শাহ আলীর মাজারে হামলা, নেপথ্যে কমিটি-টাকার খেলা

স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারে হামলা ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা চলছেই। কয়েক শ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানে কারা, কেন হামলা করল– তা নিয়ে গুঞ্জনের ডানা মেলছে। কয়েক দিনের অনুসন্ধানে স্ট্রিম ধর্মীয় ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক আধিপত্য, মাদকবিরোধী অভিযানসহ কয়েকটি বিষয়ে কাজ করে হামলার নেপথ্যে মাজার কমিটির আর্থিক কেলেঙ্কারি পেয়েছে।

মিরপুর-১ নম্বর সেকশনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে আছে শাহ আলী মাজারের সম্পত্তি। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পত্তি থেকে আসা টাকা মাজারের কাজে ব্যবহার না করে আত্মসাৎ করেছেন কমিটির সদস্যরা। দুই বছর ধরে অভিভাবকহীন মাজারে নতুন কমিটি গঠন ঘিরে বিরোধ চাঙ্গা হয়। কমিটিতে জায়গা পেতে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন আগের সঙ্গে সদস্য পদপ্রত্যাশীরা।

সেদিন যা ঘটেছিল

প্রতি বৃহস্পতিবার শাহ আলী মাজারে হাজারো মানুষ অবস্থান নেন। তাদের কেউ ভাবগান, কেউ জিকির; আবার কেউ পীরের রওজা জিয়ারতে পার করেন। গত ১৪ মে রাতে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়। হঠাৎ রাত ১১টার দিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, লাঠিসোঁটা হাতে একদল লোক মাজার প্রাঙ্গণের ভক্ত-অনুসারীদের মারপিট করছেন। হামলাকারীরা মাজারের মোমবাতি, ভক্তদের আসর তছনছ করে। ভক্ত-অনুসারীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি, এমনকি ক্ষমা চেয়েও রেহাই পাননি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাস্ক পরা লোকেরা লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করে। তারা মাজারের জিয়ারতি শেট, রওজা জিয়ারতকারী, এমনকি নারী ভক্তদেরও মারধর করা হয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মঞ্জুরুল ইসলাম খান স্ট্রিমকে বলেন, ‘পাঞ্জাবি পরা লোকেদের মুখে মাস্ক, হাতে লাঠি, লোহার রড, পাইপ ও হকিস্টিক ছিল। স্থানীয়রা তাদের জামায়াতে ইসলামের কর্মী বলে জানান। হামলা করে বের হওয়ার সময় নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার স্লোগান দেন তারা।’

হামলায় ডান হাত ভেঙে যাওয়া মোহাম্মদ ইবরাহীম স্ট্রিমকে বলেন, ‘এমন হামলা আগে কখনো হয়নি। ৬০-৭০ জন লাঠি-সোঁটা নিয়ে হঠাৎ মারধর শুরু করে। মাফ চেয়েও রেহাই পাইনি।’

রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারের গেট। স্ট্রিম ছবি
রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারের গেট। স্ট্রিম ছবি

মাজারের আয়ে চোখ

মিরপুর এক নম্বর সেকশনে শাহ আলী মাজার থাকলেও সম্পত্তি ছড়িয়ে আশেপাশের অনেক জায়গায়। মাজার কর্ততৃপক্ষের তথ্যে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাজারের প্রায় ২৮ একর জমি রয়েছে। এসব জমিতে মাজার, মার্কেটে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অনেক জমি বেদখল হয়ে গেছে। জমির স্থাপনা থেকে মাজারের গড়ে বার্ষিক আয় প্রায় ১৪ কোটি টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে মাজারের আয় ৬৮ কোটি ৬৭ লাখ ৪৩ হাজার টাকার বেশি। বিপরীতে এই সময়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মাজারের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা পড়েছে ১৪ কোটি ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর প্রায় ১৭ কোটি ৪৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, নিজের পকেট ভরতে কমিটির সদস্যরা মাজারের সম্পত্তি ও আয়ের পরিমান কমিয়ে দেখিয়েছেন।

হামলার পর কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহার বলেছেন, শাহ আলী মাজারের অনেক সম্পত্তি রয়েছে। অনেক দোকান, যেখান থেকে ভাড়া তুলছে একটি সিন্ডিকেট। কিন্তু তারা এক লাখ টাকার ভাড়া তুললেও নথিতে দেখায় মাত্র ১০ হাজার। বাকি টাকা কমিটি ও তাদের পোষা সিন্ডিকেট পকেটে ভরেছে।

নতুন কমিটি ঘিরে সক্রিয় ৬ বলয়

স্থানীয় সংসদ সদস্য সব সময় শাহ আলী মাজার কমিটির সভাপতি হন। তাঁরই ইশারায় বাকি পদেও দলীয় লোকজন আসেন। দীর্ঘদিন এটি রেওয়াজে পরিণত হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর মাজার কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। এতে মাজার কমিটির পদগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। পরে কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে বাংলাদেশ ওয়াক্‌ফ প্রশাসন। মাজারের মোতাওয়াল্লির দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা জেলা প্রশাসককে। বর্তমানে তিনিই মাজার পরিচালনা করছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ওয়াক্‌ফ প্রশাসক (সচিব) সাফিজ উদ্দিন আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, একটি গণ্ডগোলের পরে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে এখন মাজারের মোতাওয়াল্লি মিরপুর জোনের ডিসি। নতুন করে কমিটি হলে বিস্তারিত জানানো হবে।

কয়েক দফায়, অন্তত ছয়টি গ্রুপ নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। জানা গেছে, অন্তত ছয়টি কমিটির প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে ওয়াক্‌ফ প্রশাসনে। এর মধ্যে একটি কমিটির প্রস্তাব করেছেন ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান, যিনি গুম ফেরে আসেন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে।

সূত্রের দাবি, বাকি পাঁচ প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা, যাদের মধ্যে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারাও রয়েছেন। মূলত ছয় গ্রুপ মাজার কমিটির দখল নিতে মরিয়া। যদিও এসব প্রস্তাবে কমিটিতে কারা আছেন, স্ট্রিম জানতে পারেনি।

ওয়াক্‌ফ প্রশাসক (সচিব) সাফিজ উদ্দিন আহমেদও তথ্য দিতে অনাগ্রহ দেখান। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘কাদের নিয়ে কমিটি হবে, সে ব্যাপারে আলাপ চলছে। এটি অফিশিয়াল বিষয়। অফিসের কোনো তথ্য আমি শেয়ার করতে পারব না।’

এ ব্যাপারে গ্লোবাল সুফি অরগানাইজেশনের কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী পরিষদের সদস্য আফতাব আলম জিলানী স্ট্রিমকে বলেন, যেসব মাজারে আওলাদ (পীরের উত্তরসূরি) থাকে না, সেগুলো সরকারিভাবে পরিচালিত হয়। সরকার এজন্য কমিটি করে। মাজারের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু শাহ আলী মাজারের লোকজন কী পরিমাণ অর্থ জমা দিয়েছে, তা তারাই বলতে পারবে। কিন্তু এখন কমিটির পদ পেতে মরিয়া অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে– টাকা নিয়ে নয়ছয় রয়েছে।

ফরহাদ মজহারের ভাষ্যে, প্রত্যেক মাজারের অর্থ লুটপাট হয়। শাহ আলী মাজারেও হয়। তাই কমিটি নিয়ে এত বিরোধ। কারণ ওটা লুটপাটের ভাণ্ডার। মাজারকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রথম পথ হলো সত্যিকারের তরিকাপন্থীদের নিয়ে কমিটি করা। এরপর তারা দুর্নীতি করছে কিনা, সব সময় খবর রাখা। প্রশাসনের কাজ হলো– মাজারে যেন কেউ দুর্নীতি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।

