রায়হান রাহিম

১৯৬৫ সালের ৫ নভেম্বর।
একটা বাংলা সিনেমা তৈরি হইছে আর এই জন্য সারাদেশ থিকা ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষেরা শহরে ভিড় করতে শুরু করছেন। সিনেমা হল খুঁজতেছে সবাই, সিনেমা দেখবে। কেউ কেউ তো কাঁথা বালিশও নিয়া আসছেন। শুয়ে পড়ছেন সিনেমা হলের গেটে। সকাল সকাল টিকেট পাইতে হবে, যদি টিকেট শেষ হইয়া যায়। গ্রামেও এই সিনেমার ক্রেজ ছড়ায় পড়ছে। জায়গায় জায়গায় অস্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হচ্ছে। যেসব মা-চাচীরা ইতিপূর্বে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার কথা চিন্তাও করেন নাই, এমনকি তারাও সিনেমা দেখতে গরু-মহিষের গাড়িতে চড়ে হলে যাচ্ছেন ।
ঘটনা খালি এইটা না, এই সিনেমা রিলিজ হওয়ার সাথে সাথে বাংলা সিনেমার হিস্ট্রি পাল্টাইতে শুরু করে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তরে টার্গেট অডিয়েন্স ভাবা বাংলাদেশি ডিরেক্টররা নিজেদের চেনা গন্ডি থিকা হুট কইরা অন্যদিকে নজর সরাইতে শুরু করেন। দেশে সিনেমা বানানোর ধুম পড়ে যায়, চাঙ্গা হইতে শুরু করে দেশের ফিল্ম ইকোনমি।
আজ আমরা কথা বলব, সালাহউদ্দিন পরিচালিত কাল্ট ক্ল্যাসিক সিনেমা ‘রূপবান’ নিয়ে! ‘রূপবান ইফেক্ট’ কেমন করে বাংলাদেশি সিনেমার হিস্ট্রিকে পাল্টায় দিছিল চলেন অল্প সময়ে ঘটনাটা বুইঝা আসি।
রূপবান বানানোর আগে ডিরেক্টর সালাউদ্দিন ১৯৬২ সালে ‘সূর্যস্নান’ এবং ১৯৬৩ সালে ‘ধারাপাত’ নামে দুইটা সিনেমা বানাইছিলেন। কিন্তু এই দুইটা সিনেমার কোনোটাই তেমন ব্যবসা করতে পারে নাই। তখন এফডিসির ভুঁইয়া ব্রাদার্স, সফদার আলী ভুঁইয়া এবং সিরাজুল ইসলাম ভুঁইয়া তারে রুপবান বানানোর বুদ্ধি দেন।

কিন্তু রূপবান বানাইতে প্রথম প্রথম সালাহউদ্দিন তেমন রাজি ছিলেন না। রাজি হইবার কারণও ছিল না তার কাছে। ইমরুল হাসানের ‘অ্যা ক্রিটিক্যাল হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা’ বই থেকে জানা যায়, তখন পর্যন্ত এই দেশে সিনেমার মেইন টার্গেট অডিয়েন্স ছিল আর্বান মিডল ক্লাস তথা শিক্ষিত লোকজন। কিন্তু রূপবান ছিল এমন একটা গল্প, যেটা যাত্রাতে পপুলার ছিল। এই গল্পের টার্গেট অডিয়েন্স ছিল গ্রামের মানুষ। গ্রামের মানুষ যে সিনেমা দেখতে পারে এই বিশ্বাসটাই ছিল না তখনকার বহু ডিরেক্টরের। বাংলাদেশে যে আর্বান মিডলক্লাস ছাড়াও অন্য দর্শকরা একজিস্ট করে এবং যাত্রার দর্শকরাও যে সিনেমার দর্শক হইতে পারে, সেই সব দর্শকদের ওপর বিশ্বাস রাইখাই সালাহউদ্দীন ফাইনালি সিনেমাটা বানানোতে হাত দেন।
আর তারপরে তো ইতিহাস।

