দেবদাসের পার্বতী, কিংবা শ্রীকান্তের রাজলক্ষ্মীকে উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু এও সত্য তার সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলোই প্রচলিত অর্থে নারীর স্বতন্ত্র ইচ্ছা ও প্রশ্নকে সামনে আনে। তাদের ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলে। তাই শ্রীকান্ত উপন্যাসে অভয়া যখন প্রশ্ন করে, 'আপনি নিজে কি আমাদের অশ্রদ্ধার চক্ষে দেখবেন শ্রীকান্তবাবু?' তখন সেই প্রশ্ন কেবল একজন ব্যক্তির উদ্দেশে না হয়ে সমাজের ওপর আরোপিত হয়ে পাঠকের নৈতিক অবস্থানকেও বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বোঝায় কিরণময়ীকে চরিত্রহীন বলে শেষ করে দেওয়া যায় না; রাজলক্ষ্মীকে শুধু পতিতা বলে বিচার করা যায় না, অভয়াকে শুধু স্বামীত্যাগী নারী বলে আলাদা করা যায় না। চরিত্রগুলো আমাদের বাধ্য করে ভাবতে 'কোন নৈতিকতার ভিত্তিতে আমরা একজন নারীর জীবনকে মূল্যায়ন করি, এবং সেই নৈতিকতার নির্মাতা ও সুবিধাভোগী কারা।'

শরৎচন্দ্রকে পড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো মানুষের নৈতিক সংকটকে তার বস্তুগত অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন না করে তাকে শেকড় অনুযায়ী মূল্যায়ন করার পদ্ধতি শেখা। কারণ তাঁর সাহিত্যে অর্থনৈতিক ক্ষমতা, জমিদারি, সম্পত্তি, ঋণ, দারিদ্র্য ও সামাজিক মর্যাদা মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতর পর্যন্ত প্রবেশ করে এবং অনেক সময় সেগুলো ব্যক্তির নৈতিক সিদ্ধান্তকেও নিয়ন্ত্রণ করে। দেনা-পাওনায় জমিদার জীবনানন্দ চৌধুরীর আবির্ভাবের সঙ্গে যে আতঙ্ক ও অত্যাচারের পরিবেশ তৈরি হয়, তা দেখায় ক্ষমতা কেবল ব্যক্তির চরিত্রের কোনো নেতিবাচক গুণ নয়; জমি, অর্থ ও সামাজিক কর্তৃত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ যখন একজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন সেই ক্ষমতা অন্য মানুষের জীবনযাপন, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার বাস্তব শক্তিতে পরিণত হয়। ষোড়শীর অবস্থান তাই সেই অসম ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যেই বিচার্য হওয়া উচিত। কারণ তাতেই বোঝা যায় শরৎচন্দ্রের মানবিকতার গভীরে সামাজিক অর্থনীতির যে চাপ কাজ করে, তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

শরৎ পাঠ আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন এই পাঠ দেখায় আধুনিক সমাজে ক্ষমতার রূপ বদলালেও অর্থনৈতিক অসমতা এখনো মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও আত্মমর্যাদাকে পদদলিত করতে পারেনি। একই কারণে মহেশ গল্পের গফুর কিংবা অভাগীর স্বর্গ গল্পটি পড়ার সময় দারিদ্র্যকে কেবল করুণার বিষয় হিসেবে দেখলে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক শক্তি অনেকটাই ম্লান হয়। তাদের দেখতে হয় কীভাবে অর্থনৈতিক বঞ্চনা তাদের ইচ্ছাকে সংকুচিত করেছে, সামাজিক মর্যাদাহীনতা তাদের কণ্ঠকে দুর্বল করেছে এবং ক্ষমতাবান সামাজিক কাঠামো তাদের দুর্দশাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মূলত শরৎচন্দ্রের বাস্তববাদ এখানেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ যে তিনি প্রান্তিক মানুষের দুঃখকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ না করে, তাদের দৈনন্দিন জীবন, ক্ষুধা, অপমান, সম্পর্ক ও আত্মমর্যাদার ভেতর দিয়ে সেই বঞ্চনাকে অনুভবযোগ্য করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। ফলে আজ তাঁর সাহিত্য পড়ার অর্থ দারিদ্র্যের পুরোনো ছবি দেখে আবেগপ্রবণ হওয়ার চেয়ে একজন মানুষের দুর্দশার কতটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল এবং কতটা এমন সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল এই প্রশ্ন জাগ্রত করে।