মাজার প্রাঙ্গণ। স্ট্রিম ছবি
মাজার প্রাঙ্গণ। স্ট্রিম ছবি

অভিযানের আড়ালে দখলের চেষ্টা

গত ১৪ মের আগেও শাহ আলী মাজারে হামলা হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে মাজারে কয়েক দফা হামলা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব সাজ্জাদুল মিরাজের নেতৃত্ব। তাঁর এই হামলার কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাজ্জাদুল মিরাজ জানিয়েছেন, পুলিশ প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে তিনি মাজারে অভিযান চালিয়েছেন। শাহ আলীর মাজার আমার বাসার সামনে। বাসার নিচে আমার একটি অফিস আছে এবং সেখানে অভিযোগ বক্সে যেসব অভিযোগ জমা হয়, অধিকাংশ মাজারের মাদককেন্দ্রিক। মিরপুর এলাকায় মাজারটি মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত।

তিনি বলেন, অভিযোগ পেয়ে আমি নেতাকর্মী নিয়ে একদিন মাজারে যাই। সেদিন আমার সঙ্গে পুলিশ সদস্যও ছিল। সেই অভিযানের পর পুলিশ আমাকে তাদের সাহায্য করার অনুরোধ জানায়। পরে আমি আরও অভিযান করেছি।

এ ব্যাপারে ফরহাদ মজহার বলেন, বড় বড় হোটেল, কনসার্ট, বড় লোকদের এলাকায় গাঁজা, মদ, ইয়াবা আছে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে মাজারকে সামনে আনার কারণ, এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা দেখাতে পারে– মাদকের বিরুদ্ধে তারা খুবই সোচ্চার। মাজারের ভেতরের নিরাপত্তা ডিসির অধীনে। ফলে ওখানে যদি মাদকসেবন বা কারবার চলে, তার দায় ডিসির।

উগ্রবাদের উত্থান, হুমকিতে ভিন্নমত প্রকাশ

ধর্মীয় ভিন্নমত দমন সামনে এনে মাজারে হামলার অভিযোগ বেশ পুরোনো। সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের’ তথ্যে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে হামলা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত অন্তত আটটি মাজারে হামলা হয়েছে, যার সর্বশেষ শাহ আলীর মাজার আক্রান্ত। শাহ আলীর ভক্ত-অনুরাগীরা বলছেন, ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়িয়ে একটি পক্ষ মাজারে হামলা করছে। দীর্ঘদিন ধরেই তারা মাজারের বিরুদ্ধে বয়ান তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে ফারহাদ মজহার বলেন, ‘মাজারের বিরুদ্ধে একটা তাত্ত্বিক ধারা বাংলাদেশে আছে, যেটিকে আমি পেট্রো ডলারপুষ্ট একটি ইসলামিক ইন্টারপ্রিটেশন মনে করি। তারা উগ্রবাদী ইসলামকে এখানে হাজির করার চেষ্টায় আছে। মাজারটা তারা গ্রহণ করে না। কারণ, এটা একটি গণমানুষের কেন্দ্র।’

গ্লোবাল সুফি অরগানাইজেশনের কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী পরিষদের সদস্য আফতাব আলম জিলানী স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা সুফিবাদীরা শান্তিপ্রিয়, উগ্রবাদ পছন্দ করি না। তবে একটি গোষ্ঠী সব সময় নিজের মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে চায়। জাতীয় নির্বাচনের পরে উগ্রবাদীরা আমাদের ওপর নিজের মতাদর্শ চাপিয়ে দিচ্ছে।’

এদিকে, শাহ আলীর মাজারে হামলার পর পুলিশ এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গ্রেপ্তারদের বিভিন্ন সময় জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে এদের অনেক জামায়াতের কর্মী বলে স্বীকার করেছেন।

তবে এটিকে পরিকল্পিত ‘অপপ্রচার’ বলে দাবি জামায়াতে ইসলামীর। হামলার সঙ্গে দলীয় কারও সম্পৃক্ততা নেই জানিয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মুসা স্ট্রিমকে বলেন, জামায়াত-শিবিরের লোকেরা এমন অপকর্ম করে না। আমাদের ইতিহাসে এমন কাজের নজিরও নাই। জামায়াত-শিবিরের লোকজন কোনোভাবে মাজারে হামলার সঙ্গে যুক্ত নন।

সম্পর্কিত