জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নির্বাচনের দিনেও বিরাম নেই তাঁদের

অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে অলস সময় পার করছেন চালকেরা। স্ট্রিম ছবি

‘ভোর ৪টা ২০ মিনিটে ক্যাম্পের সবাই ঘুম থেকে উঠেছি৷ তারপর নিজেদের প্রস্তুতি শেষে ডিউটি শুরু করেছি৷ এই ডিউটি কখন শেষ হবে, তা আমরা জানি না৷ ভোট গণনা শেষ পর্যন্ত আমাদের মাঠে থাকতে হবে৷’ কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দায়িত্ব পালন করা এক সেনাসদস্য৷

নির্বাচনের ছুটিতে পরিবার থেকে দূরে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে স্ট্রিমকে এই সেনাসদস্য বলেন, ‘আমাদের ছুটি বলে কিছু নেই৷ এ রকম দিনে আমাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়৷ আমার মতো হাজারো সেনাসদস্য তা-ই করছেন৷ ছুটির দিনের আনন্দের চেয়ে আমাদের কাছে দায়িত্বটা বড়৷ দায়িত্ব পালনেই সবচে বড় আনন্দ৷’

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে৷ সে উপলক্ষে সারা দেশে চলছে ৪ দিনের ছুটি৷ নির্বাচনী এই ছুটিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ ও নাড়ির টানে রাজধানী ছেড়েছেন অসংখ্য মানুষ৷

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শহরে অনেকটাই জনশূন্য। রাস্তায় গাড়ি নেই৷ চেনা জ্যাম নেই৷ নেই হর্নের শব্দও৷ দোকানপাট, বাজারঘাট বন্ধ৷ অল্পসংখ্যক রিকশা, সিএনজি ও প্রাইভেট কার চলতে দেখা গেলেও বাস নেই বলা যায়৷ মোড়ে মোড়ে খোলা আছে কিছু চা-দোকান৷ এ ছাড়া খোলা আছে হাসপাতাল, সংবাদমাধ্যম ও জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো৷ দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের৷

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জরুরি সেবার জন্য ছুটি কাটাতে বাড়ি যাননি অনেকে৷ অনেকে যাননি পকেটের টানাপোড়েনে৷

কারওয়ান বাজারের সার্ক ফুয়ারা মোড়ে দায়িত্ব পালন করছেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য৷ তাঁদের মধ্যে একজন মোহাম্মদ নুরূল ইসলাম৷ ট্রাফিক পুলিশের এই সদস্য স্ট্রিমকে বলেন, 'আমরা জনগণের সেবক৷ পরিবার, ছুটি বা অন্যান্য যে কোনো বিষয়ের আগে জনগণের সুবিধা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ৷'

নুরূল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা যদি আজ ছুটিতে চলে যাই, তাহলে ট্রাফিক দেখবে কে? মানুষের নিরাপত্তা দেখবে কে? লোকজন ভোট দিতে যাচ্ছেন, রাস্তায় গাড়ি আছে, ভিআইপি মুভমেন্টও আছে৷ আমরা রাস্তায় থেকে এসব দায়িত্ব পালন করছি৷’

নিহার বিশ্বাস সবুজের বাড়ি গোপালগঞ্জে৷ ঢাকায় সিকিউরি গার্ডের কাজ করেন৷ রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার একটি এটিএম বুথে তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেল৷ স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘বাড়িতে যেতে চেয়েছিলাম৷ আবেদন করলে ছুটি পাওয়া যেত৷ কিন্তু সবাই যদি ছুটি নিয়ে চলে যায়, তাহলে দায়িত্ব পালন করবে কে?’