সিনেমার নায়িকা সুজাতা বলছিলেন রূপবান উর্দু সিনেমারে ঢাকা থিকা হটায়া দিছিল। খুব একটা অত্যুক্তি যে তিনি করেন নাই তা একটা স্ট্যাট দেখলে বোঝা যাবে। আব্দুল্লাহ জেয়াদের ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: পাঁচ দশকের ইতিহাস’ অনুযায়ী, ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ফিল্ম হইছে ২২টা আর উর্দু ভাষায় ফিল্ম হইছে ১৯ টা। ’৬৬ থেকে এই গ্রাফ পাল্টাইতে থাকে। ’৬৬ থেকে ’৭০ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় ফিল্ম হইছে মোট ১২৫ টা আর উর্দু ভাষার ফিল্ম হইছে মাত্র ৩৩টা। অর্থাৎ রূপবান রিলিজের পরপর বাংলা ভাষায় সিনেমা বানানোর পরিমাণ এক লাফে বাইড়া যায়।
এই লাফটা খালি একটা নাম্বার না, এইটা বুঝতে হইলে জানতে হবে আসলে রূপবানের কাহিনীটা কী ছিল, আর কেন সেইটা দর্শকরে এতটা টানছিল।
রূপবান এর গল্পে দেখা যায়, বারো দিনের বাচ্চার লগে বারো বছরের একটা মেয়ের বিয়ে হয়। কাহিনী কী? কাহিনী হইতেছে এক রাজ্যের রাজা বেটা মেইল। তার পোলামাইয়া হয় না। সে রাজ্য ছাইড়া বনবাসে চইলা যায়, সেইখানে দেখা হয় এক দরবেশের। দরবেশ তারে সলিউশন দেয়। দরবেশ বলে তার ছেলে হবে। সেই ছেলের বারো দিন বয়সে তারে বারো বছর বয়সী এক মেয়ের সাথে বিয়া দিতে হবে। তারপর সেই ছেলে আর তার বৌকে বারো বছরের জন্য বনবাসে পাঠাইতে হবে। এর অন্যথা হইলে ছেলে মারা যাবে।
রাজা জলদি রাজ্যে ফিরা আসে। তার ছেলে হয়। সে তার উজিররে রাজি করায়, উজিরের মেয়ে রুপবানের সাথে রাজপুত্র রহিমের বিয়ে হয়। তারপর রুপবান তার নাবালক জামাইরে নিয়ে বনবাসে নির্বাসনে যায়। রূপবানের বনবাসের দুঃখের কাহিনীই হইতেছে রূপবান সিনেমা।
রুপবান বনবাসে যাবার পর বাঘের হাত থিকা সে তার জামাইরে বাঁচায়। জংলি রাজার হেল্প পায় সে। বোনের পরিচয়ে সে রহিমরে বড় করতে থাকে। রহিমরে পাঠশালায় পাঠায়। অইখানে তাজেল নামে এক রাজার মেয়ে রহিমের প্রেমের পড়ে। তাজেলের বাপ আবার রূপবানরে ডিস্টার্ব করে। যুদ্ধ লাগে জংলি রাজা আর তাজেলের বাপের। ওই দিকে বারো বছর পাড় হয়ে যাওয়ায় রহিমের বাপ আসে রুপবান-রহিমরে নিয়া যাইতে। শেষে মধুর মিলন।
এখন সিনেমাটা এমন ম্যাসিভ হিট হইল কেন, তার একটা কমন এক্সপ্লেনেশন চালু আছে। কাহিনীটা যাত্রাপালার মতোই সহজ সরল প্রেমের গল্প, নাচগানও ছিল, তাই আমজনতা লুফে নিছে। কিন্তু ইমরুল হাসানের ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা’ পড়লে এই এক্সপ্লেনেশনটার পেছনে যে আসলে একটা ক্লাস স্নবারি কাজ করে তা টের পাওয়া যায়। কারণ তৎকালীন এফডিসির ম্যাক্সিমাম ডিরেক্টর যাত্রাকে লো আর্ট মনে করতেন, রূপবানকে ভাবতেন গ্রাম্য, ছোটলোকের সিনেমা। যেনবা গ্রামের মানুষ কোনো সিনেমা এঞ্জয় করলে সেইটা এনাফ আর্টিস্টিক হইতে পারে না। এই একই ক্লাস হেইট্রেডের মাশুল সিনেমার নায়িকা সুজাতাকেও গুনতে হইছিল। তিনি তার অটোবায়োগ্রাফি ‘চলচ্চিত্রে আমার ৫৫ বছর’-এ লিখছিলেন, তাঁকে নাকি অনেক ডিরেক্টরই এই সিনেমার পর ‘যাত্রার নায়িকা’ বইলা মক করত। তার মা এই সিনেমার পর তার ক্যারিয়ার নিয়া ভয় পাইয়া গেছিলেন, যদি এরপর সুজাতা আর কোনো ছবিতে কাজের সুযোগ না পান।