তবে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে কেবল সমাজসংস্কারের ভাষ্যে সীমাবদ্ধ করলেও তাঁর শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর অদৃশ্য হয়ে যায়, কারণ তাঁর মানুষের সংকট বাইরের সামাজিক বিধিনিষেধের পাশাপাশি ভেতরের মনোজগতেও ক্রিয়াশীল; ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ, ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণতা, আত্মসম্মান ও ভালোবাসার সংঘর্ষ তাঁর চরিত্রদের সিদ্ধান্তকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে কোনো চরিত্রকে শুধুমাত্র তার সামাজিক অবস্থান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না।

শরৎ পাঠ আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন এই পাঠ দেখায় আধুনিক সমাজে ক্ষমতার রূপ বদলালেও অর্থনৈতিক অসমতা এখনো মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও আত্মমর্যাদাকে পদদলিত করতে পারেনি। একই কারণে মহেশ গল্পের গফুর কিংবা অভাগীর স্বর্গ গল্পটি পড়ার সময় দারিদ্র্যকে কেবল করুণার বিষয় হিসেবে দেখলে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক শক্তি অনেকটাই ম্লান হয়।

দেবদাস, গৃহদাহ কিংবা শ্রীকান্ত উপন্যাসের চরিত্রগুলোতে এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব থেকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ অনেক সময় নিজের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে না পেরে, সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে নিজের ইচ্ছার সংঘর্ষ সামলাতে না পেরে কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে নিজের ভেতরের দ্বিধার কাছে পরাজিত হয়ে এমন জীবন বেছে নেয়, যা পরবর্তীকালে তার নিজের কাছেই অসহনীয় হয়ে ওঠে। তাই শরৎসাহিত্য পড়তে হবে চরিত্রের মানসিক প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করে, কারণ এই পদ্ধতি আমাদের শেখায় যে মানুষের আচরণকে নৈতিক রায়ে পরিণত করার আগে তার অন্তর্গত দ্বন্দ্বের ভাষা শুনতে হয়।

এই জায়গায় এসে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য পাঠের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্নও যুক্ত হয়। প্রশ্নটি হচ্ছে, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেই কি কোনো আচরণ নৈতিক, আর সমাজের চোখে প্রত্যাখ্যাত হলেই কি সেই মানুষ নৈতিকভাবে নিকৃষ্ট? শরৎচন্দ্রের বহু চরিত্র এই সরল সমীকরণকে অস্বস্তিকর করে তোলে, কারণ যাদের সমাজ সন্দেহ করে তাদের মধ্যে মানবিক সততা থাকতে পারে এবং যারা সামাজিক মর্যাদার অধিকারী তাদের আচরণের ভেতরেই থাকতে পারে নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা কিংবা ভণ্ডামি। এই বৈপরীত্যকে কেন্দ্র করে পড়লে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য আজকের দ্রুতগতির জনমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক রায় এবং পরিচয়ভিত্তিক বিচারসংস্কৃতির বিষয়গুলোর নেপথ্য ক্ষমতা উন্মোচন করে।

