সুমন সাজ্জাদ

তখন আমি কলেজবর্ষীয় তরুণ। থাকি একটা সাদামাটা মফস্বলে। কবিতা লিখি। বই পড়ি। আমাদের সেই গরিব শহরে সাম্প্রতিক বইপুস্তক পাওয়া ছিল বিস্ময়কার ঘটনা। একদিন খুব আচমকাই শহরতুতো সম্পর্কের এক অগ্রজের কাছে পেয়েছিলাম একটি পত্রিকা, নাম ‘লোকায়ত’। সম্পাদক আবুল কাসেম ফজলুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। পুরনোপন্থী নাম শুনে অনুমান করেছিলাম—নিঃসন্দেহে পুরনো দিনের মানুষ।
আমরা তখন ছোটকাগজের মোহে আচ্ছন্ন। বড় কাগজও পড়ি। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হকের কোনো লেখা তখনও পড়ি নি—না ছোট কাগজে, না বড় কাগজে। ‘লোকায়ত’-এর পাতায় প্রথম পড়লাম তাঁকে। মনে হলো, তাঁর আগ্রহ যতো না শিল্পের দিকে, তার চেয়ে আগ্রহ সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে। আমরা তখন ‘শিল্পের জন্য শিল্পে’র দলভুক্ত, প্রায় দীক্ষিতভাবেই শিল্পের দাস। আবুল কাসেম ফজলুল হককে তাই ভালো লাগল না। মনে হলো জড়াগ্রস্ত বৃদ্ধের নৈতিক নসিহত। আরও এও বোঝা গেল, শিল্পের তুলনায় ‘জীবন’ তাঁর কাছে বরাবরই উর্ধ্বাসনে। তাছাড়া তাঁর গদ্যও কেমন খসখসে, নিষ্প্রাণ—সৌন্দর্যে আভা নেই, আলোড়ন নেই। নব্বইয়ের দশকে ‘লোকায়তে’র বেশ কিছু সংখ্যা পড়ে এই ধরনের এক বোঝাপড়ার দিকে আমরা গিয়েছিলাম।
অবশ্য এই ভাবনার পেছনে আরও একটা কারণ আছে; তা হলো আমাদের হাতে উঠে আসতো আবুল কাসেম ফজলুল হকের লেখা বেশ কিছু প্রচার-পুস্তিকা। ওইসব পুস্তিকায় ছাপা হতো ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রূপরেখা, সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের সমালোচনা, বিশ্বায়নের সংকট ইত্যাদি। লেখালেখি, বুদ্ধিজীবিতা ও অ্যাক্টিভিজমের সম্পর্ক ধরার মতো সহৃদয় হৃদয় ও মস্তিষ্ক আমাদের ছিল কি?
সত্যি কথাটা হলো, আমরা তখন আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের প্রলোভনে মত্ত হয়ে আছি। এরই মাঝখানে শুনতে পাচ্ছি, উত্তর-আধুনিকতাবাদের হাতছানি। ওই সময়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর থেকে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সম্পাদনায় বেরুচ্ছে কবিতার পত্রিকা ‘একবিংশ’। ঘটনাচক্রে এই পত্রিকাও আমাদের হাতে হাতে ঘোরে। কেননা বাগদেবীর কৃপায় আমাদের ওই মফস্বল কবিদের তীর্থভূমি। আর তাই আমরা দেখতে পেলাম ‘লোকায়ত’ যখন নীতিগর্ভ সামাজিক সন্দর্ভের পাশাপাশি আহমদ ছফার কবিতা ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ ছাপছে, ‘একবিংশ’ পত্রিকা তখন ছাপছে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিকের বাহাস। হুমায়ুন আজাদের আধুনিক কবিতার সংকলনকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে তিরবিদ্ধ করা হচ্ছে। আমাদের মতো কবিতাপ্রেমীদের জন্য দারুণ খোরাক। ঠিক তখন ‘একবিংশ’-এর পাশে ‘লোকায়ত’কে মনে হয়েছিল নিতান্তই বেখাপ্পা আর উটকো। তবে ‘লোকায়তে’র কোনো এক সংখ্যার শেষপ্রচ্ছদে কিংবা মধ্যবর্তী কোনো অংশে মুদ্রিত তরুণদের প্রতি আহ্বান ছিল চটকদার—অনেকটা ষাটের দশকের ‘কণ্ঠস্বরে’র মতো।