কিন্তু সিনেমাটা হিট হইছিল ‘সহজ সরল যাত্রার কাহিনী’ এই কারণে না, বরং তার উল্টা একটা কারণে। ইমরুল হাসানের মতে, রূপবানের গল্পে যে ফিলিংস, সাফারিংস আর হোপ ছিল, সেইগুলা এই দেশের মানুষের কাছে খুব একটা আননোন ছিল না। ফলে তারা এইগুলার সাথে বেশ ভালোভাবেই কানেক্ট করতে পারছিল। প্লাস, এই সিনেমার ভিলেন হিসেবে নিয়তিরে উপস্থাপনের ভিতর দিয়া ডিরেক্টর একটা ইউনিভার্সাল হিউম্যান একজিস্টেন্সের ক্রাইসিসরে সামনে নিয়া আসেন। যা আসলে দর্শকের নিজের জীবনের কষ্ট আর আশারই একটা রিফ্লেকশন ছিল। আর এই জন্যই সিনেমাটা বের হবার সাথে সাথে রাতারাতি বক্স অফিসে আলোড়ন তুলতে পারছিল।
আরেকটা ঘটনাও ঘটে রূপবানের পর। রূপবানের মধ্য দিয়া বাংলাদেশের গেরস্থ বাড়ির মেয়ে বৌদের সিনেমা হলে একসেসের এক সিগনিফিক্যান্ট ঘটনা দেখা যায়। এর আগে হলে গিয়া মেয়েদের সিনেমা দেখার ঘটনা খুব একটা ছিল না। হলে গিয়া সিনেমা দেখা ছিল আপার ক্লাস উইমেনদের লাক্সারির ঘটনা। রূপবান এই ঘটনাটা ক্রিয়েট করল কীভাবে?
এগেইন, এইটার ক্রেডিট সিনেমার কাহিনীর। একজন মেয়ের জীবন কী রকম সাফারিংসের, সেইটার একটা পোর্ট্রে এই সিনেমাটা করতে পারছিল। প্লাস সিনেমার সেন্টার পয়েন্ট হইতেছে রূপবানের সতীত্ব ধইরা রাখা। রূপবান একজন সতী নারীর সিম্বল। সিনেমা হলে মেয়েরা যাইতে পারত না, তার কারণ সিনেমা নিয়া কমন একটা পার্সেপশন ছিল অনেকটা এমন যে, সিনেমাতে রংঢং দেখায়, সিনেমা দেখলে ডিজায়ার তৈরি হয়। তাই এইটা একটা বাজে জিনিস। রূপবান আসার পর চাউড় হইয়া যায়, এইটা সতী নারীর কাহিনী। ঠিক এই কারণেই বাড়ির বৌ-মেয়েদের হলে গিয়ে এই সিনেমা দেখার পারমিশন মিলে।
তার মানে কিন্তু এই না যে, ফিমেল লীড রূপবানের কাহিনীর ভিতর কোন ফিমেল এজেন্সির ঘটনা নাই। রূপবানের ফিমেল ক্যারেক্টারগুলো খুবই অ্যাকটিভ। রূপবান তার সেক্সুয়াল নিডের কথা বলতে পারে, তাজেলও রহিমরে প্রপোজ করতে পারে, সিডিউস করবার ট্রাই করতে পারে।
রূপবানের সাকসেস পুরা ইন্ডাস্ট্রিরে নাড়ায় দেয়। মুক্তির পরের বছর, ১৯৬৬ সালের মার্চে, সফদার আলী ভুঁইয়া নিজেই বানান ‘রহিম বাদশা ও রূপবান’, আর সেই বছরের এপ্রিলেই ইবনে মিজান বানান ‘আবার বনবাসে রূপবান’, দুইটাই বাম্পার বিজনেস করে। ১৯৬৮ সালে ই আর খান বানান ‘রূপবানের রূপকথা’। এরপর প্রায় দুই দশকের বিরতি দিয়ে আশির দশকের মাঝামাঝি আসে ‘রঙ্গিন রূপবান’, আর ২০০৫ সালে মুক্তি পায় ‘আজকের রূপবান’। কলকাতাতেও ‘রুপবান কন্যা’ নামে একটা সিনেমা হইছিল।