শরৎসাহিত্য পাঠ কেমন হতে পারে-এ প্রশ্নের উত্তরে আরও একটি প্রসঙ্গ না বললেই নয়। সমকালীন পাঠের ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্রকে একজন আধুনিক বা উত্তরাধুনিক লেখক প্রমাণ করার চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। কারণ তাঁর রচনার ভেতরে থাকা বহু কণ্ঠ, নীরবতা, ক্ষমতার সম্পর্ক ও অনির্দিষ্ট নৈতিক অবস্থানগুলো দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত হয়ে বর্তমানেও এগুলো প্রাসঙ্গিকই আছে। কে কথা বলছে, কে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না, কার ইচ্ছা সামাজিক নিয়মে দমন হচ্ছে, কার সিদ্ধান্তকে পরিবার বা সমাজ নিয়ন্ত্রণ করছে, একই ঘটনাকে ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষ কেন ভিন্নভাবে অনুভব করছে; এই প্রশ্নগুলো নিয়ে শরৎচন্দ্রকে পড়লে তাঁর রচনার অর্থ একটি মাত্র বার্তার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে মানুষের বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতার একক কণ্ঠ হয়ে ওঠে।

আবার সমকালীন পাঠের জন্যও শরৎচন্দ্রের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাগুলোকেও সামনে রাখতে হয়, কারণ তাঁর প্রগতিশীলতার সঙ্গে তাঁর সময়ের রক্ষণশীলতা, নারীমুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পিতৃতান্ত্রিক নৈতিকতার অবশেষ, ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি সহানুভূতির সঙ্গে সামাজিক বিধির প্রতি কিছু ক্ষেত্রে আপস; সব মিলিয়েই তাঁর মানসজগৎ গঠিত। তাঁকে মহান প্রমাণ করার জন্য এই দ্বৈততাগুলো আড়াল করার প্রয়োজন নেই; বরং এই সীমারেখাগুলো শনাক্ত করেই বোঝা যায় কোন জায়গায় তিনি তাঁর সময়কে অতিক্রম করেছেন এবং কোথায় তিনি তাঁর সময়ের সন্তান হয়ে থেকেছেন। ফলে শরৎচন্দ্রকে ভালোবাসার সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় তাঁর সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত না হলেও, তাঁর সঙ্গে একটি সক্রিয় বৌদ্ধিক সংলাপে প্রবেশ করা; এই সংলাপই তাঁকে স্মৃতির লেখক থেকে বর্তমানের প্রশ্নের অংশীদারে পরিণত করে।

নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে শরৎচন্দ্রকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাই তিনি অমর, কালজয়ী সুতরাং তাঁকে পড়তে হবে; এই যুক্তি যথেষ্ট নয়। তাঁকে পড়ার দরজা খুলতে হবে প্রশ্ন দিয়ে, যেখানে একজন তরুণ পাঠক নিজের সময়ের প্রেম, পরিবার, সামাজিক মর্যাদা, লিঙ্গসম্পর্ক, ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা জনমতের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর রচনার মানুষের দিকে তাকাবে এবং একই সঙ্গে বুঝবে যে একশ বছরেরও বেশি আগের সমাজকে বর্তমানের সঙ্গে হুবহু এক করে দেখা ইতিহাসবোধের ভুল। এই দূরত্ব ও সাদৃশ্যকে একসঙ্গে ধারণ করেই শরৎচন্দ্রকে পড়তে হবে, কারণ তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এই দাবিতে নয় যে তিনি আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই দিয়ে গেছেন; তাঁর স্থায়িত্বের কারণ হলো তিনি এমন কিছু মানবিক প্রশ্ন রেখে গেছেন, যেগুলোর উত্তর সময়ের সঙ্গে বদলায়, অথচ প্রশ্নগুলো মানুষের জীবন থেকে মুছে যায় না।

শরৎচন্দ্রের বাস্তববাদ এখানেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ যে তিনি প্রান্তিক মানুষের দুঃখকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ না করে, তাদের দৈনন্দিন জীবন, ক্ষুধা, অপমান, সম্পর্ক ও আত্মমর্যাদার ভেতর দিয়ে সেই বঞ্চনাকে অনুভবযোগ্য করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। ফলে আজ তাঁর সাহিত্য পড়ার অর্থ দারিদ্র্যের পুরোনো ছবি দেখে আবেগপ্রবণ হওয়ার চেয়ে একজন মানুষের দুর্দশার কতটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল এবং কতটা এমন সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল এই প্রশ্ন জাগ্রত করে।

বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর বাস্তববাদী ধারার মধ্যে শরৎচন্দ্রকে রাখলে তাঁর এই বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট হয়; সাধারণ মানুষ, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নারীজীবন, পারিবারিক বিধান, প্রেম ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে সাহিত্যের কেন্দ্রীয় বিষয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে ভারতীয় সাহিত্যের মানবতাবাদী সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে, আবার বাঙালি সমাজের নিজস্ব পারিবারিক কাঠামো, জাতপাত, ধর্মীয় সংস্কার, গ্রামীণ ক্ষমতা, মধ্যবিত্ত নৈতিকতা এবং আবেগঘন সম্পর্কের যে ঘনিষ্ঠ জীবনজগৎ তিনি নির্মাণ করেছেন, সেটিও তাঁকে স্বতন্ত্র করেছে। ফলে বিশ্বসাহিত্যের আলোকে শরৎচন্দ্রকে পড়ার অর্থ তাঁকে কোনো আন্তর্জাতিক লেখকের অনুকরণে মাপা নয়; তাঁর সাহিত্য কীভাবে স্থানীয় বাস্তবতাকে এমন মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছে, যার সঙ্গে ভিন্ন সমাজের পাঠকও নিজেকে সম্পর্কিত করতে পারে, সেই সাহিত্যিক ক্ষমতাটিকে শনাক্ত করা।

বাংলা সাহিত্যের অভ্যন্তরেও শরৎচন্দ্রের স্থান নির্ধারণ করতে গেলে একই সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ তাঁকে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, বিভূতিভূষণ কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কেবল শ্রেষ্ঠত্বের তুলনায় বসালে তাঁর শিল্পের নিজস্ব চরিত্রটি স্পষ্ট হয় না। রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক ও নন্দনতাত্ত্বিক ব্যাপ্তি, বঙ্কিমচন্দ্রের সুসংগঠিত উপন্যাস-স্থাপত্য, বিভূতিভূষণের প্রকৃতি ও জীবনঘনিষ্ঠতা কিংবা মানিকের সমাজ-অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতার পাশে শরৎচন্দ্রের বিশেষ শক্তি নিহিত তাঁর মানুষের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতায়, যেখানে ভাষার স্বচ্ছতা, আবেগের প্রত্যক্ষতা এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার পরিচিত পরিসর পাঠকের সঙ্গে একটি তীব্র আত্মীয়তা তৈরি করে। তাঁর সব উপন্যাসের শিল্পকাঠামোকে সমানভাবে নিখুঁত বলে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন নেই; তাঁর স্থায়ী সাহিত্যিক গুরুত্বের একটি বড় কারণ হলো তিনি সামাজিক বিধানকে বিমূর্ত তত্ত্বে পরিণত না করে মানুষের জীবনের অনুভূত অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছেন।

সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে তাই শরৎচন্দ্রকে পড়ার সবচেয়ে ফলপ্রসূ পদ্ধতি স্মরণসভামুখী নয়, পুনর্পাঠমুখী; তাঁর সময়কে জানতে হবে, তাঁর সমাজের ক্ষমতাকাঠামো শনাক্ত করতে হবে, চরিত্রের ওপর আরোপিত সামাজিক পরিচয় থেকে তার ব্যক্তিসত্তাকে আলাদা করে দেখতে হবে, নারী ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠের পাশাপাশি তাদের নীরবতাকেও পাঠ করতে হবে, অর্থনৈতিক অবস্থান ও পারিবারিক বিধান কীভাবে ব্যক্তির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তা বুঝতে হবে, আবার একই সঙ্গে লেখকের নিজস্ব ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাকেও প্রশ্নের বাইরে রাখা যাবে না। এইভাবেই ‘কীভাবে পড়ব’ প্রশ্নটি ধীরে ধীরে ‘কেন পড়ব’ প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠবে।

নাহিদা নাহিদ: গল্পকার, গবেষক ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত