থমথমে শাহ আলী মাজার, হামলাকারীরা শনাক্তও হয়নি

মাজার জিয়ারতকারী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মাজারের বার্ষিক ওরস ঠেকাতে জামায়াত-শিবিরের লোকজন হামলা করেছে। তবে জামায়াতের দাবি, তাদের কেউ এই হামলার সঙ্গে যুক্ত নন।

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ০৪: ২২
ঢাকার মিরপুরে শাহ আলীর মাজারে বৃহস্পতিবার রাতে হামলার ঘটনা ঘটে। ছবি: সংগৃহীত

হামলার পর রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী মাজারে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে৷ ভক্ত, অনুসারীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা গেলেও, হামলার বিচার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আছেন তারা।

গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে মাজারে হামলার ভিডিও-ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, একদল লোক লাঠি হাতে মাজারে হামলা করে লোকজনকে বের করে দিচ্ছেন। এ ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হন।

সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হামলার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। এরই ধারাবাহিকতায় এই হামলা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে শাহ আলীর ভক্তরা আতঙ্কিত।

শুক্রবার (১৫ মে) রাত ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত সরেজমিনে মাজার এলাকায় দেখা যায়, অন্য দিনের মতো ভিড় নেই। কয়েক ভক্ত-আশেকান জড়ো হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন; স্লোগান দিচ্ছেন।

শাহ আলীর অনুসারীরা জানান, মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে কয়েকশ বছরের প্রাচীন শাহ আলী বোগদাদির মাজারে প্রতি বৃহস্পতিবার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জড়ো হন। এদিন ভক্তরা মাজার জিয়ারত ও গান-বাজনা করেন। অনেকে মাজার প্রাঙ্গনে রাত কাটান, যাদের অনেকে শুক্রবার রাতেও থাকেন। তবে হামলার পর মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীরা জানান, হামলাকারীরা মারধর ও গালাগাল করেন। মাজারের সামনে ভক্তদের জ্বালানো মোমবাতি নিভিয়ে আসর ভেঙে দেন। ছোট দোকানিদেরও মারধর করেন এবং মাজার প্রাঙ্গন থেকে বের করে দেন।

আগামী ১৯, ২০, ২১ মে শাহ আলী মাজারের বার্ষিক ওরস। সেই অনুষ্ঠান ঘিরে মাজারে হামলা হয়েছে বলে দাবি মাজার জিয়ারতকারী ও স্থানীয়রা জানিয়ছেন। তাদের অভিযোগ, মাজারের বার্ষিক ওরস ঠেকাতে পরিকল্পিতভাবে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের লোকজন হামলা করেন। তবে জামায়াতে ইসলামের দাবি, তাদের কেউ এই হামলার সঙ্গে যুক্ত নন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শাহ আলীর মুরিদ মোহাম্মদ বাবু স্ট্রিমকে বলেন, ‘কয়েকদিন পরেই শাহ আলী বাবার বার্ষিক ওরস। সেটি বন্ধ করতেই পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছে।’

মাজার প্রাঙ্গণে কথা হয় মুরিদ মঞ্জুরুল ইসলাম খানের সঙ্গে। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘পাঞ্জাবি পরা লোকজন মুুখে মাস্ক পড়ে হামলা করেন। হাতে লাঠি, লোহার রড়, পাইপ ও হকিস্টিক ছিল। স্থানীয়রা তাদের জামায়াতে ইসলামের কর্মী বলে চিহ্নিত করেছেন। মারধর শেষে বের হওয়ার সময় নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার স্লোগান দেন তারা।‘

হামলায় মোহাম্মদ ইবরাহীমের ডান হান ভেঙে গেছে। পঙ্গু হাসপাতাল থেকে প্লাস্টার করিয়ে তিনি বর্তমানে মাজার প্রাঙ্গনেই আছেন। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘এমন হামলা আগে কখনো হয়নি। ৬০-৭০ জন লাঠি-সোটা নিয়ে হঠাৎ আমাদের মারধর শুরু করে। মাফ চেয়েও বাঁচতে পারিনি।’

মাজারের ভক্ত মোছাম্মৎ নাজমা বেগম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি মাজারের দক্ষিণ পাশে ছিলাম। হামলা শুরু হলে আমরা নারীদের জিয়ারত শেটে ঢুকে পড়ি। যারা ঢুকতে পারেনি, তাদের ওরা মারধর করেছে।‘

তিনি বলেন, ‘শেটে ঢোকার পর আমরা গেটে তালা দিয়ে দিই। তখন তাঁরা গেটের সামনে এসে গালাগলি করে। অনেকে গ্রিল টপকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। পরে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে সরে পড়ে।’

এ ঘটনায় শুক্রবার রাত ১০টা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘কারা হামলা চালিয়েছে, তা আমরা তদন্ত করছি। তবে এখনো কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।’

জামায়াত-শিবিরের লোকজন হামলা করেছে বলে তারাও শুনেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের দারুস সালাম জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ইমদাদ হোসাইন বলেন, ‘আমরা সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছি৷ অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি৷’

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মুসা স্ট্রিমকে বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের লোকদের এটা করবার কথা না। এমন কাজ আমরা কেন করব? আমাদের ইতিহাসে এমন কাজ করার কোনো নজির নাই। এই কাজের সঙ্গে জামায়াতের লোকজনের কোনো সম্পর্ক নেই।’

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত