গাবতলীর গেরো, যমুনার জট ও বৃষ্টির বাধা, উত্তরের পথে ঈদযাত্রা যেমন ছিল

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১১টা বেজে ৫৫ মিনিট। টিকিটে লেখা নির্ধারিত সময়েই চাকা গড়াল নাবিল পরিবহনের। বাসের নরম আসনে গা এলিয়ে দিতেই চোখে পড়ল পরিপাটি করে রাখা একটি কম্বল আর এক বোতল পানি। বরাবরের মতোই মনে মনে ছক কষে নিলাম—কম্বল মুড়ি দিয়ে এক ঘুম দেব, চোখ মেললেই দেখব বাড়ির চেনা পথঘাট। ঘরে ফেরার এই কল্পিত আনন্দ প্রশান্তির এক সুবাতাস বইয়ে দিচ্ছিল মনে।

কিন্তু কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের বিস্তর ফারাক। গাড়ি ছাড়ার পর অবাক হয়ে দেখলাম, চেনা পথ ছেড়ে বাস উল্টোপথে শ্যামলীর ইন্টারসেকশন ঘুরে মূল সড়কে উঠছে। সুপারভাইজারের কাছে কারণ জানতে পারলাম—ঈদের যানজট এড়াতে গাবতলীর মাজার রোড সংলগ্ন উত্তরবঙ্গমুখী ইউটার্নটি ট্রাফিক পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে শিশুমেলার দীর্ঘ পথ ঘুরে আবার মাজার রোডে পৌঁছাতেই ঘড়িতে বাজল রাত ১টা।

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার গাবতলীতে তখন এক চরম নৈরাজ্য। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শত শত গাড়ি আর ঘরমুখো মানুষের উৎকণ্ঠা—সব মিলিয়ে এক হ-য-ব-র-ল অবস্থা। এটি মূলত সমন্বয়হীন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনারই এক চূড়ান্ত রূপ। যানজট নিরসনে ইউটার্ন বন্ধ করা হলেও কোনটি বন্ধ করা উচিত আর কোনটি নয়, সেটির সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় ভোগান্তি উল্টো বাড়ে। আর এলোমেলো এসব গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থাই যেন কারও হাতে নেই।

গাবতলীর এই আদিম জট পেরোতেই রাত ২টা বাজল। চন্দ্রা ইন্টারসেকশনের লালচে গুগল ম্যাপ দেখে চালক আর সুপারভাইজার মিলে বুদ্ধি আঁটলেন। ধামরাই পেরিয়ে কালামপুরের বাইপাস সড়ক ধরে টাঙ্গাইলের পথ ধরল আমাদের বাস। সোজা পথের চেয়ে সময় প্রায় দ্বিগুণ লাগলেও, অন্তত চাকা তো ঘুরছে!

কিন্তু আসল বিপত্তি যেন ওত পেতে ছিল যমুনা সেতুর মুখে। সেখানে পৌঁছাতেই বাস থমকে দাঁড়াল ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এক স্থির যানজটের লেজে। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহরে জানলা দিয়ে বাইরে চোখ যেতেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠল। খোলা ট্রাক বা মিনিট্রাকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছে অসংখ্য মানুষ। কখনো নামছে মুষলধারে বৃষ্টি, ভিজে চুপচুপে হয়ে কাঁপছে তারা। কোথাও আবার একই ট্রাকে গাদাগাদি করে যাচ্ছে মানুষ আর কোরবানির পশু।

জ্যাম আর ছাড়ে না দেখে অগত্যা বাস থেকে নিচে নেমে এলাম। অন্যান্য বাসের যাত্রীরাও নেমেছেন, সবার চেহারায় একরাশ বিরক্তি আর ক্লান্তির ছাপ। সেখানেই কথা হলো রংপুরের যাত্রী লিয়াকত আলীর সঙ্গে। রাজধানীর একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এই হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, 'প্রতিবার এই টোলপ্লাজায় এসে গাড়ি আটকে যায়। ম্যানুয়ালি টাকা নেওয়া, ভাংতি দেওয়া, রসিদ কাটা—প্রতিটি গাড়ির পেছনে অন্তত এক মিনিট করে সময় নষ্ট হয়। আর এই গতি কমানো-বাড়ানোর ফাঁকেই তৈরি হয় বিশাল জ্যাম।'

পাশ থেকে আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী রাসেল মাহমুদ যোগ করলেন, 'পুরো প্রক্রিয়াটি অটোমেশনের আওতায় আনলে আগে থেকেই অনলাইনে টোল পরিশোধ করা যেত। সময় বাঁচত, ভোগান্তি কমত, হিসাবও থাকত নিখুঁত। কিন্তু আমরা যেন সেই মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতেই আটকে থাকতে ভালোবাসি!'

দীর্ঘ এই ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতায় যাত্রীদের একটি পরামর্শ দিয়ে রাখা ভালো। এমন অনিশ্চিত ও স্থবির সময় কাটাতে ব্যাগে শুকনো খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখা ভীষণ জরুরি। পাশাপাশি একটি পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখা উচিত, যাতে দীর্ঘ যাত্রায় ফোনের চার্জ ফুরিয়ে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়।

ভোর পাঁচটায় একরাশ বিরক্তি নিয়ে আবার বাসে উঠলাম। এই তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টার স্থবিরতা না থাকলে হয়তো এতক্ষণে গন্তব্যের কাছাকাছি থাকতাম। যমুনা পেরোনোর পর অবশ্য আর বড় কোনো জটে পড়তে হয়নি। তবে এবার বাধা হয়ে দাঁড়াল প্রকৃতি। মুষলধারে বৃষ্টির কারণে পিচঢালা পথ হয়ে উঠল পিচ্ছিল। ওয়াইপার অবিরাম এপাশ-ওপাশ করছে, আর চালক অত্যন্ত সন্তর্পণে গাড়ির গতি কমিয়ে সাবধানে এগোচ্ছেন। খামখেয়ালি এই আবহাওয়া বা অতিবৃষ্টির পেছনেও তো রয়েছে আমাদেরই তৈরি করা জলবায়ু পরিবর্তনের দায়!

বৃষ্টির এমন দিনে যাত্রাপথে ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখাটা তাই বাধ্যতামূলক। আর যাত্রীদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, দেরি হলেও চালককে অযথা দ্রুত চালানোর জন্য তাগিদ দেবেন না; মনে রাখতে হবে, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।

অবশেষে সকাল সাতটার বদলে দুপুর ১২টায় আমাদের বাস দিনাজপুরের মাটি স্পর্শ করল। ৭ ঘণ্টার যাত্রা সাঙ্গ হলো ১২ ঘণ্টায়। তবু মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম যে, গত রোজার ঈদের তুলনায় এই ভোগান্তি নিতান্তই তুচ্ছ। সেবার রাত সাড়ে আটটায় রওনা দিয়ে পরদিন বিকেল চারটায় গন্তব্যে পৌঁছেছিলাম—লেগেছিল প্রায় দ্বিগুণ সময়! সে তুলনায় এবারের যানজট বেশ কমই বলতে হবে।

পথের সব ক্লান্তি আর দীর্ঘশ্বাস ছাপিয়ে যখন বাড়ির চৌকাঠে পা রাখলাম, তখন শেকড়ের টানে ফিরে আসার এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে উঠল মন। ঈদযাত্রা যেমনই হোক, ঘরে ফেরার এই অকৃত্রিম আনন্দের কাছে পথের সব কষ্টই যেন এক নিমিষে ম্লান হয়ে যায়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত