ভেনেজুয়েলা-জাপানে ভূমিকম্প

ঢাকার বিপদ কতটা, ঝুঁকি কম কোথায়

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে রাজধানীর সুরক্ষায় মেগা কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। স্ট্রিম গ্রাফিক

লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে ধসে পড়েছে অনেক ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন অনেকে। দেশটিতে জারি হয়েছে জরুরি অবস্থা। এর রেশ না কাটতেই বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপেছে জাপান।

বিশ্বজুড়ে এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক বাড়ছে বাংলাদেশেও। কারণ, সম্প্রতি ঢাকা ও এর আশপাশে বেশ কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। বড় ভূমিকম্পে ঢাকা কতটা প্রস্তুত না নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

গত সোমবার (২২ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা। কেন্দ্র ছিল রাজধানীর কাছেই—নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। মাটির মাত্র ১৬ কিলোমিটার গভীরে উৎপন্ন হওয়ায় তীব্রতা বেশি টের পান নগরবাসী।

এর আগে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩.২ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। আর গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার মাঝারি শক্তির ভূমিকম্প হয়। গত কয়েক দশকে দেশের ভেতরে এটিই অন্যতম শক্তিশালী কম্পন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখানে আরও তিনটি কম্পন হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত দেড় বছরে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ঢাকার খুব কাছাকাছি।

দেশে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা এবং তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন করেছে বিবিসি বাংলা।

আসতে পারে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, দেশে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি সীমান্ত অঞ্চল এবং শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর এলাকায়।

তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, ১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার এবং ১৮৮৫ সালে বগুড়ার শেরপুরে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এগুলো ঢাকা থেকে ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত।

অধ্যাপক আনসারী বলেন, প্রতিটি ভূমিকম্পের একটি ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা ফিরে আসার চক্র থাকে। ঢাকা থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বড় ভূমিকম্পের চক্র প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর। কিন্তু ৭ মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ১৫০-২০০ বছরের মধ্যে ফিরে আসে।

তিনি আরও বলেন, ‘৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প শিগগিরই ঢাকায় আসার সম্ভাবনা আছে। কবে আসবে নিশ্চিত বলা যায় না; ২০ বছরও লেগে যেতে পারে।’

ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমিকম্পে নিরাপত্তা মূলত নির্ভর করে মাটির গঠন ও ভবনের অবকাঠামোর ওপর।

ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, ঢাকার উত্তর দিকে রয়েছে শক্ত লাল মাটি। তাই রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান ও তেজগাঁও এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ। অন্যদিকে, পূর্ব-পশ্চিমে জলাশয় ভরাট করে গড়ে ওঠা নরম পলিমাটির এলাকাগুলো অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে শুধু শক্ত মাটি থাকলেই হবে না। অধ্যাপক আনসারী বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কোনো ভবন নিরাপদ কিনা, তা বলা কঠিন। পুরান ঢাকাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও সেখানকার অনেক পুরোনো ভবন শত বছরেও ভাঙেনি। তবে পুরান ঢাকার প্রধান সমস্যা এর সরু রাস্তা। বড় দুর্যোগে সেখানে উদ্ধারকাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বড় বিপদ ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বা লুকানো চ্যুতি

ঢাকার ভেতরে সরাসরি কোনো ফল্ট লাইন বা চ্যুতিরেখা নেই। তবে দেশের ভেতরে ও সীমান্তে পাঁচটি পরিচিত চ্যুতিরেখা আছে। গবেষকদের মতে, এগুলোর কিছু জায়গায় ৩৫০ থেকে ৯০০ বছর পর পর বড় ভূমিকম্প হতে পারে।

ঢাকার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বা লুকানো চ্যুতি। এগুলো মাটির অনেক গভীরে থাকে বলে ভূপৃষ্ঠে কোনো চিহ্ন থাকে না। ফলে সহজে শনাক্ত করা যায় না। বাংলাদেশে ময়মনসিংহ ও রংপুরে এমন দুটি ফল্ট শনাক্ত হয়েছে। কোনো আগাম সতর্কতা পাওয়া যায় না বলেই ঢাকার জন্য এগুলো বেশি ভয়ের কারণ।

সরকারের প্রস্তুতি কতটুকু

বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকায় ৪৪৫টি নিরাপদ আশ্রয়স্থল ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছে। গতকাল বুধবার (২৪ জুন) জাতীয় সংসদে এ কথা জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব।

মন্ত্রী জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ২৫৬টি এবং উত্তরে ১৮৯টি স্থানকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করার কাজ চলছে। জোর দেওয়া হচ্ছে বিল্ডিং কোড বা ইমারত বিধিমালা মেনে ভবন নির্মাণে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত