ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন ব্যাংক এমডিরা, দ্রুত সমাধানের তাগিদ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১৭: ২৫
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি)। স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন অন্য ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীরা। তাঁদের মতে, বিষয়টি শুধু একটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, এর সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে পুরো ব্যাংকিং খাতে।

আজ বুধবার (১০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ উদ্বেগের কথা জানান ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন।

বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত নিয়মিত ব্যাংকার্স সভায় মূল আলোচ্যসূচির বাইরে ইসলামী ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের এমডি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নররা এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মাসরুর আরেফিন বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, এটি শুধু একটি একক প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, বরং এর প্রতিক্রিয়া পুরো ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, ‘গভর্নরও বিষয়টিকে কেবল ব্যাংকিং খাতের সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তিনি এটিকে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করছেন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান এবিবির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, গভর্নর ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গভর্নর ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সিআইবিতে (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) ঋণগ্রহীতাদের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছেন।

বৈঠকে দেশের অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাসরুর আরেফিন বলেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থাৎ এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ) খাতে ঋণ সহায়তা দিতে এ তহবিল ব্যবহার করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এই অর্থ বিতরণ করা হবে।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানির তথ্য আদান-প্রদান নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। মাসরুর আরেফিন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আমদানি ও রপ্তানি-সংক্রান্ত তথ্য সময়মতো পাঠানো হয় না অথবা তথ্যগত ভুল থেকে যায়। এর ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে জটিলতা তৈরি হয়।

বিশেষ করে আমদানি পণ্যের ঘোষিত মূল্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রে ঘোষিত মূল্য ও প্রকৃত মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক লেনদেন ও পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করছে।

এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য যাচাইয়ে আরও সতর্ক হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম এবং ইন্টারনেটভিত্তিক মূল্যতথ্য ব্যবহার করে এলসি (ঋণপত্র) খোলা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাংকগুলোকে আরও সচেতন হতে হবে।

মাসরুর আরেফিন বলেন, এর মূল উদ্দেশ্য হলো আমদানি পণ্যের অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে যাতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় না হয় এবং জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা।

ব্যাংকারদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতে সুশাসন, এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ) খাতে নতুন অর্থায়ন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে স্বচ্ছতা—এই চারটি বিষয়ই বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে।

সম্পর্কিত