জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

তিন ভাইয়ের সাজানো সংসার এক বিস্ফোরণেই ছিন্নভিন্ন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

প্রবাসী সামির আহামেদ। ছবি: সংগৃহীত

গত সোমবার ভোররাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে কেঁপে উঠল হালিমা মঞ্জিল। এক বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তিন ভাইয়ের সাজানো সংসার। একে একে নিভে গেল পাঁচ সদস্যের প্রাণ।

প্রবাসী সামির আহামেদ। পর্তুগাল থেকে চিকিৎসা নিতে দেশে এসেছেন মাত্র কয়েকদিন হলো। চিকিৎসা হয়েছেও। পরিবার নিয়ে কিছুদিন পর গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা। তবে তা আর হলো না। বাড়ি ফিরছে তাঁর নিথর দেহ।

চট্টগ্রামের বাসায় বিস্ফোরণে সামির ও তাঁর স্ত্রীসহ পরিবারের পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন এক ভাই ও পরিবারের আরও দুই সদস্য।

সোমবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে হালিশহরের এইচ ব্লকে ‘হালিমা মঞ্জিল’ নামক ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার এক বাসায় বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এই ঘটনায় সামিরসহ পরিবারের ৯ জন গুরুতর দগ্ধ হন।

স্থানীয় লোকজন দগ্ধদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় বিকেলেই তাঁদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।

সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা নেওয়ার পথে সামিরের বড় ভাই শাখাওয়াত হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম রানী মারা যান। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মারা যান নুরজাহান বেগমের ছেলে সাফায়াত হোসেন শাওন, দুপুর ১২টার দিকে পর্তুগাল প্রবাসী সামির আহামেদ, রাত সাড়ে ১০টার দিকে সামিরের স্ত্রী পাখি আক্তার। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসকরা বড় ভাই শাখাওয়াত হোসেনকে মৃত্যু ঘোষণা করেন।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন শাখাওয়াত হোসেনের মেয়ে উম্মে আয়মন সানজিদা (৮), সামির আহামেদের ছেলে ফারহান আহমেদ আনাছ (৮), মেয়ে আয়েশা (৪) ও আরেক ভাই শিপন হোসাইন (২৫)।

বিস্ফোরণের কারণ এখনও অজানা

বিস্ফোরণের ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনা তদন্তে নামেনি কোনো সংস্থা। বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে গ্যাস লিকেজ থেকে দুর্ঘটনা হতে পারে বলে ধারণা করছে। তবে লিফট, আইপিএস, হাই-ভোল্টেজের কথাও বলছেন অনেকে।

বিস্ফোরণের কারণ জানতে দুই কমিটি

এই দুর্ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ওই বাসায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (কেজিডিসিএল) গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। কোনো কারণে চুলা থেকে হয়তো গ্যাস লিক হয়েছিল। ফলে রান্নাঘরে গ্যাস জমে যায়। সেই জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে সবাই দগ্ধ হয়েছেন।

ডিভিশনাল ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক রশিদ উদ্দিন বলেন, গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় ঢাকা থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করবে।

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। যেমন- বিস্ফোরণ হয় এমন কোনো উপকরণ ছিল কিনা, এসি-ফ্রিজ-আইপিএস থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে কিনা, বিদ্যুতের হাই ভোল্টেজ ছিল কিনা, ভবনে কোনো কেমিক্যাল ছিল কিনা, ভবনের অবকাঠামো নির্মাণে নকশাসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কিনা; এসব বিষয় সামনে রেখে কমিটি কাজ করবে। কমিটির প্রতিবেদন পেয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

অন্যদিকে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক কবির উদ্দিন আহম্মদ বলেন, এই ঘটনায় তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। গ্যাস লিক হয়েছে কিনা, সেটি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বলা যাবে।

সরেজমিনে ভবনের চিত্র

ছয়তলা ভবনের নিচ তলা পার্কিং ও মসজিদ হিসেবে ব্যবহার হয়। বাকি পাঁচতলায় চারটি করে মোট ২০টা বাসা রয়েছে। বিস্ফোরণের পর প্রতিটি বাসার দরজা ভেঙে যায়। ভেঙে যায় জানালার কাঁচও। বিস্ফোরণ হওয়া বাসার সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়। মঙ্গলবার দুপুরে ভবনে গিয়ে দেখা যায় সব বাসায় নতুন দরজা লাগানো হয়েছে। বিস্ফোরণ হওয়া বাসা তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ভবনের বাসিন্দা ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

বিস্ফোরণের ক্ষত পাশের ভবনগুলোতেও

বিস্ফোরণ এতটাই তীব্র ছিল যে, পাশের লাগোয়া ভবনের ১৮টি জানালার কাঁচ ভেঙে যায়। একইভাবে অন্য পাশের ভবনেরও জানালার কাঁচ ভেঙে গেছে। ভাঙা কাঁচ রাস্তার অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

ভবনের পাশেই রয়েছে একটি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকান। দোকানের মালিক ওমর ফারুক জানান, বিস্ফোরণের খবর শুনে ভোরেই ছুটে আসি। গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে বলে শুনেছি। এসে দেখি পুরো রাস্তা জুড়ে কাঁচ ছড়িয়ে আছে।

পাশের একটি ভবনে থাকেন মুমতাজুল হক। দুপুরে বিস্ফোরণ হওয়া বাসা দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, বছরখানেক আগে আমি এই ভবনে বাসা ভাড়া নিতে চেয়েছিলাম। পরে আর নেওয়া হয়নি। লিফটে একটা ঝামেলা আছে শুনেছিলাম। এটা কি আইপিএসের ব্যাটারি থেকে হয়েছে, নাকি লিফট কিংবা হাই-ভোল্টেজ অথবা গ্যাস লিকেজ থেকে হয়েছে- তা খতিয়ে দেখা উচিৎ।

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মো. সম্রাট। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, লিফট ঠিক আছে। আইপিএস থেকে এরকম হওয়ার সম্ভাবনা নাই।

সম্পর্কিত