পিংক বাসে স্বস্তি, সেবায় অনিশ্চয়তা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজধানীতে শুধু নারীদের জন্য যাত্রী পরিবহনসেবায় পিংক বাস চালু করেছে সরকার। উদ্বোধনের পর নারীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিলেও বাস স্বল্পতার কারণে ভিন্ন বাস্তবতাও রয়েছে। বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। আবার সাধারণ যাত্রী পরিবহনের বাসে ওঠার ক্ষেত্রেও পোহাতে হচ্ছে বিড়ম্বনা।

ঢাকায় প্রতি রুটে একটি করে মোট ১০টি বাস চলছে নারীদের জন্য। এর মধ্যে একটি রুট নতুন বাজার-মতিঝিল। একটি মাত্র বাস কখন আসবে, কখন যাবে—সেটাও জানেন না যাত্রীরা। বুধবার বেলা আড়াইটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত রামপুরা ব্রিজ, আবুল হোটেল ও রামপুরা বাজার এলাকা ঘুরে দেখেছেন স্ট্রিম প্রতিবেদক। তবে দুই ঘণ্টাতে একটিও ‘পিংক বাস’ চলাচল করতে দেখা যায়নি।

রাজধানীর রামপুরা ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছেন নাজনীন বেগম, যাবেন সদরঘাট। হাতে ব্যাগ। দুপুরের প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে ঘামছিলেন নারীদের জন্য নতুন চালু হওয়া পিংক বাসের অপেক্ষায়।

নতুন বাজার-মতিঝিল রুটে সদরঘাট যেতে পারবেন না নাজনীন। তবে কিছুটা এগোতে পারবেন সদরঘাটের দিকে। তিনি বলেন, ‘আধা ঘণ্টা ধরে আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু বাস কই? নারীদের কোনো বাস পাইনি। সাধারণ বাসে উঠতে চাচ্ছি কিন্তু সেটাও পারছি না।’

আবুল হোটেলের মোড়ে একই ধরনের বিপত্তিতে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থী। তিনি যাবেন যমুনা ফিউচার পার্কে।

তিনি বলেন, সাধারণ বাসগুলোতে সিট ভরে গেলে পুরুষদের ওঠানো হলেও নারীদের আর উঠতে দেওয়া হয় না। নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু হওয়ার পর সেই অজুহাত আরো বেড়েছে। এখন সোজা বলে দিচ্ছে, নারীদের বাসে উঠুন। কিন্তু সেই বাসের তো দেখা নাই।’

‘ফাবুন্নো’ নামে একটি ফেসবুক পেইজে পেজে পিংক বাসে উঠার কিছু ছবি প্রকাশ করে এক নারী লিখেছেন, ‘পিংক বাস এ যাই গুলিস্তান অব্দি, তারপর রিকশা নিয়ে ভার্সিটি যাই। ভিজে একেবারে শেষ তারপর ও একটু আনন্দিত ছিলাম যে একটাবার শান্তিতে বাসে উঠলাম।’

এদিকে খোদ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ করপোরেশনের (বিআরটিসি) সংশ্লিষ্টরাই পিংক বাসের সময়সূচি জানে না। তারা বলছেন, বাসগুলোর নারী চালকেরা এখনও সব রুটের সব রাস্তা চেনেন না। রাস্তার ব্যাপারে চালকরা অভিজ্ঞ হলে বাসের সম্যসূচি ঠিক করা হবে।

বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা স্ট্রিমকে বলেন, ‘বুধবার সকাল সাতটায় ডিপো বাসগুলোর বের হওয়ার তথ্য রয়েছে। তবে এসব বাস কয়টা ট্রিপ নিবে, কতক্ষণ চলবে, সেসব ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। কিছুদিন পর বিআরটিসি নিজে থেকেই এসব তথ্য জানাবে।’

বাংলাদেশে বিআরটিসি নারীদের জন্য বাস সার্ভিস পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম চালু করে ১৯৯৮ সালে। এরপর আবার ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর একই ধরনের বাসসেবা ঘটা করে উদ্বোধন করা হয়। তখন নারীরা অভিযোগ করেছিলেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তারা বাসের দেখা পেতেন না। পরে ২০০৯ সালে আবার এই সেবাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেটিও ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ নারী বাস আসে ২০১৮ সালে, গোলাপি রঙে ‘দোলনচাঁপা’ নামে। তবে সেই সেবাটিও বেশিদিন চলতে দেখা যায়নি।

এবার বাস সার্ভিস চালুর পর সে রকম ঘটনার যেন পুনারাবৃত্তি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে বলেছেন নারী যাত্রীরা।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবার জন্য নিরাপদ বাহন নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই নারীদের ভোগান্তি কমে আসবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী সাইফুন নেওয়াজ স্ট্রিমকে বলেন, ‘১০টা রুটে ১০টা বাস দিছে। তাহলে একটা বাসের যদি মিরপুর থেকে মতিঝিল আসতে হয়, তাতে মোটামুটি দেড় ঘণ্টার ব্যাপার। আবার মতিঝিল থেকে মিরপুর আরও দেড় ঘণ্টা। তিন ঘণ্টা পর পর বাস এলে যাত্রীরা কি বসে থাকবে? এরমানে এই সেবাটা কিছুদিন পরে দেখা যাবে যে যাত্রী বা পর্যাপ্ত গাড়ির অভাব ইত্যাদির কারণে বন্ধ হয়ে যাবে। নারীদের জন্য আলাদা বাস এর আগেও ব্যর্থ হয়েছে। সেটা কেন ব্যর্থ হলো তাঁর কারণ না দেখেই আমরা আবার শুরু করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘নারীদের জন্য আলাদা বাস না দিয়ে আমাদের গণপরিবহণের সব ক্ষেত্রেই নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। বাস বাড়াতে হবে সবার। তাহলে নারী-পুরুষ সবাই চড়তে পারবে। না হলে এসব বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে খুব একটা সফলতা আসবে না।’

পিংক বাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম নিজেও আশ্বাস দিয়েছেন যে, বাস ও রুটের সংখ্যা বাড়বে। ২০০ ইলেকট্রিক বাস আসবে। এর মধ্যে ১০০ বাস থাকবে নারীদের জন্য। অন্য বিভাগেও নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস সম্প্রসারিত হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

পিংক বাসে স্বস্তি, সেবায় অনিশ্চয়তা