হাসপাতালে ভিড় কম, সেবা চলমান

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) গিয়ে দেখা গেছে, রোগীদের আনাগুনা থাকলেও স্বাভাবিকের তুলনায় কম৷ জরুরি বিভাগে ডাক্তাররা বসে আছেন৷ রোগী আসামাত্র তাঁরা চিকিৎসা দিচ্ছেন৷

জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত ডাক্তার শিখা স্ট্রিমকে বলেন, ‘শুধু নির্বাচন না, যে কোনো ছুটির দিনেই হাসপাতালের সেবা চলমান থাকে৷ ঈদ, পূজা ও অন্যান্য ছুটিতেও আমরা দায়িত্ব পালন করি৷ আমরা যারা আশপাশের ভোটার, তারা ভোট দিয়ে এসে দায়িত্ব পালন করছি৷ অনেকে ছুটিতে আছেন৷ পরের কোনো ছুটিতে আমরা বাড়ি যাব আশা করি৷’

নির্বাচনী ছুটিতে বাড়ি না গিয়ে দায়িত্ব পালন করতে কেমন লাগছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা একটা জরুরি সেবা৷ আর মানুষকে জরুরি মুহূর্তে সেবা দেওয়াই আমাদের কাজ৷ এবং এই সেবাকে আমরা মহৎ কাজ হিসেবে দেখি৷ ছুটির দিনেও মানুষের নানা সমস্যা হয়, তাই কোনো মানুষের উপকার করতে পারলে আমাদের ভালো লাগে৷ বাড়ি যাওযার চেয়ে এটা বেশি আনন্দের৷’

ছুটিতে ঢামেকের সামনে বেশ কিছু অ্যাম্বুলেন্স দেখা গেল৷ চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা ঢাকার বাইরের ভোটার, তাঁরা চলে গেছেন৷ ঢাকার ভেতরের ভোটাররা ভোট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন৷

অ্যাম্বুলেন্স চালক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি সকালেই ভোট দিয়েছি৷ ভোট দিয়ে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছি৷ আমরা জরুরি মুহূর্তে মানুষের পাশে থাকি৷ এটা চাকরির চেয়ে বেশি৷ মনবতার অংশ৷ তাই ছুটি নিয়ে আক্ষেপ নেই৷’

আছে টানাপোড়েন

তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ি এলাকায় থাকেন মোহাম্মদ ইসমাঈল৷ তিনি পেশায় রিকশাচালক৷ নির্বাচনের দিনেও রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন তিনি৷ তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নির্বাচনের ছুটিতে সবাই যখন বাড়িতে, তখন রিকশা চালাতে তাঁর ভালো লাগছে না৷

স্ট্রিমকে ইসমাঈল বলেন, ‘আমারও বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল৷ প্রস্তুতিও ছিল৷ কিন্তু গতকাল মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি, বাসভাড়া অনেক বেশি৷ ভোট দেওয়ার জন্য এত টাকা খরচ করার সামর্থ আমার নাই৷ তাই আবার ফিরে এসেছি৷’

বাসা ভাড়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে ইসমাঈল বলেন, ‘আমার বাড়ি গাজীপুর৷ মহাখালী থেকে সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ টাকাতেই বাড়ি যেতে পারি৷ কিন্তু গতকাল গিয়ে দেখি, ৮০ টাকার ভাড়া ৪০০-৫০০ চাচ্ছে৷ ঈদের সময়েও এত টাকা লাগে না৷ বাড়তি ভাড়ার কারণে আমার মতো আরও অনেকেই বাড়ি যেতে পারেন নাই৷ ভোটও দিতে পারে নাই তাঁরা৷’

ক্রেতা নেই তবু দোকান খুলে বসে আছেন আবদুস সাত্তার৷ কারওয়ান বাজারে তাঁর চা-দোকান৷ তিনিও ভোট দিতে যাননি৷ জানতে চাইলে স্ট্রিমকে আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমরা বাড়ি চট্টগ্রামে৷ একবার বাড়ি গিয়ে ঢাকা আসতে ৩ হাজার টাকার প্রয়োজন৷ এত টাকা কোথায় পাবো?’

সাত্তার আরও বলেন, ‘সামনে আবার ঈদ৷ ঈদে বাড়ি যেতে হবে৷ তখন অনেকগুলো টাকা খরচ হবে৷ এখন বাড়ি গিয়ে টাকা খরচ করে ফেললে ঈদে আর বাড়ি যেতে পারব না৷ তাই এবার আর বাড়ি যাওয়া হলো না৷’

Ad 300x250

সম্পর্কিত