সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয়ের বাধ্যবাধকতা নেই: অ্যাটর্নি জেনারেল

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ২০: ১৩
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। ছবি: সংগৃহীত

সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কোনো বাধ্যবাধকতা সংবিধানে নেই উল্লেখ করে হাইকোর্টের রায়ের আইনি পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।

আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) আপিল বিভাগে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিতের পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের ইতিহাস তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগে একটি রায় হয়েছিল ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর। রায়টি আমাদের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, এ অনুচ্ছেদে নিম্ন আদালতের বিচারকদের পোস্টিং (পদায়ন) ও পদোন্নতি সংক্রান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রয়োগ করা হয়। এই ১১৬ অনুচ্ছেদের একটা ইতিহাস আছে। ১৯৭২ সালের আমাদের মূল সংবিধানে এই ক্ষমতা ছিল সুপ্রিম কোর্টের ওপরে। পরবর্তীতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে, অনুচ্ছেদটি সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া হয়।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে এটাকে সংশোধন করা হয় যে, দায়িত্বটা রাষ্ট্রপতির, তবে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে। আমাদের দেশে পঞ্চম সংশোধনীর একটি রায় আছে, যে রায়ের মাধ্যমে আলটিমেটলি ১৯৭৯ সালে যে সংশোধনীটি করা হয়েছিল সেটি বাতিল হয়ে যায়। আবার পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়, শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সরকারের সময় এ সংশোধনীটি পুনরায় সংশোধন করে আলটিমেটলি রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয়। তাহলে যে সংবিধান সম্পর্কে রিটকারীদের আপত্তি, তার প্রথমটি সংঘটিত হয়েছে চতুর্থ সংশোধনীর সময়ে, যে সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ছিল। আবার পঞ্চদশ সংশোধনী, যে সংশোধনীর ওপরে ভিত্তি করে এটি ৭২ সালের সংবিধানের বাইরে গিয়ে পুনরায় রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে, যেটার বিরুদ্ধে রিট পিটিশন দায়ের হয়েছে, সেটা বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সংশোধনী এবং ২০১৭ সালের একটা বিধিমালা চ্যালেঞ্জ করে আলটিমেটলি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। সেখানে আর একটা প্রার্থনা করা হয়েছিল যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটা স্বতন্ত্র সচিবালয় করা এবং সেই মর্মে একটা নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল, যার নির্দেশনাও আদালত দিয়েছিল।’

সংবিধানে বিভিন্ন সচিবালয়ের কাঠামোর উদাহরণ টেনে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘হাইকোর্ট যখন রায় দেয়, কোনো বিচার-বিশ্লেষণ করে, তখন কিন্তু আইন এবং সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে পড়ে থাকে। আমাদের এই সংবিধানে, আমি উদাহরণ হিসেবে আজকে কোর্টে উল্লেখ করেছি যে, আমাদের আরও সচিবালয় আছে। যেমন বাংলাদেশ সচিবালয় সবচেয়ে বড় সচিবালয়। এটা কিন্তু সংবিধানে আর আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় একটা স্বতন্ত্র আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আমাদের সংবিধানে ৭৯ অনুচ্ছেদে সংসদ সচিবালয় স্বতন্ত্র সচিবালয় থাকবে বলে এটি স্বতন্ত্র উল্লেখ করা আছে। আমাদের সংবিধানের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয়ের কোনো উল্লেখ নাই। কারণ এই সচিবালয়গুলো গঠিত হয়েছে হয় সংবিধানের বিধান অনুযায়ী অথবা আইনের বিধান অনুযায়ী। আমার সাবমিশনটা ছিল যে আদালত তাঁর রায় প্রকাশের ক্ষেত্রে কতটুকু পর্যন্ত যেতে পারেন, যেটা সংবিধানে নেই সেটাও অ্যাড করতে পারেন কি না।’

পার্লামেন্টের স্বাধীন ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি যে পার্লামেন্ট যখন কাজ করে, পার্লামেন্ট স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। পার্লামেন্টে অধ্যাদেশ যখন জারি হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সময়কালের সমস্ত অধ্যাদেশ, ৩৩টা অধ্যাদেশ, এটা কিন্তু সংবিধানেই বলা আছে যে প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করতে হবে। ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ইয়েস অর নো করতে হবে। সেটা সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্ট এ কাজটি করেছে। পার্লামেন্ট সংবিধান অনুযায়ী এই অর্ডিন্যান্স, দুটা অর্ডিন্যান্স বাতিল করেছে।’

মাসদার হোসেন মামলা ও বর্তমান আইনি লড়াই

বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি দীর্ঘদিনের। ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মাসদার হোসেনসহ অন্য বিচারকদের দায়ের করা মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গত বছর ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট স্বাধীন সচিবালয়ের রায় দেয়। তবে সম্প্রতি নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে প্রশাসনিক কার্যক্রম আবার আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরিয়ে নেয়।

এদিকে ওই রহিতকরণ আইনকে চ্যালেঞ্জ করে গত ২০ এপ্রিল সাতজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অপেক্ষমাণ রাখার সিদ্ধান্ত দেয়। সবশেষ আজ মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই মূল রায়টি আগামী ১৬ জুনের আপিল শুনানি পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেছে।

সম্পর্কিত