জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

অনিশ্চয়তা কাটিয়ে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততায় বইমেলা প্রাঙ্গণ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৫৯
কাল উঠছে বইমেলার পর্দা। স্ট্রিম ছবি

দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা টানাপোড়েনের পর অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে একুশে বইমেলার। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বেলা দুইটায় আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে দেশের এই বৃহৎ সাহিত্য ও সংস্কৃতির আসরের।

মেলা কবে শুরু হবে, আদৌ যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে কি না—এমন নানা জল্পনা-কল্পনা ও সংশয়ের মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহ পার করেছেন লেখক, পাঠক ও প্রকাশকেরা। তবে অবশেষে সব অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে মেলা শুরু হতে যাওয়ায় মেলা প্রাঙ্গণে এখন উৎসবের আমেজ ও স্বস্তি বিরাজ করছে।

এবারের মেলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে প্রকাশকদের। বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে এসে প্যাভিলিয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তে অনেক প্রকাশনা সংস্থাই বিপাকে পড়েছেন। যারা আগে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ পেয়েছিলেন, তাদের এখন প্যাভিলিয়নের পরিবর্তে ৫ বা ৬টি করে সাধারণ স্টল দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে এখন হাতুড়ি-পেরেক আর করাতের শব্দ। বাতাসে উড়ছে কাঠের গুঁড়া আর কাঁচা রঙের গন্ধ। বেশির ভাগ স্টলের কাজ এখনো চলমান। কিছু স্টল পুরোপুরি প্রস্তুত হলেও সিংহভাগেরই কাজ এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে। প্রকাশকদের শেষ প্রস্তুতি চলছে রাত-দিন এক করে।

এ বিষয়ে প্রকাশনা সংস্থা ‘তাম্রলিপি’র ব্যবস্থাপক জামিউল কাউছার স্ট্রিমকে বলেন, ‘শুরুতে আমাদের প্যাভিলিয়ন দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী আমরা বেশ কিছু কাজও এগিয়ে নিয়েছিলাম। এখন সেই প্যাভিলিয়ন ভেঙে নতুন করে সাধারণ স্টলের কাজ করতে হচ্ছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি সময় লাগছে। তবে আমরা আশাবাদী, আজ রাত এবং কাল দুপুরের মধ্যেই আমাদের সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।’

প্যাভিলিয়ন বাতিলের কারণে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন প্রথম সারির অনেক প্রকাশক। প্যাভিলিয়নের কাজ কতদূর হয়েছিল—জানতে চাইলে জামিউল কাউছার বলেন, ‘প্যাভিলিয়নের পেছনে আমাদের এরই মধ্যে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়ে গিয়েছিল। আমরা ধীরে ধীরে কাজ করছিলাম বলে খরচ কিছুটা কম হয়েছে। কিন্তু আমার জানা মতে, অনেক প্রকাশকের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে।’

এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ কে দেবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারব না। তবে জেনেছি, বাংলা একাডেমি থেকে একটা নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রকাশক এখন স্টল করতে বলেছেন, আমরা সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই দ্রুত কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।’

‘বাংলা প্রকাশন’-এর স্টল নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে ‘ঢেউ’ নামের একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান। এর স্বত্বাধিকারী আসলামুজ্জামান পলাশ জানান তাঁদের বর্তমান প্রস্তুতি সম্পর্কে। তিনি বলেন, ‘বাংলা প্রকাশনেরও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ ছিল। তবে নানা ঘটনার কারণে এবং কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকায় আমরা শুরুতে কাঠামো নির্মাণের কাজ ধরিনি, কেবল ডিজাইন চূড়ান্ত করে রেখেছিলাম। এখন আমাদের ৬টি স্টল দেওয়া হয়েছে। সেই নতুন নকশা অনুযায়ীই কাজ চলছে এবং বলা যায় আমাদের কাজ মোটামুটি শেষের পথে।’

চলছে মেলার শেষ সময়ের প্রস্তুতি। স্ট্রিম ছবি
চলছে মেলার শেষ সময়ের প্রস্তুতি। স্ট্রিম ছবি

অন্যদিকে, ‘জাগতিক প্রকাশনী’র স্টল সজ্জার দায়িত্বে থাকা অনিকা বেশ আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্টলের কাঠামোগত কাজ শেষ, এখন শুধু রঙের কাজ বাকি। আমরা আজকের মধ্যেই সব শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছি। যেহেতু বেশিসংখ্যক শ্রমিক কাজে লাগানো হয়েছে, তাই আশা করছি কালকের মধ্যেই সবকিছু নিখুঁতভাবে শেষ করা সম্ভব হবে।’

সবাই যখন শেষ মুহূর্তের চাপে দিশাহারা, তখন কিছু প্রকাশনা সংস্থা বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। ‘আলোঘর প্রকাশনা’র সেলস অফিসার মো. নাঈম ইসলাম জানালেন তাদের স্বস্তির কথা। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ একদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও অনেক আগেই কাজ শুরু করেছিলাম। শুরুতেই স্টলের জন্য টাকা জমা দিয়েছিলাম। সে কারণেই এত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ‘আজ থেকেই তাদের স্টলে বই আনা শুরু হবে এবং কাল থেকে মেলা পুরোদমে শুরু করার জন্য তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’

বইমেলায় আগত দর্শনার্থী, লেখক ও প্রকাশকদের সুবিধার্থে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। মেলা প্রাঙ্গণে মসজিদের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ওজুখানা এবং আনুষঙ্গিক কিছু কাজ এখনও বাকি। ওজুখানার নির্মাণকাজে নিয়োজিত মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া ছয় দিন ধরে এখানে কাজ করছেন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘ওয়াশরুমের কাজ পুরোপুরি শেষ। নারী ও পুরুষ—উভয় দিকের ওয়াশরুমই প্রস্তুত। তবে ওজুখানার আস্তরের কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে। আমরা রাতে এই কাজ শুরু করব।’ রাতে কাজ করলে কালকের মধ্যে তা ব্যবহারযোগ্য হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘রাতে একটানা কাজ করতে পারলে কাল বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে দর্শনার্থীরা এটি অনায়াসেই ব্যবহার করতে পারবেন।’

অনিশ্চয়তা, আর্থিক ক্ষতি, প্যাভিলিয়ন বাতিলের মতো নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অমর একুশে বইমেলা এখন আপন আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার অপেক্ষায়। রং-তুলির শেষ আঁচড় আর নতুন বইয়ের ঘ্রাণে কাল থেকেই মুখরিত হবে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণ। লেখক, পাঠক আর প্রকাশকদের পদচারণায় আবারও প্রাণ ফিরে পাবে বাঙালির এই প্রাণের মেলা। এখন কেবলই সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা।

সম্পর্কিত