১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া ১৪টা বাংলা ছবির মধ্যে ১০টাই ছিল রূপবান ধাঁচের সিনেমা। এমনকি জহির রায়হানের বেহুলা নিয়া ইন্টেলেকচুয়াল মহলে যে মাতামাতি, তাও একটা রূপবানের সাকসেসের কনসিকোয়েন্সই। অথচ পঞ্চাশের দশকে এই ধরনের সিনেমা এ দেশের বক্স অফিসে প্রায় ছিলই না। রূপবানের সাকসেস থিকাই বাংলাদেশের ডিরেক্টরা ফিল করতে শুরু করেন, সিনেমা বানাইতে হইলে পাবলিকের লাইগাই বানাইতে হবে। আর এই একটা রিয়ালাইজেশনই পরবর্তী সময়ে ঢাকায় বানানো সিনেমাগুলারে অরিজিনাল ‘বাংলাদেশি সিনেমা’ হিসেবে আইডেন্টিটি পাইতে হেল্প করছিল।

১৯৬৫ সালের ৫ নভেম্বর।
একটা বাংলা সিনেমা তৈরি হইছে আর এই জন্য সারাদেশ থিকা ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষেরা শহরে ভিড় করতে শুরু করছেন। সিনেমা হল খুঁজতেছে সবাই, সিনেমা দেখবে। কেউ কেউ তো কাঁথা বালিশও নিয়া আসছেন। শুয়ে পড়ছেন সিনেমা হলের গেটে। সকাল সকাল টিকেট পাইতে হবে, যদি টিকেট শেষ হইয়া যায়। গ্রামেও এই সিনেমার ক্রেজ ছড়ায় পড়ছে। জায়গায় জায়গায় অস্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হচ্ছে। যেসব মা-চাচীরা ইতিপূর্বে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার কথা চিন্তাও করেন নাই, এমনকি তারাও সিনেমা দেখতে গরু-মহিষের গাড়িতে চড়ে হলে যাচ্ছেন ।
ঘটনা খালি এইটা না, এই সিনেমা রিলিজ হওয়ার সাথে সাথে বাংলা সিনেমার হিস্ট্রি পাল্টাইতে শুরু করে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তরে টার্গেট অডিয়েন্স ভাবা বাংলাদেশি ডিরেক্টররা নিজেদের চেনা গন্ডি থিকা হুট কইরা অন্যদিকে নজর সরাইতে শুরু করেন। দেশে সিনেমা বানানোর ধুম পড়ে যায়, চাঙ্গা হইতে শুরু করে দেশের ফিল্ম ইকোনমি।
আজ আমরা কথা বলব, সালাহউদ্দিন পরিচালিত কাল্ট ক্ল্যাসিক সিনেমা ‘রূপবান’ নিয়ে! ‘রূপবান ইফেক্ট’ কেমন করে বাংলাদেশি সিনেমার হিস্ট্রিকে পাল্টায় দিছিল চলেন অল্প সময়ে ঘটনাটা বুইঝা আসি।
রূপবান বানানোর আগে ডিরেক্টর সালাউদ্দিন ১৯৬২ সালে ‘সূর্যস্নান’ এবং ১৯৬৩ সালে ‘ধারাপাত’ নামে দুইটা সিনেমা বানাইছিলেন। কিন্তু এই দুইটা সিনেমার কোনোটাই তেমন ব্যবসা করতে পারে নাই। তখন এফডিসির ভুঁইয়া ব্রাদার্স, সফদার আলী ভুঁইয়া এবং সিরাজুল ইসলাম ভুঁইয়া তারে রুপবান বানানোর বুদ্ধি দেন।

কিন্তু রূপবান বানাইতে প্রথম প্রথম সালাহউদ্দিন তেমন রাজি ছিলেন না। রাজি হইবার কারণও ছিল না তার কাছে। ইমরুল হাসানের ‘অ্যা ক্রিটিক্যাল হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা’ বই থেকে জানা যায়, তখন পর্যন্ত এই দেশে সিনেমার মেইন টার্গেট অডিয়েন্স ছিল আর্বান মিডল ক্লাস তথা শিক্ষিত লোকজন। কিন্তু রূপবান ছিল এমন একটা গল্প, যেটা যাত্রাতে পপুলার ছিল। এই গল্পের টার্গেট অডিয়েন্স ছিল গ্রামের মানুষ। গ্রামের মানুষ যে সিনেমা দেখতে পারে এই বিশ্বাসটাই ছিল না তখনকার বহু ডিরেক্টরের। বাংলাদেশে যে আর্বান মিডলক্লাস ছাড়াও অন্য দর্শকরা একজিস্ট করে এবং যাত্রার দর্শকরাও যে সিনেমার দর্শক হইতে পারে, সেই সব দর্শকদের ওপর বিশ্বাস রাইখাই সালাহউদ্দীন ফাইনালি সিনেমাটা বানানোতে হাত দেন।
