টুং টাং শব্দে মুখর কামারশালা, চড়া ছুরি-চাপাতির বাজার

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ২২: ১৩
কারওয়ান বাজারের কর্মকার মার্কেটে সাজানো দা-বঁটি-চাপাতিসহ কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার সরঞ্জাম। স্ট্রিম ছবি

কোরবানির ঈদে ব্যস্ত সময় পার করছে কারওয়ান বাজারের মিউনিসিপ্যাল কর্মকার মার্কেটে। রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ এই কামারশালায় কেউ হাঁপর টানছেন, কেউ জ্বলন্ত আগুনে কয়লা ঢালছেন। কেউবা টুং টাং শব্দে তপ্ত লোহা পিটিয়ে বানাচ্ছেন দা–বঁটি, চাপাতি, ছুরি–চাকু। দাম চড়া হলেও এসব বিক্রি হচ্ছে ঢের।

শুক্রবার কারওয়ান বাজারে গিয়ে এসব দোকানে দেখা গেছে কেনাকাটার আমেজ। এখানে অন্তত ১২টি কামারশালা রয়েছে। প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব দোকান। কর্মকার মার্কেটের প্রতিষ্ঠানমালিক ও কর্মীরা বলছেন, সারা বছর বেচাবিক্রি কম থাকলেও কোরবানির ঈদ ঘিরে তাঁদের বিক্রি বাড়ে। সেই সঙ্গে বাড়ে কাজের চাপ।

এমনকি কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে কামারশালায় কাজ করেন অনেক মৌসুমি শ্রমিকও। এমনই একজন মোহাম্মদ শরীফ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রিক কাজ করেন তিনি। তবে প্রতি কোরবানির আগে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় দা-বঁটি তৈরি ও পুরাতন যন্ত্র মেরামতের কাজ করে আবার ফিরে যান পুরোনো পেশায়।

শরীফের ভাষ্য, ‘কোরবানিতে দা-বঁটি, চাপাতির চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময় কাজও থাকে বেশি। ইলেক্ট্রিক কাজের তুলনায় বাড়তি টাকা পাওয়া যায়। গত কয়েক বছর ধরেই কোরবানির আগে ঢাকা আসি। আমার মতো আরও অনেকেই আসেন।’

ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে কারওয়ান বাজারে কামারের কাজ করে রুবেলের পরিবার। রুবেল স্ট্রিমকে বলেন, ঈদ ঘিরে ইতিমধ্যে বেচাবিক্রি বেড়েছে। তবে ঈদ আসতে আসতে বিক্রি আরও বাড়বে। কারণ, অনেক মানুষ এসব কিনে একেবারে শেষ সময়ে।

৪০ বছরের বেশি সময় ধরে কারওয়ান বাজারে লোহার বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করেন মোহাম্মদ মানিক। পাশাপাশি জনতা ট্রেডার্স অ্যান্ড নোয়াখালী হার্ডওয়্যারের মালিক তিনি। নিজেরা যন্ত্র তৈরি করে এই দোকানে বিক্রি করেন।

স্ট্রিমকে মানিক বলেন, বছর বাকি সময় খুব একটা বেচাকেনা থাকে না। তখন দা-বঁটির বাইরে অন্যান্য যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করেন তাঁরা। কোরবানি এলে মাংস কাটার যন্ত্রের চাহিতা বাড়ে।

তবে অনলাইনে ছুরি-চাপাতির ব্যবসার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন মানিক। হতাশা প্রকাশ করে মানিক বলেন, ‘অনেকে অনলাইনে ছুরি-চাপাতি বিক্রি করে। গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জনে তাঁদের অনেকে আমাদের কারখানার ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে। কিন্তু ডেলিভারি দেয় বাজে কোয়ালিটির যন্ত্র। চকচকা দেখে মানুষ ওই যন্ত্র কেনেন। কিন্তু পরে আর ওই যন্ত্র দিয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না। আর বদনাম হয় আমাদের।’

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, লোহার তৈরি এসব সরঞ্জাম বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে। বিভিন্ন ধরনের লোহায় তৈরি এসব পণ্যের দামেরও রয়েছে তারতম্য। ভালো মানের লোহায় তৈরি দা, বঁটি, চাপাতি, বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি। মিশ্র লোহায় তৈরিগুলোর দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি।

বড় একটি চাপাতির ওজন হয় এক থেকে দেড় কেজি। ভালো লোহার বড় চাপাতির দাম পড়ছে ১২ শ থেকে ১৩ শ টাকা। আর বড় বঁটিগুলোর দাম পড়ছে ১৩ শ থেকে ১৭ শ টাকা।

এ ছাড়া বড় ছুরি বিক্রি হচ্ছে ১৫ শ থেকে ২ হাজার টাকায়। স্প্রিংয়ের তৈরি ও সেগুন কাঠের হাতল লাগানো কিছু ছুরি বিক্রি হচ্ছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায়। মাঝারি ছুরিগুলোর দাম চাচ্ছে ৬০০ থেকে ১২০০ টাকায়।

সেইসঙ্গে মাঝারি চাকু বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। ছোট চাকুর দাম চাচ্ছেন ২০০ টাকা। এ ছাড়াও চাইনিজ কুড়াল বিক্রি হেচ্ছে ১২ শ থেকে ১৫ শ টাকায়। আর চাপাতি, ছুরির ধার করার স্টিক বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকায়।

এ দিকে ক্রেতাদের দাবি, প্রতিবছরই বাড়ছে এসব যন্ত্রের দাম। কেউ বলছেন, ঈদের আগে চাপে ফেলে বাড়তি দাম নিচ্ছে দোকানিরা।

রামপুরা থেকে চাপাতি কিনতে আসা আসাদুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘এর আগে অনলাইন থেকে চাপাতি কিনেছিলাম। সেটা দিয়ে তেমন কোনো কাজ করা যায়নি। তাই এবার সরাসরি কামারশালায় এলাম। কিন্তু এখানে দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে।’

সম্পর্কিত