স্ট্রিম ডেস্ক

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পরের বছর তিনি সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি।
সেখান থেকেই শুরু একটি রাজনৈতিক ধারার, যার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদটির সম্পর্ক ছিল কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো জটিল। জিয়াউর রহমান নিজে ছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি। তাঁর মৃত্যুর পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হন এবং বিএনপির নেতৃত্বও নেন।
১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে দলটির প্রবীণ নেতা আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তাঁর পদত্যাগের পর অল্প সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিএনপির নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার। পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন শিক্ষাবিদ ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বিএনপির সদস্য ছিলেন না, কিন্তু বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সংসদের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার গল্প আসলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার এক অস্থির সময়ের গল্প। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েক দফা অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীতে তাঁর উত্থান। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৮ সালে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সেই বছরই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিএনপি।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা। সামরিক পটভূমি থেকে উঠে এসে তিনি যে দল গড়েছিলেন, সেটিই পরে বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির একটিতে পরিণত হয়।
কিন্তু জিয়ার রাষ্ট্রপতিত্ব দীর্ঘ হয়নি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল সেনা কর্মকর্তার অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যু শুধু রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য করেনি; সদ্য প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকেও হঠাৎ করে নেতৃত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছিল।
-206a6b.jpg)
জিয়াউর রহমানের উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হন।
সাত্তারের রাষ্ট্রপতিত্ব ছিল অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়। রাষ্ট্রপতি সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন।
এটি বিএনপির জন্য ছিল দ্বিতীয় বড় ধাক্কা—প্রথমটি জিয়ার মৃত্যু, দ্বিতীয়টি ক্ষমতা হারানো। দলটি তখনও পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি। নেতৃত্বের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশের পেছনে এই শূন্যতা ও দলকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন বড় ভূমিকা রেখেছিল।
-6791bd.jpg)
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এবার জিয়ার সময়ের মতো রাষ্ট্রপতি-শাসিত কাঠামো ছিল না। সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয় এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে সীমিত হয়ে আসে।
এই নতুন ব্যবস্থার রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। বরিশালের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত আবদুর রহমান বিশ্বাস পাকিস্তান আমল থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী ছিলেন। পরে আবদুস সাত্তারের সরকারে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির রাজনীতিতে তিনি উপ-চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হন। পরে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর মেয়াদ ছিল ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬।
আবদুর রহমান বিশ্বাসের রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে সংঘাত। ১৯৯৪-৯৬ সালে বিরোধী দলের আন্দোলন, সংসদীয় সংকট এবং নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস সংসদ ভেঙে দিয়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

বিএনপির রাষ্ট্রপতি-ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়ের একটি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর। তিনি শুধু বিএনপির নেতা ছিলেন না; দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ছিলেন। জিয়ার সময় উপপ্রধানমন্ত্রী, পরে সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি বিএনপির সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। কারণ রাষ্ট্রপতি পদকে সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় অবস্থানে রাখার রাজনৈতিক রীতি ও প্রয়োজন ছিল।
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু তাঁর মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক মাস। বিএনপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দ্রুতই তিক্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন। বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের অবসান ঘটে মূলত দলের সঙ্গে সংঘাতের পর। পরে তিনি বিএনপি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাজনৈতিক পথ বেছে নেন এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন।

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্ব এসে পড়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকারের ওপর। তিনি ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
জমিরউদ্দিন সরকারের রাষ্ট্রপতিত্ব ছিল অন্তর্বর্তীকালীন, মাত্র আড়াই মাসের মতো। কিন্তু এই ছোট সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর সংসদীয় ব্যবস্থার নিয়ম অনুসারে স্পিকার জমিরউদ্দিনেই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
ইতিহাসের বড় ক্যানভাসে জমিরউদ্দিন সরকার হয়তো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতিদের মতো আলাদা অধ্যায় নন। কিন্তু বিএনপির রাষ্ট্রপতি-পর্বের ধারাবাহিকতায় তিনি একটি সেতু—এক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং আরেক রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের মাঝখানে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মুখ।

২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বিএনপির সদস্য বা দলীয় নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, সাবেক সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। ১৯৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সংসদের আমলে। তাই তাঁকে ‘বিএনপি সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি’ বলা হয়। তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় ২০০৬ সালের শেষ দিকে। বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে দেশ ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। তৎকালীন সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন।
এরপর নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দেন। পরে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ইয়াজউদ্দিনের রাষ্ট্রপতিত্ব তাই শুধু বঙ্গভবনের ইতিহাস নয়; বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিরও এক বড় মোড়।
তথ্যসূত্র: বঙ্গভবনের সাবেক রাষ্ট্রপতিদের সরকারি তালিকা, বাংলাপিডিয়া ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকারদের সরকারি তথ্য