আর তারপরে তো ইতিহাস।

সিনেমার নায়িকা সুজাতা বলছিলেন রূপবান উর্দু সিনেমারে ঢাকা থিকা হটায়া দিছিল। খুব একটা অত্যুক্তি যে তিনি করেন নাই তা একটা স্ট্যাট দেখলে বোঝা যাবে। আব্দুল্লাহ জেয়াদের ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: পাঁচ দশকের ইতিহাস’ অনুযায়ী, ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ফিল্ম হইছে ২২টা আর উর্দু ভাষায় ফিল্ম হইছে ১৯ টা। ’৬৬ থেকে এই গ্রাফ পাল্টাইতে থাকে। ’৬৬ থেকে ’৭০ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় ফিল্ম হইছে মোট ১২৫ টা আর উর্দু ভাষার ফিল্ম হইছে মাত্র ৩৩টা। অর্থাৎ রূপবান রিলিজের পরপর বাংলা ভাষায় সিনেমা বানানোর পরিমাণ এক লাফে বাইড়া যায়।
এই লাফটা খালি একটা নাম্বার না, এইটা বুঝতে হইলে জানতে হবে আসলে রূপবানের কাহিনীটা কী ছিল, আর কেন সেইটা দর্শকরে এতটা টানছিল।
রূপবান এর গল্পে দেখা যায়, বারো দিনের বাচ্চার লগে বারো বছরের একটা মেয়ের বিয়ে হয়। কাহিনী কী? কাহিনী হইতেছে এক রাজ্যের রাজা বেটা মেইল। তার পোলামাইয়া হয় না। সে রাজ্য ছাইড়া বনবাসে চইলা যায়, সেইখানে দেখা হয় এক দরবেশের। দরবেশ তারে সলিউশন দেয়। দরবেশ বলে তার ছেলে হবে। সেই ছেলের বারো দিন বয়সে তারে বারো বছর বয়সী এক মেয়ের সাথে বিয়া দিতে হবে। তারপর সেই ছেলে আর তার বৌকে বারো বছরের জন্য বনবাসে পাঠাইতে হবে। এর অন্যথা হইলে ছেলে মারা যাবে।
রাজা জলদি রাজ্যে ফিরা আসে। তার ছেলে হয়। সে তার উজিররে রাজি করায়, উজিরের মেয়ে রুপবানের সাথে রাজপুত্র রহিমের বিয়ে হয়। তারপর রুপবান তার নাবালক জামাইরে নিয়ে বনবাসে নির্বাসনে যায়। রূপবানের বনবাসের দুঃখের কাহিনীই হইতেছে রূপবান সিনেমা।
রুপবান বনবাসে যাবার পর বাঘের হাত থিকা সে তার জামাইরে বাঁচায়। জংলি রাজার হেল্প পায় সে। বোনের পরিচয়ে সে রহিমরে বড় করতে থাকে। রহিমরে পাঠশালায় পাঠায়। অইখানে তাজেল নামে এক রাজার মেয়ে রহিমের প্রেমের পড়ে। তাজেলের বাপ আবার রূপবানরে ডিস্টার্ব করে। যুদ্ধ লাগে জংলি রাজা আর তাজেলের বাপের। ওই দিকে বারো বছর পাড় হয়ে যাওয়ায় রহিমের বাপ আসে রুপবান-রহিমরে নিয়া যাইতে। শেষে মধুর মিলন।
