সবার মত নিয়ে ‘গ্রহণযোগ্য’ সংবিধান সংশোধনী চায় বিশেষ কমিটি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৩৪
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংগৃহীত ছবি

সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে তারা একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করতে চান। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে সংসদ ভবনে কমিটির প্রথম বৈঠকের শুরুতে সাংবাদিকদের একথা বলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা উদার ও ওপেন। আমরা সবার কথা শুনব। সর্বত্র যা যা সংশোধনের প্রয়োজন, সেসব সংশোধনী আমরা ধারণ করে, সেভাবে রিপোর্ট প্রণয়ন করব।’ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে আনা হবে বলে জানান তিনি।

সংবিধান সংস্কারে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছিল, সেটি অনুসরণ করেনি নির্বাচিত বিএনপি সরকার। এই নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে সংসদ।

কমিটির প্রথম বৈঠক দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনী বিল যখন সংসদে আসবে, তখন আলোচনা করে আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে সংশোধনীটা গ্রহণ করতে চাই। সেই সংশোধনী জনপ্রত্যাশা পূরণ করবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে রাখার চেষ্টা করবে কমিটি। বাংলাদেশের এই নবযাত্রা এবং রাষ্ট্রকাঠামোর যে আমরা বিবর্তনমূলক কাজে যাচ্ছি এবং রাষ্ট্রকাঠামোর যে গণতান্ত্রিক সংস্কার আমরা করতে চাই, সেগুলো আমরা এখানে এড্রেস করব, ধারণ করব, যেটি আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান কমিটির সভাপতি। বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করলেও, তাদের মতামতও নেওয়া হবে।’

কত দিনের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন হবে, তা বলতে পারেননি সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘সময়টা এখন নির্ধারণ করে বলতে পারব না।’

সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলকে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার তাদের কাছে পাঁচজনের নাম চেয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল তাতে সায় দেয়নি। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে পাঁচটি নাম দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো আমরা এখনো পাইনি। আমি আশা করি, তারা হয়তো অনুধাবন করবেন এবং এক পর্যায়ে হয়তো নাম দেবেন। তাদের সঙ্গেও আমরা আলোচনা করব।

বিরোধী দল নাম না দিলেও, তাদের সংসদ সদস্যদের মতামত নেওয়া হবে জানান কমিটির সভাপতি। তিনি জানান, কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে অথবা বৈঠকের বাইরে লিখিতভাবে প্রস্তাব দিলেও, তা নেওয়া হবে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিরোধী দল নাম যদি নাও দেয়, আমরা বিরোধী দলের যারা আছেন, তাদের পরামর্শ গ্রহণ করব। তারা যদি বৈঠকে এসে দেন ভালো; বাইরে দিলেও যদি লিখিত হয়, আমরা তা গ্রহণ করব।’

তিনি বলেন, ‘এভাবে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চাই। জনপ্রত্যাশা সবকিছু আমরা ধারণ করতে চাই। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আমরা সেই প্রতিবেদন প্রণয়ন করতে চাই।’

সংবিধান সংস্কারে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছিল, সেটি অনুসরণ করেনি নির্বাচিত বিএনপি সরকার। এই নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে সংসদ।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারে যে ক’টি কমিশন করেছিল, তার মধ্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন একটি। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, জনমত জরিপসহ বিভিন্নভাবে নেওয়া মতামতের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি ওই কমিশন বিস্তারিত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়। পরে ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফায় দীর্ঘ আলোচনা করে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ।

সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান–সম্পর্কিত। এর মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানসহ এই ধরনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। তবে এই ধরনের কিছু প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) ছিল।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব কমিটি পর্যালোচনা করবে। যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে নেওয়া হবে। যেসব বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত দিয়েছিল, সেগুলো ভিন্নমত হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।

তিনি বলেন, ‘৪৮টির মধ্যে অনেক কিছু আছে। আমরা রাজি হয়েছি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে। সেগুলো তো আমরা নেবই। আর যেগুলোতে আমরা নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছি, সেগুলো নোট অফ ডিসেন্ড আকারে নেব।’

ভিন্নমত থাকা বিষয়গুলো বিএনপি যেভাবে চায়, সেভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরেছিল। কমিটির সভাপতি জানান, জুলাই সনদের বাইরে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা সংবিধান সংশোধনের অঙ্গীকারও তারা পর্যালোচনা করবেন। তিনি বলেন, ‘এর বাইরেও আমাদের অনেক বক্তব্য আছে। নির্বাচনী ইশতেহারে আছে। সেগুলো আমরা ধারণ করব। যেগুলো জুলাই জাতীয় সনদে প্রতিফলিত হয়নি।’

কমিটির কাজকে ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন না জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কমিটির সামনে চ্যালেঞ্জ নেই। আমাদের প্রত্যাশা আছে। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। এটিকে আমি চ্যালেঞ্জ বলতে চাই না।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শহীদদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। এত বড় একটা ছাত্র গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হলো। জাতির প্রত্যাশা অনেক। শহীদের আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেই প্রত্যাশা এবং আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।’

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সংবিধানে রাখতে হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যদি আমরা ধারণ করতে চাই, সংবিধানেই প্রথম আমাদের সবকিছু কন্টেইন করতে হবে, ধারণ করতে হবে।’

২০২৫ সালের নভেম্বরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। সেটির আলোকে সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, আরেকটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও, বিএনপির সংসদ সদস্যরা নেননি। ফলে ওই সংস্কার পরিষদও গঠিত হয়নি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত