একসময়ের কর্মচঞ্চল ও প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত খুলনার শিল্পাঞ্চল এখন যেন এক নিস্তব্ধ বিরানভূমি। ভৈরব ও রূপসা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা কলকারখানাগুলোর চাকা থেমে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিকের জীবনে নেমে এসেছে চরম অন্ধকার। বিশেষ করে ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকে খালিশপুরসহ পুরো শিল্পাঞ্চলে এখন কেবল হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে খুলনার শিল্পায়নের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। আশির দশকেও এই এলাকা ছিল অসম্ভব জমজমাট। তবে ১৯৯৩ সালে ২৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত খুলনা টেক্সটাইল মিলটি বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে ভারী শিল্পের পতনের সূচনা হয়। এরপর একে একে হার্ডবোর্ড মিল, নিউজপ্রিন্ট মিল এবং দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২ জুলাই খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের গেটে বন্ধের নোটিশ ঝোলানো হয়, যা ৩ জুলাই থেকে কার্যকর হয়।
মানবেতর জীবন ও পেশা বদল
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান জানান, পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। পাটকল চালুর আশায় অনেক শ্রমিক এখনো কলোনির আশেপাশে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। তবে দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে অনেকেই পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। একসময়ের দক্ষ শ্রমিকরা এখন পেটের দায়ে ইজিবাইক বা রিকশা চালিয়ে কোনোমতে দিনাতিপাত করছেন।
সিপিবি নেতা এসএ রশীদ বলেন, ‘আশির দশকে খালিশপুর ছিল প্রাণের স্পন্দনে গমগম। আজ সেখানে সুনসান নীরবতা। কাজ হারিয়ে অধিকাংশ শ্রমিক এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘদিন আয়-রোজগারহীন থাকায় এসব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।’
রশীদ আরও জানান, সেনাশাসক এরশাদ ১৯৮৪ সালে প্রথম বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে এই এলাকার কল-কারখানাগুলো বন্ধ করা শুরু করেন, যার ধারাবাহিকতা এখনও চলমান। একসময়ের কর্মচঞ্চল খালিশপুর এখন প্রায় বিরানভূমি।
খুলনা নগর থেকে অন্তত আট কিলোমিটার দূর খালিশপুর। সরেজমিনে খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার ‘চিত্রালী বাজার’ এখন ক্রেতাশূন্য। ব্যবসায়ীরা জানান, পাটকল বন্ধের পর বাজারে ঈদের আমেজ বলতে কিছু নেই। জুটমিলের অস্থায়ী শ্রমিক নাসিমা বেগম কান্নাভেজা চোখে জানান, অর্থকষ্টে অমানবিক জীবনযাপন করছেন তিনি, অথচ কোনো সরকারি সহায়তা পান না। ২০০৯ সাল থেকে কাজ করা পারুল বেগম স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আগে বৃহস্পতিবার ছিল আমাদের কাছে উৎসবের দিন, ওইদিন মজুরি পেতাম। আর এখন ঈদ এলেও সাহায্যের আশায় পথ চেয়ে থাকতে হয়।’
প্লাটিনাম জুবিলী জুটমিলের শ্রমিক আজাদুর রহমান দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় কাজ করেছেন। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর স্মৃতিবিজড়িত কলোনির গেটে এসে তিনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কলোনি গেটের নিরাপত্তাকর্মী মো. রফিক মিয়া জানান, প্রতিদিন অনেক প্রাক্তন শ্রমিক এখানে ঘুরতে আসেন এবং নিজের কর্মস্থলের ধ্বংসস্তূপ দেখে নীরবে চোখের পানি ফেলেন।
শ্রমিকদের দাবি, নতুন সরকারের আমলে যেন বেসরকারি নয়, বরং সরকারি ব্যবস্থাপনায় আবার এসব পাটকল চালু করা হয়। একসময়ের ‘প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার’ খ্যাত এই শিল্পাঞ্চল আবার প্রাণ ফিরে পাবে—এমনটাই শেষ ভরসা অসহায় শ্রমিকদের।