সম্ভবত ‘লোকায়তে’র পাতায়ই পড়েছিলাম সাঁত বভের ‘ক্লাসিক কী’; কবিতা লেখার প্রথম দিনগুলোতে প্রবন্ধটি কাজে দিয়েছিল। ‘লোকায়ত’ এবং আবুল কাসেম ফজলুল হককে নিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া প্রশমিত হলো কিছু দিন পরেই। তাছাড়া ততোদিন আমি তো ‘লোকায়ত’ পত্রিকায় লিখেও ফেলেছি এক টুকরো লেখা। একটি বুক-রিভিউ। আর কোনোদিন লিখিনি।
তালকানা আমরা ততো দিনে ঠিক বুঝে গেছি, শিল্প-সাহিত্য কিংবা রাজনীতির ইস্তেহার যা-ই বলুক না কেন শিল্প অথবা জীবন কারো ব্যাকরণই চূড়ান্ত ছাড়পত্র বিদ্যমান থাকে না। জীবনানন্দ দাশের জন্মশতবর্ষে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় পড়লাম ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’; এই নামে পরে বইও প্রকাশিত হয়েছিল।
একদিন নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে কুড়িয়ে পাওয়ার মতো করেই পেয়ে গেলাম আবুল কাসেম ফজলুল হকের ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’। মলিন মলাটের সেই পুরোনো বইটি ঘেঁটে দেখলাম পূর্ববাংলার হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত। কখন কীভাবে যেন হাতে এলো আরও কিছু বই—‘সাহিত্যচিন্তা’, ‘মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব’, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাংলা সাহিত্য’। বিভিন্ন প্রয়োজন আর উপলক্ষে বইগুলো পড়েছি। পড়তে পড়তে কল্পনা করেছি সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য আর রাষ্ট্রকে মর্মে মর্মে বুঝবার আকুলতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন একজন, যার পিঠে ইতিহাসের দীর্ঘ ভার। অক্লান্তভাবে সেই ভার তিনি বইছেন, বইছেন আর বইছেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের একটা লক্ষ্য আছে—ইতিহাসকে ঘুরিয়ে দেওয়া, জনতার পক্ষে গিয়ে পাশে দাঁড়ানো, জনতার জন্যেই নিবিড়ভাবে কাজ করে যাওয়া। তিনি সফল হবেন কি না, তা তিনি জানেন না। কিন্তু তিনি থামছেন না, হতাশায় মুষড়ে পড়ছেন না। যেন আরও কাজ বাকি পড়ে আছে, সেগুলো সমাপ্ত করতে হবে। হয়তো তাই পুরাণের সিসিফাসের মতো সহনপ্রবণতা নিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক বোঝা ঠেলতে থাকেন। তাঁর বইগুলো মূলত এই ধরনের চিন্তা ও কাজের প্রতিফলন। কাজ যে গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ ‘লোকায়ত’ পত্রিকাটি; নিরন্তর চেষ্টা ছিল প্রকাশনাটিকে বাঁচিয়ে রাখার। আর ছোট ছোট পুস্তিকাসমেত মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ভঙ্গিটিই-বা কম কী।
প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে সাহিত্যকে পড়ার উদ্যোগও তো কাজ। সেই লক্ষ্যেই আবুল কাসেম ফজলুল হক হেঁটে যান ভিন্ন পথে। তিনি সাহিত্যকে পাঠ করতে চান রাজনীতির আলোয়। অর্থাৎ প্রস্তুত করতে চান সাহিত্যের রাজনৈতিক পাঠ। বাংলাদেশের বিদ্যায়তনিক সাহিত্য-গবেষকরা এই ধারার প্রতি তেমন একটা উৎসাহী নন। মুখ্যত সামাজিক বাস্তবতা, শিল্পরীতি আর ভাষারীতি খোঁজার বৃত্তে ঘুরপাক খায় বিদ্যায়তনিক আলাপ ও গবেষণা। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হককে দেখা গেছে বিপরীত বিন্দুতে। তাঁর লেখা রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে আশ্রয় করে ক্ষমতাকে নিরন্তর প্রশ্ন করে যায়। অবশ্য এই প্রবণতা তাঁকে ব্যাখ্যার গণ্ডিতেও আটকে ফেলেছে। শিল্পের ‘শিল্পত্ব’ অনেক সময়ই গুরুত্ব পায় নি। ব্যাখ্যার তলজুড়ে থেকে গেছে কেবলই রাজনীতি।
এক অর্থে, আবুল কাসেম ফজলুল হক সাহিত্যকে পড়তে চেয়েছেন ক্ষমতার সমালোচনা হিসেবেই। তাঁকে তাই পথ খুঁড়তে দেখি মধ্যবিত্তের শ্রেণিচরিত্র অনুসন্ধানে। মূলত মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন করে তিনি সমাজ ও সংস্কৃতিকে বুঝতে চেয়েছেন তেমন করেই তাঁর সাহিত্য ব্যাখ্যার মাপকাঠিও হয়ে উঠেছে মার্কসবাদ। ধ্রুপদী মার্কসবাদীদের মতো করে উপরি-কাঠামো ও ভিত্তি-কাঠামোর ভেতরই তিনি সাহিত্যকে স্থাপন করেন। তিনি এমন এক সমাজ ও রাষ্ট্রের কথা ভাবেন যে সমাজ ও রাষ্ট্র হবে প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, উন্নত, আধুনিক, কিন্তু অ-পুঁজিবাদী। মনে রাখার মতো ব্যাপার এই যে, আবুল কাসেম ফজলুল হক রেনেসাঁ, ও আলোকপর্বের উজ্জ্বলতাকে কখনোই অস্বীকার করেননি। সেই সূত্রেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের উত্তরপ্রজন্মের প্রতিনিধি। কিন্তু আলো কি তাঁরা জ্বালাতে পেরেছেন?
একদিন আমরা নিশ্চয়ই এই মূল্যায়নের দিকেও যেতে পারব। আপাতত তা অন্য কোনো দিনের জন্য তোলা থাক। তবে একথা বলতেই হয়—বিপ্লবী, উদার, প্রগতিশীল, আধুনিক ও সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ ‘বাঙালিত্ব’কে তাঁরা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার চূড়ান্ত প্রকাশ। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে পূর্ববঙ্গের মানুষের এই পরিগঠনের ইতিহাসে আবুল কাসেম ফজলুল হক নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল।
শেষপর্যন্ত মানুষ তো হারিয়েই যায়, হারিয়ে যেতেই হয়। অনিবার্য এই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ তবু দীর্ঘায়ু হয়। সেই হিসেবে আবুল কাসেম ফজলুল হক পার করেছেন লম্বা একটা সময়। খুব আকস্মিকভাবে আজ তিনি প্রয়াত হলেন। কে তিনি? লেখক, বুদ্ধিজীবী, সমাজ বিশ্লেষক, রাজনীতির ভাষ্যকার, অধ্যাপক? মন বলছে, হারিয়ে গেলেন বাংলাদেশের উত্থানপর্বের স্বর্ণযুগের শেষ মানুষদের একজন—যাঁরা প্রশ্নহীনভাবে দেশকে ভালোবাসতে পেরেছিলেন, জনমানুষের প্রতি যাঁরা ছিলেন আদি-অন্ত সমর্পিত, পূর্ববঙ্গের মানুষের রাষ্ট্রবাসনাকে যাঁরা মর্মের মহলজুড়ে জায়গা দিয়েছিলেন।

তখন আমি কলেজবর্ষীয় তরুণ। থাকি একটা সাদামাটা মফস্বলে। কবিতা লিখি। বই পড়ি। আমাদের সেই গরিব শহরে সাম্প্রতিক বইপুস্তক পাওয়া ছিল বিস্ময়কার ঘটনা। একদিন খুব আচমকাই শহরতুতো সম্পর্কের এক অগ্রজের কাছে পেয়েছিলাম একটি পত্রিকা, নাম ‘লোকায়ত’। সম্পাদক আবুল কাসেম ফজলুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। পুরনোপন্থী নাম শুনে অনুমান করেছিলাম—নিঃসন্দেহে পুরনো দিনের মানুষ।
আমরা তখন ছোটকাগজের মোহে আচ্ছন্ন। বড় কাগজও পড়ি। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হকের কোনো লেখা তখনও পড়ি নি—না ছোট কাগজে, না বড় কাগজে। ‘লোকায়ত’-এর পাতায় প্রথম পড়লাম তাঁকে। মনে হলো, তাঁর আগ্রহ যতো না শিল্পের দিকে, তার চেয়ে আগ্রহ সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে। আমরা তখন ‘শিল্পের জন্য শিল্পে’র দলভুক্ত, প্রায় দীক্ষিতভাবেই শিল্পের দাস। আবুল কাসেম ফজলুল হককে তাই ভালো লাগল না। মনে হলো জড়াগ্রস্ত বৃদ্ধের নৈতিক নসিহত। আরও এও বোঝা গেল, শিল্পের তুলনায় ‘জীবন’ তাঁর কাছে বরাবরই উর্ধ্বাসনে। তাছাড়া তাঁর গদ্যও কেমন খসখসে, নিষ্প্রাণ—সৌন্দর্যে আভা নেই, আলোড়ন নেই। নব্বইয়ের দশকে ‘লোকায়তে’র বেশ কিছু সংখ্যা পড়ে এই ধরনের এক বোঝাপড়ার দিকে আমরা গিয়েছিলাম।
অবশ্য এই ভাবনার পেছনে আরও একটা কারণ আছে; তা হলো আমাদের হাতে উঠে আসতো আবুল কাসেম ফজলুল হকের লেখা বেশ কিছু প্রচার-পুস্তিকা। ওইসব পুস্তিকায় ছাপা হতো ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রূপরেখা, সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের সমালোচনা, বিশ্বায়নের সংকট ইত্যাদি। লেখালেখি, বুদ্ধিজীবিতা ও অ্যাক্টিভিজমের সম্পর্ক ধরার মতো সহৃদয় হৃদয় ও মস্তিষ্ক আমাদের ছিল কি?
সত্যি কথাটা হলো, আমরা তখন আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের প্রলোভনে মত্ত হয়ে আছি। এরই মাঝখানে শুনতে পাচ্ছি, উত্তর-আধুনিকতাবাদের হাতছানি। ওই সময়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর থেকে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সম্পাদনায় বেরুচ্ছে কবিতার পত্রিকা ‘একবিংশ’। ঘটনাচক্রে এই পত্রিকাও আমাদের হাতে হাতে ঘোরে। কেননা বাগদেবীর কৃপায় আমাদের ওই মফস্বল কবিদের তীর্থভূমি। আর তাই আমরা দেখতে পেলাম ‘লোকায়ত’ যখন নীতিগর্ভ সামাজিক সন্দর্ভের পাশাপাশি আহমদ ছফার কবিতা ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ ছাপছে, ‘একবিংশ’ পত্রিকা তখন ছাপছে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিকের বাহাস। হুমায়ুন আজাদের আধুনিক কবিতার সংকলনকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে তিরবিদ্ধ করা হচ্ছে। আমাদের মতো কবিতাপ্রেমীদের জন্য দারুণ খোরাক। ঠিক তখন ‘একবিংশ’-এর পাশে ‘লোকায়ত’কে মনে হয়েছিল নিতান্তই বেখাপ্পা আর উটকো। তবে ‘লোকায়তে’র কোনো এক সংখ্যার শেষপ্রচ্ছদে কিংবা মধ্যবর্তী কোনো অংশে মুদ্রিত তরুণদের প্রতি আহ্বান ছিল চটকদার—অনেকটা ষাটের দশকের ‘কণ্ঠস্বরে’র মতো।
সম্ভবত ‘লোকায়তে’র পাতায়ই পড়েছিলাম সাঁত বভের ‘ক্লাসিক কী’; কবিতা লেখার প্রথম দিনগুলোতে প্রবন্ধটি কাজে দিয়েছিল। ‘লোকায়ত’ এবং আবুল কাসেম ফজলুল হককে নিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া প্রশমিত হলো কিছু দিন পরেই। তাছাড়া ততোদিন আমি তো ‘লোকায়ত’ পত্রিকায় লিখেও ফেলেছি এক টুকরো লেখা। একটি বুক-রিভিউ। আর কোনোদিন লিখিনি।
তালকানা আমরা ততো দিনে ঠিক বুঝে গেছি, শিল্প-সাহিত্য কিংবা রাজনীতির ইস্তেহার যা-ই বলুক না কেন শিল্প অথবা জীবন কারো ব্যাকরণই চূড়ান্ত ছাড়পত্র বিদ্যমান থাকে না। জীবনানন্দ দাশের জন্মশতবর্ষে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় পড়লাম ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’; এই নামে পরে বইও প্রকাশিত হয়েছিল।
