অধ্যাপক ড. গোলাম আজমের নিবন্ধ

মাদকের ভয়াল থাবায় তরুণ সমাজ: চাই সমন্বিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ

ড. গোলাম আজম
ড. গোলাম আজম

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ২১: ০৭
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় শিক্ষক পরিবারের শিশুসহ ৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা, নোয়াখালীতে বিএনপি নেতা ফারুক হত্যা, সিরাজগঞ্জে দুই ভাইয়ের ওপর হামলা ও মৃত্যু কিংবা টাঙ্গাইলে গলা কেটে হত্যার মতো ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সমাজের এক গভীর ক্ষতকে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান মতে, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী। তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ আজ মাদকের মরণছোবলে দিশেহারা। মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

তরুণ প্রজন্মের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে মনস্তাত্ত্বিক সংকট। বেকারত্ব, হতাশা, বিষণ্ণতা এবং জীবনের লক্ষ্যহীনতা থেকে মুক্তি পেতে অনেক তরুণ মাদককে বেছে নিচ্ছে। তারা মনে করে মাদক সেবনের মাধ্যমে এই মানসিক চাপ থেকে ‘রিলিজ’ বা মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে এটি তাদের এক সাময়িক মোহের জালে আটকে ফেলে, যা থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

এর পাশাপাশি রয়েছে সঙ্গদোষ বা বন্ধু সার্কেলের নেতিবাচক চাপ। অনেকেই কেবল কৌতূহল বা ‘ফ্যাশন’ হিসেবে মাদক গ্রহণ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই কৌতূহলই তাদের মাদকের নিয়মিত গ্রাহক এবং একপর্যায়ে ‘সাপ্লায়ার’ বা সরবরাহকারীতে পরিণত করে। ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। তারা রাতে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সংঘবদ্ধ হয়ে আড্ডা দেয় এবং গ্যাং বা ‘বড় ভাই’দের মাধ্যমে মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ে।

মাদকাসক্তরা কেন এত সহজে হত্যার মতো নৃশংস অপরাধ করতে পারে—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মানবদেহের জীববিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের গভীরে। মানব মস্তিষ্ক সবসময় ‘'ফিল-গুড’ বা ভালো লাগার অনুভূতি খোঁজে, যার জন্য ডোপামিন বা সেরোটোনিনের মতো হরমোন দায়ী। মাদক গ্রহণের ফলে মস্তিষ্কে কৃত্রিমভাবে এই ‘প্লেজার হরমোন’ নিঃসৃত হয়। কিন্তু যখন রক্তে মাদকের উপস্থিতি কমে যায়, তখন মস্তিষ্কের নার্ভাস সিস্টেম তীব্রভাবে মাদকের চাহিদা তৈরি করে।

বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী। তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ আজ মাদকের মরণছোবলে দিশেহারা। মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই অবস্থাকে বলা হয় ‘রিলাপস’। যখন একজন আসক্ত ব্যক্তি মাদক পায় না তখন তার হ্যালুসিনেশন বা মায়াভ্রম তৈরি হয়। বাস্তবতার সাথে তার চিন্তার কোনো মিল থাকে না। ড্রাগের অভাবে সৃষ্ট এই তীব্র চাহিদার কারণে তারা চরম অ্যাগ্রেসিভ বা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তখন তাদের কাছে ন্যায়-অন্যায়, বিবেক বা সম্পর্কের কোনো মূল্য থাকে না। অর্থ জোগাড় করতে বা বাধা অপসারণ করতে তারা নিজের পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা যে কাউকে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। বহুল আলোচিত ‘ঐশী’র ঘটনা বা সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো মূলত এই বায়ো-সাইকোলজিক্যাল ডিপেন্ডেন্সি বা জৈব-মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরশীলতারই ভয়ংকর ফল।

মাদকের প্রভাব কেবল অপরাধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি পরিবারকে শেকড় থেকে ধ্বংস করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ গবেষণায় দেখেছেন, যারা ‘হার্ড ড্রাগ’ বা উচ্চমাত্রার মাদক (যেমন- ইয়াবা, ডান্ডি, হেরোইন) সেবন করে, তাদের পরিপাকতন্ত্র, হৃদযন্ত্র, কিডনি ও ফুসফুস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।

