অস্তিত্ব-সংকটে মাথাভাঙ্গা নদী, দূষণে মৃতপ্রায়

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চুয়াডাঙ্গা

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৫৭
মাথাভাঙ্গা নদী বর্তমানে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। স্ট্রিম ছবি

একসময়ের খরস্রোতা মাথাভাঙ্গা নদী এখন অস্তিত্ব-সংকটে ভুগছে। চুয়াডাঙ্গা শহরকে দ্বিখণ্ডিত করে বয়ে যাওয়া ১২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই আন্তঃসীমান্ত নদীটি দখল, দূষণ আর অযত্নে মৃতপ্রায়। নদীটি বর্তমানে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাথাভাঙ্গা নদীর এই মরণদশার অন্যতম কারণ চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শহরের প্রায় সব প্রধান ড্রেনের মুখ সরাসরি যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে নদীর সঙ্গে। পৌরসভার নোংরা পানি, হোটেলের আবর্জনা, প্লাস্টিক ও বাজারের বর্জ্য মিশছে নদীতে। এতে পানি কালো হয়ে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ ছাড়া নদীর তীরে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা, যা নদীর ভারসাম্য নষ্ট করছে।

নদীর পাড়ের বাসিন্দা রিমন আলী বলেন, ‘আগে যেখানে বন্ধুরা মিলে সাঁতার কাটতাম, আজ সেখানে দুর্গন্ধের চোটে দাঁড়ানোই দায়। এই নদীতে একসময় প্রবল স্রোত ছিল, যা দেখে ভালো লাগত। এখন সেই চিত্র আর নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দা জুমাত আলী বলেন, ‘ছোটবেলায় নদীর স্রোত দেখে ভয় পেতাম, বড় বড় জাহাজ চলত। আজ নদীটি নালায় পরিণত হয়েছে। পলি জমে ভরাট হওয়া এবং খনন না করায় এই করুণ দশা।’

শহরের প্রায় সব প্রধান ড্রেনের মুখ সরাসরি যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে নদীর সঙ্গে। স্টিম ছবি
শহরের প্রায় সব প্রধান ড্রেনের মুখ সরাসরি যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে নদীর সঙ্গে। স্টিম ছবি

নদীটি রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ‘মাথাভাঙ্গা নদী বাঁচাও আন্দোলন’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাবেক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী বলেন, সরকারি-বেসরকারি বহু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান নদীর জায়গা দখল করে রেখেছে। এমনকি পুলিশ পার্ক বা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মতো বড় এনজিওর ভবনও নদীর সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। সংগঠনের সভাপতি সাবেক অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সি জানান, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা নদীটিকে ড্রেন বানিয়ে ফেলেছে। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া নদী রক্ষা সম্ভব নয়।

নদীর কয়েক কিলোমিটার পাড় ঘুরে দেখা গেছে, জেলা পুলিশ পার্কের কমিউনিটি সেন্টার এবং বেসরকারি এনজিও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ট্রেনিং সেন্টার ভবন নদীর পাড় দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে গড়ে তোলা গরু ও মুরগির খামারের বর্জ্য সরাসরি ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়রা বিভিন্ন স্থাপনা ও গাছ লাগিয়ে নদীর জায়গা দখল করে রেখেছেন।

দখলদার প্রতিষ্ঠান ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক জহির রায়হান বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ নদীর জমিতে আছে। আমরা সেগুলো ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি, কিছু সরিয়েছিও।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক দখলদার বলেন, নদী সংরক্ষণে সরকারি কাজ শুরু হলে তিনি জায়গা ছেড়ে দেবেন।

মাথাভাঙ্গা নদীর এই মরণদশার অন্যতম কারণ চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। স্ট্রিম ছবি
মাথাভাঙ্গা নদীর এই মরণদশার অন্যতম কারণ চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। স্ট্রিম ছবি

চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ বলেন, ‘মাথাভাঙ্গা নদীটি দখল ও দূষণে ভরে গেছে। নদী রক্ষায় একটি প্রকল্প পাসের চেষ্টা চলছে। সেটি পাস হলে বাজেট অনুযায়ী খনন ও দখলমুক্ত করার কাজ শুরু হবে। এর আগে পাউবো কোনো বাজেট পায়নি।’

পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক শারমিন আক্তার বলেন, ‘পৌরসভার ড্রেনগুলো নদীতে পড়ার বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগে নোটিশ করেছি। নদীকে দূষণমুক্ত রাখতে আমরা চেষ্টা করছি।’

মাথাভাঙ্গা কেবল একটি নদী নয়; এটি চিত্রা, নবগঙ্গা ও ভৈরবের উৎস। ফলে মাথাভাঙ্গা নদী মারা গেলে এই অঞ্চলের পুরো নদী ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত