leadT1ad

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নির্ভয়ে গান গাওয়ার নিশ্চয়তা চায় ছায়ানট

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

বক্তব্য দিচ্ছেন ছায়ানট সভাপতি ড. সারওয়ার আলী

সমাজের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা আর মতয়প্রকাশের ক্ষেত্রে দলবদ্ধ নিগ্রহের শঙ্কাকে পেছনে ফেলে নির্ভয়ে গান গাওয়ার নিশ্চয়তা চেয়েছে ছায়ানট। পহেলা বৈশাখের (১৪ এপ্রিল) ভোরে রমনার বটমূলে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে গিয়ে ছায়ানট সভাপতি ড. সারওয়ার আলী সংস্কৃতির পথকে কণ্টকমুক্ত রাখা এবং শঙ্কামুক্ত পরিবেশে বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অশুভ শক্তির অন্ধকার ঠেলে সুরের শক্তিতে বাঙালির ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখাই ছিল এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মূল সুর।

ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় যখন নতুন বছরের সূর্য উঁকি দিচ্ছিল, ঢাকার রমনার বটমূল তখন মুখরিত বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের সুরে। জরা আর গ্লানি মুছে দিয়ে নতুন এক আবাহনে মেতেছে রাজধানীসহ পুরো দেশ। ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আজ কেবল একটি উৎসব নয়, বরং বাঙালি জাতিসত্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। সুরের মূর্ছনা, কবিতার ছন্দ আর বলিষ্ঠ বক্তব্যে এবারের আয়োজনটিও হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত ও সময়োপযোগী।

রমনার বটমূলে বর্ষবরণ। স্ট্রিম ছবি
রমনার বটমূলে বর্ষবরণ। স্ট্রিম ছবি

বরাবরের মতোই এবারও অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সম্মেলক গানের মধ্য দিয়ে। অজয় ভট্টাচার্যের কালজয়ী কথা ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানটি পরিবেশন করেন মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া, ঐশ্বর্য সমাদ্দার, প্রিয়ন্তু দেব ও সমুদ্র শুভম। সেই ভোরের লগ্নে গানের সুর যখন রমনার আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন উপস্থিত হাজারো শ্রোতার মনে এক প্রশান্তি খেলা করে যায়।

এবারের অনুষ্ঠানের বিন্যাস ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। মোট আটটি সম্মেলক গান, ১৪টি একক গান এবং দুটি পাঠ নিয়ে সাজানো হয়েছিল মূল আয়োজন। প্রায় ২০০ জন শিল্পী এই দীর্ঘ কর্মযজ্ঞে অংশ নেন। ছোট ও বড়দের যৌথ অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি কেবল সংগীতানুষ্ঠান থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল এক মহাসম্মিলন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বক্তব্য দেন ছায়ানটের সভাপতি ড. সারওয়ার আলী। তাঁর বক্তব্যে ফুটে ওঠে বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস এবং বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং কোভিডের দুই বছর বাদে কখনও থামেনি।

ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। স্ট্রিম ছবি
ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। স্ট্রিম ছবি

সারওয়ার আলী বিগত বছরের কিছু অশুভ ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘গত বছর বিজয় দিবসের মাত্র দুদিন পর ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে যে ভাঙচুর চালানো হয়েছিল, তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। গভীর রাতে ভাঙা হারমোনিয়াম, তবলা, তানপুরা এবং নালন্দা বিদ্যালয়ের শিশুদের বইপত্র ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকার দুঃসহ স্মৃতি আজও বাঙালি সংস্কৃতির অনুসারীদের মনে আতঙ্ক তৈরি করে।’ একই রাতে দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং পরের দিন উদীচী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাগুলোকে তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরেন।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ২০০১ সালের রমনার সেই নৃশংস বোমা হামলার কথা, যেখানে ১০ জন সংস্কৃতিমনা মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সারওয়ার আলী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে সংগীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা, মিলন-বিরহ ও সংকটের সঙ্গী; যে সংগীত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সব অধিকার অর্জনের অবলম্বন, সেই সংগীত থেকেই আজ অপশক্তি মানুষকে নিরস্ত করতে চাইছে।’ তিনি মনে করেন, সমাজে অসহিষ্ণুতা এবং নিজের মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে দলবদ্ধ নিগ্রহের আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে।

ছায়ানট সভাপতির বক্তব্যে কেবল স্বদেশের সংকট নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতাও স্থান পেয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েলি নিগ্রহের কারণে পারস্য সভ্যতার বর্তমান বিপর্যয় এবং বিশ্বজুড়ে যে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে তিনি বিশ্বশান্তির কামনা করেন।

বর্ষবরণে অংশ নিয়েছেন নানা বয়সের, শ্রেণিপেশার মানুষ। স্ট্রিম ছবি
বর্ষবরণে অংশ নিয়েছেন নানা বয়সের, শ্রেণিপেশার মানুষ। স্ট্রিম ছবি

বক্তব্যের শেষে তিনি কবিগুরুর পঙক্তি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমরা এমন এক মাতৃভূমির স্বপ্ন দেখি—চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা শির; জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর।’ বাঙালির এই সংস্কৃতি যেন সকল ভয়ভীতি ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি সম্প্রীতিময় সমাজ গঠন করতে পারে, এটাই ছিল তার মূল আহ্বান।

এবারের আয়োজনে লোকজ জীবনের সুর এবং দেশপ্রেমের গানের পাশাপাশি ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের গীতিকার মতলুব আলীর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

একক সংগীত পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একাধিক গান পরিবেশন করেন মাকছুরা আখতার অন্তরা, আজিজুর রহমান তুহিন, সেমন্তী মঞ্জরী, তানিয়া মান্নান ও লাইসা আহমদ লিসা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহ ও প্রেমের গানে কণ্ঠ দেন বিটু কুমার শীল, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি, খায়রুল আনাম শাকিল ও শারমিন সাথী ইসলাম ময়না। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন শ্রাবন্তী ধর।

আবৃত্তির পর্বে ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তসহ বিভিন্ন কবির কবিতা এবং খায়রুল আলম সবুজের কণ্ঠে সলিল চৌধুরীর ‘এক গুচ্ছ চাবি’ ভিন্নধর্মী মাত্রা যোগ করে। লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত গান ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’ পরিবেশন করেন প্রখ্যাত শিল্পী চন্দনা মজুমদার। এছাড়া আব্দুল লতিফ ও সাধন চন্দ্র বর্মণের গানগুলো দলীয় কণ্ঠে পরিবেশিত হয়ে অনুষ্ঠানকে পূর্ণতা দেয়।

২০০১ সালের হামলার পর থেকেই রমনার এই অনুষ্ঠান কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এবারও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছায়ানট কর্মীদের সঙ্গে সেবায় নিয়োজিত ছিল থার্টিনথ হুসার্স ওপেন রোভার গ্রুপ ও এজিস সার্ভিসেস লিমিটেড। উৎসবের নান্দনিক মঞ্চ সজ্জার দায়িত্বে ছিলেন ছায়ানটেরই দুই প্রাক্তনী— মমিনুল হক দুলু ও রণজিত রায়।

সবশেষে সব শিল্পী ও উপস্থিত জনতার সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে বর্ষবরণের এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের। রমনার বটমূলের এই ধ্বনি যেন কেবল এক দিনের উৎসব নয়, বরং সারা বছরের জন্য বাঙালির আত্মশক্তির রসদ। অশুভ শক্তির অন্ধকার ঠেলে আলোর পথে যাত্রা করার যে দীক্ষা ছায়ানট দিয়ে আসছে, এবারের আয়োজনটি ছিল তারই এক বলিষ্ঠ ধারাবাহিকতা। নতুন বছর বয়ে আনুক শান্তি, সম্প্রীতি আর নির্ভয়ে পথ চলার শক্তি—এই প্রত্যাশাই আজ সকল বাঙালির।

Ad 300x250

সম্পর্কিত