জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে সংকটে সাধারণ মানুষ: সিপিডি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ১৫: ৫৩
সিপিডির সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। স্ট্রিম ছবি

দেশে জ্বালানি সংকট ও লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে, যা পারিবারিক বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক পর্যবেক্ষণে এই তথ্য জানিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার পক্ষ থেকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মূলত জ্বালানি, পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই মূল্যস্ফীতি এই পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’

সিপিডির মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পরিসংখ্যান তুলে ধরে সিপিডি জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যবর্তী সময়ে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ সময়ে ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ। এছাড়া পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত পরিবহন খাতে ছড়িয়ে পড়েছে। বাসভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও লাগামহীন হয়ে পড়েছে।

রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম মার্চ মাসের ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জুন মাসে ১ হাজার ৮৮৫ টাকায় ঠেকেছে। অর্থাৎ, স্বল্প সময়ে এই জ্বালানির দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশেরও বেশি।

সিপিডি তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হলে দেশের অর্থনীতি কতটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, এই পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দেয়।

ব্রিফিংয়ে ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন, চলতি অর্থবছরের শেষ ভাগে এসে দেশের আর্থিক, সামাজিক ও উৎপাদনশীল খাতগুলো নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই সংকটগুলো নতুন নয়, বরং বিগত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের চলমান অস্থিরতা ও চাপ থেকে এখনো পুরোপুরি উত্তরণ সম্ভব হয়নি।

অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই বিদ্যমান সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করে সিপিডি।

অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক স্বস্তির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, সেটিকে টেকসই বা দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক ধারা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার ও রূপান্তর ছাড়া এই সাময়িক অর্জনগুলো স্থায়ী হবে না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আপাত স্বস্তির আড়ালে থাকা গভীর দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হলে অবিলম্বে কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ ও কাঠামোগত সংস্কার গ্রহণ করা জরুরি।

সম্পর্কিত