পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি, তিস্তা নিয়ে নতুন সম্ভাবনা দেখছে বিএনপি

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ২০: ৪৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

নির্বাচনে জিতে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিএনপি সরকার এই পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে তিস্তাসহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধান করতে চাইছে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার আগ্রহী থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের সদ্যবিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণেই বাংলাদেশ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি। আবার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ‘নতজানু’ পররাষ্ট্রনীতিও দায়ী। তবে এখন সময় বদলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বিজেপি। তারা আন্তরিক হলে তিস্তাসহ দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান সম্ভব।

বিএনপির তথ্যবিষয়ক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল বলেছেন, তিস্তা নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সব সময় আগ্রহী। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এক্ষেত্রে প্রধান বাধা ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর আপত্তির কারণেই চুক্তিটি এগোয়নি। রাজ্য সরকারে পরিবর্তন এসেছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারে বিজেপি থাকায় ভালো রাজনৈতিক সমন্বয় থাকবে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আলোচনার ক্ষেত্রগুলো কাজে লাগাবে।

তিনি আরও বলেন, তিস্তা নিয়ে বিএনপিরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তি হবে কিনা নিশ্চিত বলা না গেলেও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায়, নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

তিস্তা চুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ

তিস্তা চুক্তিকে বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত ইস্যু বলা হয়। শুধু পানিবণ্টন নয়, এটি দুদেশের সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। তিস্তা নদীর ওপর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদী অববাহিকার অন্তত দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায় প্রভাব পড়ছে। ভারত নদীতে তার অংশে সিকিমে বাঁধ, ব্যারাজ, জলবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করাই এই মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।

যদিও দুদেশ আলোচনার মাধ্যমে তিস্তা চুক্তির যে খসড়া করে, তাতে শুষ্ক মৌসুমে পানির ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাংলাদেশ পাওয়া কথা। ভারত ৪২ দশমিক ৫ এবং বাকি ২০ শতাংশ পানি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় থাকার প্রস্তাব রয়েছে।

কংগ্রেস সরকারে থাকার সময় ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে চুক্তিটি সই হওয়ার কথা থাকলেও, মমতা ব্যানার্জির আপত্তিতে আটকে যায়। এরপর ক্ষমতায় বিজেপি আসে। নরেন্দ্র মোদির সরকার একাধিকবার চুক্তির আশ্বাস দিলেও, তা হয়নি।

ইশতেহারে গুরুত্ব, রয়েছে নিজস্ব পরিকল্পনা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ইশতেহারের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রতিশ্রুতিতে পদ্মা, তিস্তাসহ সব আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের বিষয় উল্লেখ করেছে বিএনপি। পানি সম্পদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ‘ওয়াটার কনভেনশন-১৯৯৭’ সই করা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পানি সমস্যা তুলে ধরবে। তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ ও উত্তরের পানি নিরাপত্তা, বন্যা ও মরুকরণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।

এ ছাড়া যৌথ নদী কমিশনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ওপার থেকে প্রবাহিত নদীর পানির হিস্যা আদায়ে ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে। বিএনপি এই প্রক্রিয়ায় নেপাল, ভুটান ও চীনকে অংশীদার করতে চায়। ইতোমধ্যে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীনের সম্পৃক্ততা এবং সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ।

এ ব্যাপারে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ স্ট্রিমকে বলেছেন, তিস্তা চুক্তি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে নয়, বরং বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ ও নীতির প্রশ্নে ন্যায্য হিস্যা আদায় করবে।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে তিস্তা চুক্তিতে বিএনপি আত্মবিশ্বাসী– এটি আসলে গতানুগতিক কথা। আমরা আমাদের স্বার্থ ও পলিসি নিয়েই এগোচ্ছি। ভারতের সরকারে কে এল-গেল, তা দেখার বিষয় না। আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থ আদায় করতে চাই।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তিস্তা ইস্যুতে নিজেদের কারিগরি প্রস্তুতি জোরদার করেছে। একসঙ্গে ফারাক্কা, পদ্মা ব্যারাজসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পররাষ্ট্রনীতিতে আওয়ামী লীগের ‘নতজানু’ অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি। বিএনপি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট ও ম্যান্ডেট নিয়ে সরকারে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা ভারতের কাছ থেকে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা এবং সমবণ্টনের নীতি আদায় করতে সক্ষম হব।

সম্পর্কিত