পথের কুকুর তুলে নিচ্ছে ‘ডিএসসিসি’, দিচ্ছে হুমকি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ২১: ০২
ডিএসসিসির কর্মী পরিচয়ে তিন দিনে অন্তত ৩২টি কুকুর তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মী পরিচয়ে তিন দিনে অন্তত ৩২টি কুকুর তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর আজিমপুর ও নাজিমুদ্দিন রোডের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, ইনজেকশন দিয়ে অচেতন করে তাদের এলাকার কুকুর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে তারা ডিএসসিসির পরিচয়পত্র দেখিয়ে বাড়াবাড়ি করলে পুলিশে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুস সালাম স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, কেন ও কারা এভাবে কুকুর তুলে আনছেন, তা তিনি জানেন না। ডিএসসিসির কর্মীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজিমপুর সরকারি আবাসন এলাকা থেকে গত ৫ মে ১৫টি কুকুর তুলে নেওয়া হয়। এরপর গত ১১ মে একই এলাকার ১২টি কুকুর নিয়ে যায় একদল লোক। পুরোনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোড থেকে গত ১৩ মে অন্তত পাঁচটি কুকুর তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এসব এলাকার বাসিন্দারা স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, ভ্যান সঙ্গে আনেন একদল লোক। তাদের গায়ে কোনো ইউনিফর্ম নেই। প্রথমে তারা কুকুরের শরীরে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করেন। এরপর ভ্যানে করে সেগুলো নিয়ে যান।

আজিমপুর সরকারি আবাসন এলাকা থেকে দুই দিনে ২৭টি কুকুর তুলে নেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত
আজিমপুর সরকারি আবাসন এলাকা থেকে দুই দিনে ২৭টি কুকুর তুলে নেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

আজিমপুর সরকারি আবাসের বাসিন্দা স্মৃতা দে স্ট্রিমকে বলেন, ‘আবাসন থেকে দুই দিনে অন্তত ২৭টি কুকুর নিয়ে গেছে। আমি জানতে চাইলে তাঁরা ডিএসসিসির কর্মী পরিচয় দেন। কেন তুলে নিচ্ছেন– প্রশ্নে তাঁরা নানা অভিযোগ করেন, যার কোনো ভিত্তি নেই। আমি কুকুরগুলো দেখাশোনা করাসহ খাবার দিতাম। আমিই তাদের ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম।’

নাজিমউদ্দিন রোড থেকে কুকুর নেওয়ার একটি ভিডিও বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, কয়েকজন কুকুরকে ইনজেকশন দিচ্ছেন। অচেতন হলে ভ্যানে জড়ো করে নিয়ে যাচ্ছেন।

নাজিমুদ্দিন রোডের প্রত্যক্ষদর্শী আলিসা আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, বুধবার (১৩ মে) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হইচই শুনে ঘুম থেকে জেগে দেখি– কয়েকজন মিলে অন্তত পাঁচটি কুকুর ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছেন। দৌড়ে নিচে গিয়ে জানতে চাইলে তাঁরা ডিএসসিসির কর্মী পরিচয় দেন। এভাবে নিতে পারেন না– বললে তাঁরা ডিএসসিসির আইডি কার্ড দেখিয়ে হুমকি দেন– বেশি বাড়াবাড়ি করলে পুলিশে দেওয়া হবে।

প্রতিকার চাওয়ায় হেনস্তা

আজিমপুর সরকারি আবাসন থেকে কুকুর তুলে নেওয়ার পর ডিএসসিসির অঞ্চল-৩ এর অফিসে যান স্মৃতা দে। বেআইনিভাবে কুকুর নিধন বন্ধে লিখিত আবেদন করতে চান তিনি। তবে আবেদনপত্র না নিয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সুজাউদ্দৌলা হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ এই নারীর।

তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আবাসন থেকে কুকুর নিয়ে যাওয়ার পর আমি লিখিত আবেদন নিয়ে ডিএসসিসির আঞ্চলিক অফিসে যাই। আবেদনপত্র নেননি, উল্টো অঞ্চলের নির্বাহী কর্মকর্তা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।’

জানতে চাইলে সুজাউদ্দৌলা স্ট্রিমকে বলেন, ‘কুকুর কোথা থেকে কোথায় যাবে, তা দেখার কাজ আমার নয়। এ নিয়ে নাগরিকদের চিন্তারও কিছু নাই।’ স্মৃতা দের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কল কেটে দেন।

কুকুর তুলে নেওয়ার বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
কুকুর তুলে নেওয়ার বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

কুকুর নিধন বন্ধের আহ্বান

পথের কুকুর নিধন বন্ধের দাবি তুলেছেন পশুপ্রেমীরা। তাঁরা বলছেন, কুকুর অপসারণ কিংবা নিধন বিপজ্জনক। কারণ এটি পরিবেশ দূষণ ও রোগ সংক্রমণের বড় কারণ। বাস্তুসংস্থানে জীবিত নির্দিষ্ট একটি প্রজাতির সঙ্গে পরিবেশগত নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নির্বিচারে কুকুর নিধন এই ভারসাম্য নষ্ট করে।

পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রাকিবুল হক এমিল স্ট্রিমকে বলেন, কুকুর নিধনের পেছনে শিশুদের কামড়ানোর উদাহরণ টানা হয়। কুকুর মেরে ফেলা তো এই বিষয়ের সমাধান হতে পারে না। বৈজ্ঞানিক উপায়ে অনেক সমাধান রয়েছে। প্রশাসনের উচিত সেসব পদক্ষেপ নেওয়া।

তিনি বলেন, শুধু মানুষ নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের জানা উচিত, তার এলাকার সব প্রাণীর বিষয়ে। কুকুরগুলো কারা তুলে নিচ্ছে, কেন নিচ্ছে, এগুলো মেরে ফেলা হচ্ছে নাকি হোটেলে মাংস হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে– তাদেরই খুঁজে বের করা উচিত।

পুরোনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোড থেকে গত ১৩ মে অন্তত পাঁচটি কুকুর ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত
পুরোনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোড থেকে গত ১৩ মে অন্তত পাঁচটি কুকুর ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

অভয়ারণ্য-বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদ বলেন, কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে কুকুর তুলে নেওয়ার চেষ্টা হয়। আমরা প্রতিবাদ করলে তারা সটকে পড়েন। যাঁরা এসব করছেন, গায়ে ইউনিফর্ম না থাকায় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। নাগরিকদের সচেতনতা ছাড়া কুকুর নিধন বন্ধ করা সম্ভব নয়।

এএলবি অ্যানিমেল শেল্টারের প্রতিষ্ঠাতা দীপান্বিতা রিদি স্ট্রিমকে বলেন, ২০২০-২১ সালে ডিএসসিসি যখন কুকুর তুলে নিত, তখনও তারা সবকিছু অস্বীকার করত। বর্তমানে একই প্যাটার্নে এসব হচ্ছে। এসব না করে থাকলে ডিএসসিসির স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে তদন্ত করে তাদের প্রকৃত দোষীদের বের করা দরকার।

সম্পর্কিত