এখন সিনেমাটা এমন ম্যাসিভ হিট হইল কেন, তার একটা কমন এক্সপ্লেনেশন চালু আছে। কাহিনীটা যাত্রাপালার মতোই সহজ সরল প্রেমের গল্প, নাচগানও ছিল, তাই আমজনতা লুফে নিছে। কিন্তু ইমরুল হাসানের ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা’ পড়লে এই এক্সপ্লেনেশনটার পেছনে যে আসলে একটা ক্লাস স্নবারি কাজ করে তা টের পাওয়া যায়। কারণ তৎকালীন এফডিসির ম্যাক্সিমাম ডিরেক্টর যাত্রাকে লো আর্ট মনে করতেন, রূপবানকে ভাবতেন গ্রাম্য, ছোটলোকের সিনেমা। যেনবা গ্রামের মানুষ কোনো সিনেমা এঞ্জয় করলে সেইটা এনাফ আর্টিস্টিক হইতে পারে না। এই একই ক্লাস হেইট্রেডের মাশুল সিনেমার নায়িকা সুজাতাকেও গুনতে হইছিল। তিনি তার অটোবায়োগ্রাফি ‘চলচ্চিত্রে আমার ৫৫ বছর’-এ লিখছিলেন, তাঁকে নাকি অনেক ডিরেক্টরই এই সিনেমার পর ‘যাত্রার নায়িকা’ বইলা মক করত। তার মা এই সিনেমার পর তার ক্যারিয়ার নিয়া ভয় পাইয়া গেছিলেন, যদি এরপর সুজাতা আর কোনো ছবিতে কাজের সুযোগ না পান।

কিন্তু সিনেমাটা হিট হইছিল ‘সহজ সরল যাত্রার কাহিনী’ এই কারণে না, বরং তার উল্টা একটা কারণে। ইমরুল হাসানের মতে, রূপবানের গল্পে যে ফিলিংস, সাফারিংস আর হোপ ছিল, সেইগুলা এই দেশের মানুষের কাছে খুব একটা আননোন ছিল না। ফলে তারা এইগুলার সাথে বেশ ভালোভাবেই কানেক্ট করতে পারছিল। প্লাস, এই সিনেমার ভিলেন হিসেবে নিয়তিরে উপস্থাপনের ভিতর দিয়া ডিরেক্টর একটা ইউনিভার্সাল হিউম্যান একজিস্টেন্সের ক্রাইসিসরে সামনে নিয়া আসেন। যা আসলে দর্শকের নিজের জীবনের কষ্ট আর আশারই একটা রিফ্লেকশন ছিল। আর এই জন্যই সিনেমাটা বের হবার সাথে সাথে রাতারাতি বক্স অফিসে আলোড়ন তুলতে পারছিল।
আরেকটা ঘটনাও ঘটে রূপবানের পর। রূপবানের মধ্য দিয়া বাংলাদেশের গেরস্থ বাড়ির মেয়ে বৌদের সিনেমা হলে একসেসের এক সিগনিফিক্যান্ট ঘটনা দেখা যায়। এর আগে হলে গিয়া মেয়েদের সিনেমা দেখার ঘটনা খুব একটা ছিল না। হলে গিয়া সিনেমা দেখা ছিল আপার ক্লাস উইমেনদের লাক্সারির ঘটনা। রূপবান এই ঘটনাটা ক্রিয়েট করল কীভাবে?
এগেইন, এইটার ক্রেডিট সিনেমার কাহিনীর। একজন মেয়ের জীবন কী রকম সাফারিংসের, সেইটার একটা পোর্ট্রে এই সিনেমাটা করতে পারছিল। প্লাস সিনেমার সেন্টার পয়েন্ট হইতেছে রূপবানের সতীত্ব ধইরা রাখা। রূপবান একজন সতী নারীর সিম্বল। সিনেমা হলে মেয়েরা যাইতে পারত না, তার কারণ সিনেমা নিয়া কমন একটা পার্সেপশন ছিল অনেকটা এমন যে, সিনেমাতে রংঢং দেখায়, সিনেমা দেখলে ডিজায়ার তৈরি হয়। তাই এইটা একটা বাজে জিনিস। রূপবান আসার পর চাউড় হইয়া যায়, এইটা সতী নারীর কাহিনী। ঠিক এই কারণেই বাড়ির বৌ-মেয়েদের হলে গিয়ে এই সিনেমা দেখার পারমিশন মিলে।
তার মানে কিন্তু এই না যে, ফিমেল লীড রূপবানের কাহিনীর ভিতর কোন ফিমেল এজেন্সির ঘটনা নাই। রূপবানের ফিমেল ক্যারেক্টারগুলো খুবই অ্যাকটিভ। রূপবান তার সেক্সুয়াল নিডের কথা বলতে পারে, তাজেলও রহিমরে প্রপোজ করতে পারে, সিডিউস করবার ট্রাই করতে পারে।
রূপবানের সাকসেস পুরা ইন্ডাস্ট্রিরে নাড়ায় দেয়। মুক্তির পরের বছর, ১৯৬৬ সালের মার্চে, সফদার আলী ভুঁইয়া নিজেই বানান ‘রহিম বাদশা ও রূপবান’, আর সেই বছরের এপ্রিলেই ইবনে মিজান বানান ‘আবার বনবাসে রূপবান’, দুইটাই বাম্পার বিজনেস করে। ১৯৬৮ সালে ই আর খান বানান ‘রূপবানের রূপকথা’। এরপর প্রায় দুই দশকের বিরতি দিয়ে আশির দশকের মাঝামাঝি আসে ‘রঙ্গিন রূপবান’, আর ২০০৫ সালে মুক্তি পায় ‘আজকের রূপবান’। কলকাতাতেও ‘রুপবান কন্যা’ নামে একটা সিনেমা হইছিল।
১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া ১৪টা বাংলা ছবির মধ্যে ১০টাই ছিল রূপবান ধাঁচের সিনেমা। এমনকি জহির রায়হানের বেহুলা নিয়া ইন্টেলেকচুয়াল মহলে যে মাতামাতি, তাও একটা রূপবানের সাকসেসের কনসিকোয়েন্সই। অথচ পঞ্চাশের দশকে এই ধরনের সিনেমা এ দেশের বক্স অফিসে প্রায় ছিলই না। রূপবানের সাকসেস থিকাই বাংলাদেশের ডিরেক্টরা ফিল করতে শুরু করেন, সিনেমা বানাইতে হইলে পাবলিকের লাইগাই বানাইতে হবে। আর এই একটা রিয়ালাইজেশনই পরবর্তী সময়ে ঢাকায় বানানো সিনেমাগুলারে অরিজিনাল ‘বাংলাদেশি সিনেমা’ হিসেবে আইডেন্টিটি পাইতে হেল্প করছিল।
.png)

গতকাল ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ এক ‘সৃজনশীল’ কাজের দেখা পেলাম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩ সালের যুগান্তকারী কালি-কলমে আঁকা দুর্ভিক্ষ সিরিজকে তুলে আনা হয়েছে নেকলেসে। ক্লে-এর ওপর অ্যাক্রিলিকে আঁকা, তাতে রেজিনের প্রলেপ, আর সঙ্গত দিচ্ছে কাঠের পুঁতি। আজকের পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এ অবশ্য নতুন কিছু
০২ জুলাই ২০২৬
হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন সেই ২০১২ সালে। কোনো রাইটার মইরা যাওয়ার পরে ইউজুয়ালি তার লিটারেরি জনরার সার্কুলেশনে একটা ন্যাচারাল ডিজরাপশন আসে। কিন্তু মারা যাওয়ার ১৪ বছর পরেও দেখা যাইতেছে, বাংলাদেশের কালচারাল পেরিফেরিতে 'হুমায়ূনীয়' লিটারেরি জনরার সার্কুলেশন বহাল তবিয়তেই আছে।
২৩ জুন ২০২৬
‘সোবার’ পেজটার সাথে আমার প্রথম পরিচয় তাদের ‘সুগারবেবি দীপ্তি সিরিজ’ এর থ্রুতে! সামাজিক অবক্ষয়ের নানা রকম আলামত তাদের পেজের মোটামুটি সকল কন্টেন্টে না চাইতেও উইঠা আসে। ফলে অল্প দিনেই আমি তাদের ফ্যান হয়ে যাই। আমি তাদের পডকাস্ট ‘লয় ভাগছে’ নিয়ে আবছা জানতাম, কিন্তু কোনোদিনও সেই সমন্ধে আমার আগ্রহ আসে নাই।
৩০ এপ্রিল ২০২৬
আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠছিলাম, ‘ডিশের লাইনের’ মাধ্যমে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল ফ্রেন্ডস, সাইনফিল্ড, ম্যালকম ইন দ্য মিডল, স্ক্রাবসের মতো বহু সিটকম। প্রায় কুড়ি বছর পর, ১০ এপ্রিল ম্যালকম ইন দ্য মিডলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে চার পর্বের মিনিসিরিজ হিসেবে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হুলুতে মুক্তি পাওয়ার প্রথম ত
২৬ এপ্রিল ২০২৬