একদিন নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে কুড়িয়ে পাওয়ার মতো করেই পেয়ে গেলাম আবুল কাসেম ফজলুল হকের ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’। মলিন মলাটের সেই পুরোনো বইটি ঘেঁটে দেখলাম পূর্ববাংলার হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত। কখন কীভাবে যেন হাতে এলো আরও কিছু বই—‘সাহিত্যচিন্তা’, ‘মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব’, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাংলা সাহিত্য’। বিভিন্ন প্রয়োজন আর উপলক্ষে বইগুলো পড়েছি। পড়তে পড়তে কল্পনা করেছি সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য আর রাষ্ট্রকে মর্মে মর্মে বুঝবার আকুলতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন একজন, যার পিঠে ইতিহাসের দীর্ঘ ভার। অক্লান্তভাবে সেই ভার তিনি বইছেন, বইছেন আর বইছেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের একটা লক্ষ্য আছে—ইতিহাসকে ঘুরিয়ে দেওয়া, জনতার পক্ষে গিয়ে পাশে দাঁড়ানো, জনতার জন্যেই নিবিড়ভাবে কাজ করে যাওয়া। তিনি সফল হবেন কি না, তা তিনি জানেন না। কিন্তু তিনি থামছেন না, হতাশায় মুষড়ে পড়ছেন না। যেন আরও কাজ বাকি পড়ে আছে, সেগুলো সমাপ্ত করতে হবে। হয়তো তাই পুরাণের সিসিফাসের মতো সহনপ্রবণতা নিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক বোঝা ঠেলতে থাকেন। তাঁর বইগুলো মূলত এই ধরনের চিন্তা ও কাজের প্রতিফলন। কাজ যে গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ ‘লোকায়ত’ পত্রিকাটি; নিরন্তর চেষ্টা ছিল প্রকাশনাটিকে বাঁচিয়ে রাখার। আর ছোট ছোট পুস্তিকাসমেত মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ভঙ্গিটিই-বা কম কী।
প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে সাহিত্যকে পড়ার উদ্যোগও তো কাজ। সেই লক্ষ্যেই আবুল কাসেম ফজলুল হক হেঁটে যান ভিন্ন পথে। তিনি সাহিত্যকে পাঠ করতে চান রাজনীতির আলোয়। অর্থাৎ প্রস্তুত করতে চান সাহিত্যের রাজনৈতিক পাঠ। বাংলাদেশের বিদ্যায়তনিক সাহিত্য-গবেষকরা এই ধারার প্রতি তেমন একটা উৎসাহী নন। মুখ্যত সামাজিক বাস্তবতা, শিল্পরীতি আর ভাষারীতি খোঁজার বৃত্তে ঘুরপাক খায় বিদ্যায়তনিক আলাপ ও গবেষণা। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হককে দেখা গেছে বিপরীত বিন্দুতে। তাঁর লেখা রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে আশ্রয় করে ক্ষমতাকে নিরন্তর প্রশ্ন করে যায়। অবশ্য এই প্রবণতা তাঁকে ব্যাখ্যার গণ্ডিতেও আটকে ফেলেছে। শিল্পের ‘শিল্পত্ব’ অনেক সময়ই গুরুত্ব পায় নি। ব্যাখ্যার তলজুড়ে থেকে গেছে কেবলই রাজনীতি।
এক অর্থে, আবুল কাসেম ফজলুল হক সাহিত্যকে পড়তে চেয়েছেন ক্ষমতার সমালোচনা হিসেবেই। তাঁকে তাই পথ খুঁড়তে দেখি মধ্যবিত্তের শ্রেণিচরিত্র অনুসন্ধানে। মূলত মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন করে তিনি সমাজ ও সংস্কৃতিকে বুঝতে চেয়েছেন তেমন করেই তাঁর সাহিত্য ব্যাখ্যার মাপকাঠিও হয়ে উঠেছে মার্কসবাদ। ধ্রুপদী মার্কসবাদীদের মতো করে উপরি-কাঠামো ও ভিত্তি-কাঠামোর ভেতরই তিনি সাহিত্যকে স্থাপন করেন। তিনি এমন এক সমাজ ও রাষ্ট্রের কথা ভাবেন যে সমাজ ও রাষ্ট্র হবে প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, উন্নত, আধুনিক, কিন্তু অ-পুঁজিবাদী। মনে রাখার মতো ব্যাপার এই যে, আবুল কাসেম ফজলুল হক রেনেসাঁ, ও আলোকপর্বের উজ্জ্বলতাকে কখনোই অস্বীকার করেননি। সেই সূত্রেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের উত্তরপ্রজন্মের প্রতিনিধি। কিন্তু আলো কি তাঁরা জ্বালাতে পেরেছেন?
একদিন আমরা নিশ্চয়ই এই মূল্যায়নের দিকেও যেতে পারব। আপাতত তা অন্য কোনো দিনের জন্য তোলা থাক। তবে একথা বলতেই হয়—বিপ্লবী, উদার, প্রগতিশীল, আধুনিক ও সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ ‘বাঙালিত্ব’কে তাঁরা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার চূড়ান্ত প্রকাশ। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে পূর্ববঙ্গের মানুষের এই পরিগঠনের ইতিহাসে আবুল কাসেম ফজলুল হক নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল।
শেষপর্যন্ত মানুষ তো হারিয়েই যায়, হারিয়ে যেতেই হয়। অনিবার্য এই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ তবু দীর্ঘায়ু হয়। সেই হিসেবে আবুল কাসেম ফজলুল হক পার করেছেন লম্বা একটা সময়। খুব আকস্মিকভাবে আজ তিনি প্রয়াত হলেন। কে তিনি? লেখক, বুদ্ধিজীবী, সমাজ বিশ্লেষক, রাজনীতির ভাষ্যকার, অধ্যাপক? মন বলছে, হারিয়ে গেলেন বাংলাদেশের উত্থানপর্বের স্বর্ণযুগের শেষ মানুষদের একজন—যাঁরা প্রশ্নহীনভাবে দেশকে ভালোবাসতে পেরেছিলেন, জনমানুষের প্রতি যাঁরা ছিলেন আদি-অন্ত সমর্পিত, পূর্ববঙ্গের মানুষের রাষ্ট্রবাসনাকে যাঁরা মর্মের মহলজুড়ে জায়গা দিয়েছিলেন।
.png)

কালজয়ী কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের জীবদ্দশার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি তাঁর সন্তানদের মানসপটে নেই। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর কারণে তাঁদের কারও স্মৃতিতেই বাবার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে বাবার রক্ত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে পথ চলছেন তাঁর সন্তানেরা।
১৪ ঘণ্টা আগে
চলচ্চিত্রের জন্ম মুহূর্তে সে নির্বাক ছিল। ছবির পর ছবি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যেত, কিন্তু ওরা কথা বলত না। কথা না বললেও বিভিন্ন অভিব্যক্তির মাধ্যমে নির্বাক ছবি সবাক হয়ে ধরা দিত দর্শকের মনে। তারপর ছবিতে ধ্বনি এলো, শব্দ এলো, সংলাপ এলো। ছায়াছবিতে সংলাপের সংযোজনের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্প তার বনে
১৫ ঘণ্টা আগে
জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২) যখন ব্রিটিশ ভারতের ফেনীর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেন, তখন বিশ্বজুড়ে ঘটনার ঘনঘটা। মাথার ওপর শোষকের খাঁড়া ঝুলছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-অত্যাচার, দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ত্রিশের অর্থনৈতিক মন্দার পশ্চিমা ঢেউ, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হাহাকার, সাম্প্রদায়িক ব
১৬ ঘণ্টা আগে
(লেখাটির প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে) বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল পরবর্তী সময়ে আধুনিক বাংলা কবিতায় ত্রিশের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আমার মনে হয়, ভাব ও চিন্তাগত জায়গা থেকে ত্রিশের কবিদের গুরু মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ত্রিশের দশক শেষ হলেও ১০০ বছর পর ত্রিশের সেই ধারাবাহিকতা শেষ হয়নি। মধুসূদন রেভ্যুলেশনারি। কে
১৮ আগস্ট ২০২৬