বৈশাখে আনন্দ শোভাযাত্রাই হবে, স্লোগান ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’

স্ট্রিম ছবি

প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলা নববর্ষ উদযাপনে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। নববর্ষ উদযাপন নিয়ে এরইমধ্যে চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। এবারের স্লোগান— ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।

বর্ষবরণের শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল’ নাকি ‘আনন্দ’ হবে তা নিয়ে বিতর্ক উঠলেও শেষ পর্যন্ত সেটি আনন্দ শোভাযাত্রা নামেই অনুষ্ঠিত হবে।

এ প্রসঙ্গে ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন কমিটি’র সদস্য সচিব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক এ এ এম কাওসার হাসান বলেন, ‘শুরুতে এটি আনন্দ শোভাযাত্রা ছিল, ১৯৯৬ সালের দিকে এর নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়। তবে নাম পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।

তিনি বলেন, আনন্দের সঙ্গে মঙ্গলের কোনো বিরোধ নেই। একটি গোষ্ঠী এই নাম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। একজন শিল্পী হিসেবে বৃহত্তর স্বার্থে এবং দেশের মানুষের স্বার্থে এই বিতর্কে আমাদের না জড়ানোই ভালো। আমরা এবার আনন্দ শোভাযাত্রাই করছি।’

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

পুরো আয়োজনের প্রস্তুতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং উৎসবের নানা দিক নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক কাওসার হাসান। চারুকলার এই আয়োজনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাঙালির যে ঐতিহ্য ও কৃষি-কালচার, তার ওপর ভিত্তি করেই বাংলা নববর্ষ শুরু হয়েছে। চারুকলা যখন ইনস্টিটিউট ছিল, ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে এই শোভাযাত্রার শুরু হয়। আমরা তখন স্টুডেন্ট, নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমরা একই ধারায় কাজ করে যাচ্ছি। গতবারের মতো এবারও ছাত্র-শিক্ষক সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন।’

অধ্যাপক কাওসার হাসান। স্ট্রিম ছবি
অধ্যাপক কাওসার হাসান। স্ট্রিম ছবি

চারুকলার এই আয়োজনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নিজস্ব অর্থায়ন ব্যবস্থা। এখানে কোনো করপোরেট স্পন্সর বা বাইরের অনুদান নেওয়া হয় না। আর্থিক সংকটের কথা স্বীকার করে অধ্যাপক কাওসার বলেন, ‘আমরা কোনো স্পন্সর নেই না। নিজেদের অর্থায়নে—অর্থাৎ আমরা নিজেরা যে সরা বানাই, মুখোশ বানাই, জলরং, অ্যাক্রিলিক পেইন্টিং বা অয়েল পেইন্টিং করি—সেগুলো বিক্রি করেই উৎসবের ফান্ডের জোগান দেই। এমনকি আমরা নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে কাজ শুরু করেছি।’

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

চারুকলার ৭১তম ব্যাচের ছাত্র অম্লান সরকার বলেন, পহেলা বৈশাখের এখনও দুই সপ্তাহ বাকি। পুরোনো কাজগুলো ঠিকঠাক করা হচ্ছে। আমাদের তৈরি বিভিন্ন মোটিফ বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে। অনেকের অর্ডার নিচ্ছি।

সরকারের কাছ থেকে সরাসরি কোনো অর্থ নেওয়ার ইচ্ছা নেই জানিয়ে কাওসার হাসান বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমির সাথে আমাদের কখনো কখনো কোলাবোরেশন হয়। কিন্তু আমরা সরকারের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ সহায়তা চাই না।’

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ হলো লোকজ ঐতিহ্যের বিশাল সব মোটিফ। এ বিষয়ে কাওসার হাসান জানান, ‘আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের যে মোটিফগুলো আছে, যেমন—ঘোড়া, হাতি, বাঘ, মোরগ, পাখি বা পায়রা—এগুলো নিয়ে কাজ করি। বড় বা মনুমেন্টাল সাইজের বানিয়ে এগুলো গাড়িতে তুলে উৎসবমুখর পরিবেশে শোভাযাত্রা হয়।’

তিনি আরও জানান, এবার সময় কম থাকায় পাঁচটি বড় মোটিফ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পুরো কাজ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে মোট ১০টি আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে মোটিফ টিম, জলরং টিম, সরা টিম, যাত্রাপালা টিম এবং চৈত্র সংক্রান্তি টিম উল্লেখযোগ্য। রাত জেগে ভোর পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এসব প্রস্তুতের কাজ করবেন। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বড় মোটিফগুলো রক্ষা করতে ত্রিপল বা বড় পলিথিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

বর্তমানে এই উৎসব শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি গোটা দেশে একটি সর্বজনীন উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অধ্যাপক কাওসার আরও জানান, ‘এটি এখন একটি জাতীয় উৎসবে রূপ নিয়েছে। এ বিষয়ে সরকারও কনসার্ন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দুটি মিটিং করেছি, পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও মিটিং হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনার পর আমরা কিছু রেজুলেশন পাস করেছি। সবার মতামতের ভিত্তিতেই এবারের স্লোগান ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ নির্ধারণ করা হয়েছে।’

চারুকলার আয়োজনে চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠান, পহেলা বৈশাখে মূল শোভাযাত্রা এবং বৈশাখের ২ তারিখ একটি যাত্রাপালার আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।

চারুকলার প্রভাষক ও আর্টিস্ট আরাফাত করিম বলেন, আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আশা করি খুব ভালো আয়োজন হবে।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

অতীতে শোভাযাত্রায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ব্যঙ্গাত্মক মোটিফ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অধ্যাপক কাওসার বলেন, ‘ওই সময়টিতে নির্বাচিত সরকার ছিল না। কিন্তু এখন আমরা কাউকেই আহত করতে চাই না। বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে সবার মাঝে উপস্থাপন করাই আমাদের লক্ষ্য। কাউকে আঘাত বা মনে কষ্ট দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এবার বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকেই উৎসব পালিত হবে।’

সবশেষে তিনি বলেন, শিল্পীরা কোনো বিতর্কে না জড়িয়ে কেবল শিল্প ও দেশজ ঐতিহ্যের টানেই মানুষের জন্য এই আনন্দ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এবারের পহেলা বৈশাখের উৎসব সফল করতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন অধ্যাপক কাওসার।

সম্পর্কিত