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পরের বছর তিনি সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি।
সেখান থেকেই শুরু একটি রাজনৈতিক ধারার, যার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদটির সম্পর্ক ছিল কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো জটিল। জিয়াউর রহমান নিজে ছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি। তাঁর মৃত্যুর পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হন এবং বিএনপির নেতৃত্বও নেন।
১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে দলটির প্রবীণ নেতা আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তাঁর পদত্যাগের পর অল্প সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিএনপির নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার। পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন শিক্ষাবিদ ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বিএনপির সদস্য ছিলেন না, কিন্তু বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সংসদের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার গল্প আসলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার এক অস্থির সময়ের গল্প। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েক দফা অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীতে তাঁর উত্থান। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৮ সালে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সেই বছরই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিএনপি।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা। সামরিক পটভূমি থেকে উঠে এসে তিনি যে দল গড়েছিলেন, সেটিই পরে বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির একটিতে পরিণত হয়।
কিন্তু জিয়ার রাষ্ট্রপতিত্ব দীর্ঘ হয়নি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল সেনা কর্মকর্তার অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যু শুধু রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য করেনি; সদ্য প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকেও হঠাৎ করে নেতৃত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছিল।
-206a6b.jpg)
জিয়াউর রহমানের উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হন।
সাত্তারের রাষ্ট্রপতিত্ব ছিল অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়। রাষ্ট্রপতি সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন।
এটি বিএনপির জন্য ছিল দ্বিতীয় বড় ধাক্কা—প্রথমটি জিয়ার মৃত্যু, দ্বিতীয়টি ক্ষমতা হারানো। দলটি তখনও পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি। নেতৃত্বের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশের পেছনে এই শূন্যতা ও দলকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন বড় ভূমিকা রেখেছিল।
-6791bd.jpg)
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এবার জিয়ার সময়ের মতো রাষ্ট্রপতি-শাসিত কাঠামো ছিল না। সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয় এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে সীমিত হয়ে আসে।
এই নতুন ব্যবস্থার রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। বরিশালের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত আবদুর রহমান বিশ্বাস পাকিস্তান আমল থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী ছিলেন। পরে আবদুস সাত্তারের সরকারে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির রাজনীতিতে তিনি উপ-চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হন। পরে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর মেয়াদ ছিল ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬।
আবদুর রহমান বিশ্বাসের রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে সংঘাত। ১৯৯৪-৯৬ সালে বিরোধী দলের আন্দোলন, সংসদীয় সংকট এবং নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস সংসদ ভেঙে দিয়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

বিএনপির রাষ্ট্রপতি-ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়ের একটি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর। তিনি শুধু বিএনপির নেতা ছিলেন না; দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ছিলেন। জিয়ার সময় উপপ্রধানমন্ত্রী, পরে সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি বিএনপির সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। কারণ রাষ্ট্রপতি পদকে সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় অবস্থানে রাখার রাজনৈতিক রীতি ও প্রয়োজন ছিল।
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু তাঁর মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক মাস। বিএনপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দ্রুতই তিক্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন। বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের অবসান ঘটে মূলত দলের সঙ্গে সংঘাতের পর। পরে তিনি বিএনপি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাজনৈতিক পথ বেছে নেন এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন।

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্ব এসে পড়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকারের ওপর। তিনি ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
জমিরউদ্দিন সরকারের রাষ্ট্রপতিত্ব ছিল অন্তর্বর্তীকালীন, মাত্র আড়াই মাসের মতো। কিন্তু এই ছোট সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর সংসদীয় ব্যবস্থার নিয়ম অনুসারে স্পিকার জমিরউদ্দিনেই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
ইতিহাসের বড় ক্যানভাসে জমিরউদ্দিন সরকার হয়তো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতিদের মতো আলাদা অধ্যায় নন। কিন্তু বিএনপির রাষ্ট্রপতি-পর্বের ধারাবাহিকতায় তিনি একটি সেতু—এক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং আরেক রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের মাঝখানে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মুখ।

২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বিএনপির সদস্য বা দলীয় নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, সাবেক সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। ১৯৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সংসদের আমলে। তাই তাঁকে ‘বিএনপি সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি’ বলা হয়। তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় ২০০৬ সালের শেষ দিকে। বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে দেশ ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। তৎকালীন সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন।
এরপর নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দেন। পরে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ইয়াজউদ্দিনের রাষ্ট্রপতিত্ব তাই শুধু বঙ্গভবনের ইতিহাস নয়; বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিরও এক বড় মোড়।
তথ্যসূত্র: বঙ্গভবনের সাবেক রাষ্ট্রপতিদের সরকারি তালিকা, বাংলাপিডিয়া ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকারদের সরকারি তথ্য

রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ছিলেন শিক্ষক। সরকারি কলেজে ঢুকে অর্থনীতি পড়িয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কাজ করেছেন প্রশাসনেও। একসময় ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এরপর ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে এসে বিএনপির স্থানীয় নেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উ
২৭ মিনিট আগে
বাংলাদেশ সমতার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
১৯ আগস্ট ২০২৬
স্বামীর শেষ বিদায়ে অংশ নিতে মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে ১২ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আজ বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকেলে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
