বাংলা একাডেমির কর্মশালা: সনদই কি সৃজনশীলতার শেষ কথা!

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৯: ৫৭
বাংলা একাডেমি। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতি বাংলা একাডেমির একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় আবেদনের যোগ্যতায় ‘স্নাতক ডিগ্রি’র শর্তারোপে লেখক ও গবেষক সমাজে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সৃজনশীল সাহিত্যচর্চায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি কি মেধার চেয়েও বড়—এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্টজনেরা।

সম্প্রতি ‘ভাষা, সাহিত্য, পাঠ্য ও পাঠ্যসহায়ক গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশনা’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় তিন মাসব্যাপী এই কর্মশালার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে একাডেমি। সেখানে জানানো হয়, প্রশিক্ষণার্থীরা সপ্তাহে দুই দিন উপস্থিতির ভিত্তিতে মাসে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। তবে আবেদনের জন্য প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২০ বছর এবং ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদিও লেখক, গবেষক ও অনুবাদকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ‘স্নাতক’ পাসের শর্ত মানতে পারছেন না অনেকেই।

এই শর্তের বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক ও একাডেমির উপপরিচালক মো. কামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘প্রজেক্টটি এবার পরিকল্পনা কমিশন (প্ল্যানিং কমিশন) থেকে এসেছে এবং সেভাবেই পাস করা হয়েছে। আগে এসব কর্মসূচি বাংলা একাডেমির নিজস্ব অর্থায়নে অভ্যন্তরীণভাবে হতো, তাই শর্ত ছিল না। কিন্তু এবার অর্থ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি সরকারি প্রকল্প হিসেবে আসায় সরকার যেভাবে বলেছে, আমাদের সেভাবেই শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করতে হয়েছে।’

একাডেমি সূত্রে আরও জানা গেছে, বর্তমান সরকারের অধীনেই এই প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।

বাংলা একাডেমির এই ‘সনদকেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘অবাস্তব ও উদ্ভট’ হিসেবে অভিহিত করে অনুবাদক ও লেখক জি এইচ হাবীব বলেন, ‘সৃজনশীল কাজের কর্মশালায় স্নাতক পাসের শর্তারোপ করাটা হতাশাজনক। লেখক বা গবেষকের কৌশলগত দক্ষতা বাড়ানোর জায়গায় ডিগ্রি দিয়ে মেধা যাচাই করা সম্ভব নয়। বিশ্বসাহিত্যের গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মতো বড় লেখকদেরও প্রথাগত স্নাতক ডিগ্রি ছিল না। বাংলা একাডেমির উচিত ছিল এই শর্তের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখা।’

লেখক সুমন্ত আসলাম প্রশ্ন তোলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলদের কেউই স্নাতক পাস ছিলেন না, কিন্তু তাঁরা প্রাকৃতিকভাবেই সুশিক্ষিত ছিলেন। বাংলা একাডেমি হয়তো শিক্ষার মানদণ্ড দিয়ে লেখক তৈরি করতে চাইছে, কিন্তু সাহিত্যিক মানদণ্ড আর প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড কখনোই এক নয়।’

এই সিদ্ধান্তকে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি ‘এলিট ক্লাব’ তৈরির চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে লেখক সালমান সাদ বলেন, ‘তিন মাসের প্রশিক্ষণে অনার্সের সার্টিফিকেট চাওয়া মানে কি সনদহীন কেউ সাহিত্য বা সম্পাদনা করতে পারবে না? এর ফলে সম্ভাবনাময় স্বশিক্ষিত এবং মাদ্রাসাশিক্ষিত মেধাবীরা সুযোগ হারাবেন।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করছেন অনেকে। জুবায়ের দুখু নামে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম আজ বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলা একাডেমির এই কর্মশালায় আবেদনের যোগ্যতাই হারাতেন।’

সম্পর্কিত