লাগেজে আসছে ভিনদেশি বন্য প্রাণী, অনলাইনে বাণিজ্য

সম্প্রতি অভিযানে রূপ নগর থেকে অভিযানে উদ্ধার হওয়া দক্ষিণ–পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রের কর্ন স্নেক ও সি মেক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক সংগৃহীত ছবি

প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে যাত্রীদের লাগেজে লুকিয়ে দেশে ঢুকছে নানা প্রজাতির ভিনদেশি বন্য প্রাণী। ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়াতে হাটে-বাজারের বদলে এসব প্রাণীর বাণিজ্য চলছে অনলাইনে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যথাযথ অনুমোদন ও কোয়ারেন্টিন (সঙ্গনিরোধ) ছাড়াই অবৈধভাবে আনা এসব প্রাণী দেশীয় পরিবেশ, প্রতিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর রূপনগরের একটি বাসা থেকে ১ হাজার ১০৪টি বিদেশি বন্য প্রাণী উদ্ধার করে বন বিভাগের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট (ডব্লিউসিসিইউ)। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যালায়েন্সের (বিডব্লিউএ) সহায়তায় পরিচালিত ওই অভিযানে কাজী সাজিদ উল্লাহ দস্তগীর (৩৫) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর মুঠোফোন ঘেঁটে অনলাইনে প্রাণী কেনাবেচার প্রমাণ পান তদন্তকারীরা।

কেন ও কীভাবে আসছে এসব প্রাণী

দেশে বিদেশি বন্য প্রাণী আমদানি নিষিদ্ধ নয়। তবে এর জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, লাইসেন্স ও কোয়ারেন্টিন সনদ বাধ্যতামূলক। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের (ডব্লিউসিসিইউ) পরিচালক মিজানুর রহমান স্ট্রিমকে জানান, সাধারণত কচ্ছপ, সাপ, মাকড়সা বা ব্যাঙের মতো ছোট আকারের প্রাণীগুলো যাত্রীদের লাগেজে লুকিয়ে বা সীমান্তপথে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে আনা হয়। রূপনগর থেকে উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর ক্ষেত্রে কোনো নিয়মই মানা হয়নি।

বাংলাদেশে বিদেশি প্রাণী পালনের প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি এ দেশটিকে পাচারের ট্রানজিট বা রুট হিসেবেও ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (বাওয়া) আহ্বায়ক আদনান আজাদের মতে, অনুমতির আড়ালেই অবৈধ প্রাণী দেশে আনছেন অনেকে।

বিমানবন্দরে সোনার মতো অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে কড়া নজরদারি থাকলেও পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। আদনান আজাদ বলেন, ‘বিদেশ থেকে আসা প্রাণীদের একটি অংশ দেশের শৌখিন পালকদের কাছে বিক্রি হয়। অবাক করার মতো বিষয় হলো, আফ্রিকার ব্যাঙ, বিষাক্ত ট্যারান্টুলা (মাকড়সা) কিংবা ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিংস্নেকও দেশের অনেকে এখন শখের বশে পুষছেন। আর প্রাণীদের আরেকটি অংশ থাইল্যান্ড বা অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশে ঢুকে চোরাইপথে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যায়।’

উদ্ধার হওয়া ডাম্পি ফ্রগ ও গোল্ডেন চাকুনি ট্যারান্টুলা। সংগৃহীত ছবি
উদ্ধার হওয়া ডাম্পি ফ্রগ ও গোল্ডেন চাকুনি ট্যারান্টুলা। সংগৃহীত ছবি

অনলাইনে রমরমা বাণিজ্য

বন্য প্রাণী কেনাবেচায় পাচারকারীরা এখন নতুন কৌশল হিসেবে অনলাইনকে বেছে নিয়েছে। মিজানুর রহমান জানান, হাটে বা বাজারে প্রাণী বিক্রি হলে খবর পাওয়া মাত্রই অভিযান চালানো সহজ হয়। কিন্তু অনলাইনে বিক্রি হলে প্রাণীগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

অপরাধীদের এমন অনলাইন কার্যক্রম রুখতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কারিগরি দক্ষতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ডব্লিউসিসিইউয়ের এই পরিচালক।

দেশীয় প্রতিবেশে বড় হুমকি

রূপনগরে উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্ন সাপ, মেক্সিকান ব্ল্যাক কিংস্নেক, ট্যারান্টুলা, ডাম্পি ব্যাঙ, লেপার্ড গেকো এবং বিপুলসংখ্যক রেড-ইয়ার্ড স্লাইডার ও স্ন্যাপিং কচ্ছপ। বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাকুরিয়ামে পালনের জন্য আনা হলেও এসব প্রাণী দেশীয় পরিবেশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

কোভিড-১৯ মহামারির উদাহরণ টেনে বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, বিদেশ থেকে আসা প্রাণীর শরীরে ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। কোয়ারেন্টিন ছাড়া দেশে প্রবেশ করলে তা অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

তিনি আরও জানান, এসব প্রাণীর মধ্যে বেশ কিছু প্রজাতি অত্যন্ত আগ্রাসী। এগুলো কোনোভাবে উন্মুক্ত জলাশয় বা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে দেশীয় ছোট প্রাণীদের খেয়ে ফেলবে। এতে দেশের নিজস্ব ইকোসিস্টেম বা খাদ্যশৃঙ্খল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোকে দেশীয় পরিবেশে অবমুক্ত না করে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

আইনের প্রয়োগ ও জনসচেতনতা

উদ্ধার হওয়া প্রাণীর বিষয়ে বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-এর ৩৩ ধারায় রূপনগর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মিজানুর রহমান জানান, নতুন এই আইনে বন বিভাগের পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি, কাস্টমস ও কোস্টগার্ডকেও বন্য প্রাণী সংক্রান্ত অপরাধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যা বন্য প্রাণী অপরাধ দমনে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে প্রাণী আনার অপরাধটি জামিনযোগ্য হলেও এর জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বন্য প্রাণী পাচার রোধে আইনের পাশাপাশি জনসচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শখের বশে বিদেশি প্রাণী কেনার আগে সেটি বৈধ পথে এসেছে কি না, তা যাচাই করা ক্রেতার দায়িত্ব। কেউ বন্য প্রাণী অপরাধের সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করলে বন বিভাগের ‘তথ্য প্রদানকারী পুরস্কার বিধিমালা’ অনুযায়ী তাঁকে আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে বাওয়ার আহ্বায়ক আদনান আজাদ বলেন, বিমানবন্দরে ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের একটি কার্যালয় স্থাপন করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসত। কারণ, অনেক বৈধ প্রাণীও দেশে আসে, আর কাস্টমস কর্মকর্তাদের পক্ষে সব সময় বৈধ-অবৈধ বন্য প্রাণী সঠিকভাবে চেনা সম্ভব হয় না।

Ad 300x250

সম্পর্কিত