মাদকের কারণে মেধা ও পড়াশোনা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দাম্পত্য জীবনে চরম কলহ নেমে আসে। বিবাহ বিচ্ছেদ, দাম্পত্য অশান্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক পথে পা বাড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। মাদকাসক্ত সন্তান মাদকের টাকা জোগাড় করতে ঘরের আসবাবপত্র, স্বর্ণালংকার চুরি করা থেকে শুরু করে বাবা-মাকে মারধর পর্যন্ত করছে। সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে পরিবারগুলোও এক চরম যন্ত্রণাদায়ক স্টিগমা বা কলঙ্কের ভেতর দিয়ে যায়।

মাদকের এই বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর সহজলভ্যতা বা অ্যাভেইলেবিলিটি। ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের সাধারণ নিয়মে, হাতের কাছে মাদক পাওয়া গেলে তার ব্যবহারকারীও বাড়বে। একসময় ভারত থেকে ফেনসিডিল আসত, এখন মিয়ানমার বা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ হয়ে ঢুকছে ইয়াবাসহ নানা ভয়ংকর মাদক।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মাদক ব্যবসার সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে। বিনা শ্রমে বিপুল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হওয়ায় পাড়ায় পাড়ায় এখন মাদকের ডিলার বা পেডলার তৈরি হয়েছে। সীমানা পেরিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মাদক দেশে ঢুকছে, অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এই সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ভাঙতে না পারলে মাদকের ডিমান্ড বা চাহিদা কখনোই কমানো সম্ভব নয়।

মাদক নামক এই ক্যানসার সমাজ থেকে রাতারাতি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে একটি সমন্বিত বা হোলিস্টিক উদ্যোগের মাধ্যমে একে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এর জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:

এক. পারিবারিক নজরদারি ও শিক্ষা: মাদক প্রতিরোধের প্রথম দুর্গ হলো পরিবার। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, কত রাতে বাড়ি ফিরছে—এসব বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন থাকতে হবে। সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। দাম্পত্য কলহের প্রভাব যেন সন্তানের ওপর না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই পাঠ্যপুস্তকে মাদকের ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

মাদকাসক্তরা কেন এত সহজে হত্যার মতো নৃশংস অপরাধ করতে পারে—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মানবদেহের জীববিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের গভীরে। মানব মস্তিষ্ক সবসময় ‘'ফিল-গুড’ বা ভালো লাগার অনুভূতি খোঁজে, যার জন্য ডোপামিন বা সেরোটোনিনের মতো হরমোন দায়ী।

দুই. সরবরাহ বন্ধ ও কঠোর আইন প্রয়োগ: রাষ্ট্রকে তার জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখাতে হবে। যারা মাদকের সাপ্লায়ার বা সিন্ডিকেটের মূল হোতা, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সীমান্তরক্ষী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। সাপ্লাই লাইন বা অ্যাভেইলেবিলিটি বন্ধ করা গেলে নতুন ব্যবহারকারী তৈরি হওয়া অনেকাংশে কমে যাবে।

তিন. দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও ফান্ডিং: মাদকাসক্তি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি একটি সাইকো-সোমাটিক ডিসঅর্ডার বা মনো-দৈহিক রোগ। আসক্তদের শুধু জেলে ভরলে সমাধান হবে না, তাদের ‘ডিটক্সিফিকেশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মাদকের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং। যেহেতু এই চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিশেষ ফান্ড তৈরি করে আসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

চার. সামাজিক মোবিলাইজেশন ও কর্মসংস্থান: তরুণ সমাজের হতাশা দূর করতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও সাধারণ জনগণকে নিয়ে ‘কমিউনিটি সোশ্যাল ওয়ার্ক’ বা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে স্পিরিচুয়াল বা আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে, যাতে তারা নৈতিক স্খলন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।

নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো প্রমাণ করেছে, মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে যদি সমাজে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা যায়, তবে মানুষ নিজে থেকেই এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে হতে হবে জনকল্যাণমুখী। পুলিশ ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে হবে। বর্তমান প্রজন্মকে যদি আমরা এখনই এই মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে এক মেধা-শূন্য, স্থবির ও পঙ্গু জাতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ আগামী নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজ—সবাইকে আজ একযোগে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।

  • অধ্যাপক ড. গোলাম আজম: অপরাধবিজ্ঞানী; শিক্ষক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত