দেশজুড়ে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১০: ০৫
এসএসসি পরীক্ষা শুরু। স্ট্রিম ছবি

চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষা শুরু হলো আজ মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল)। সকাল ১০টা থেকে সারা দেশে একযোগে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, একটি মাদ্রাসা ও একটি কারিগরি বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২১ হাজার ১১৮ জন।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। এবারের পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসমুক্ত, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে শিক্ষা বোর্ডগুলো সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রথমবারের মতো প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ ‘একগুচ্ছ’ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষার প্রথম দিন আজ ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বাংলা (আবশ্যিক) প্রথম পত্র এবং সহজ বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। আর মাদ্রাসার কুরআন মাজিদ ও তাজবিদ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

যানজট ও জনদুর্ভোগ লাঘবের জন্য এবার পরীক্ষার্থীদের সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ–সংক্রান্ত আগের নিয়মই বহাল থাকছে। অর্থাৎ, পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে অবশ্যই পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা কক্ষে নিজ আসন গ্রহণ করতে হবে।

প্রযুক্তিগত তদারকি ও নিরাপত্তা

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার জানান, এবারই প্রথম কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র পরিবহনকারীদের ডিজিটাল ট্র্যাকিং করা হবে।

তিনি আরও বলেন, গরমে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে প্রতিটি কেন্দ্রের প্রবেশপথ সকাল সাড়ে ৮টায় খুলে দেওয়া হবে, যাতে কেন্দ্রের অভ্যন্তরে পরীক্ষার্থীরা অবস্থান নিতে পারে। এ ছাড়া কেন্দ্রে সুপেয় পানি, আইপিএস ও জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যানজট এড়াতে পরীক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার পরামর্শ দেন।

প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ২০ মে পর্যন্ত এসএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলবে। প্রতিদিন সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হবে। এরপর ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ব্যবহারিক পরীক্ষা। আগামী ১৮ জুনের মধ্যে হাতে লেখা নম্বরপত্র, ব্যবহারিক উত্তরপত্র, আনুষঙ্গিক কাগজপত্র ও স্বাক্ষরলিপি বিভাগ অনুযায়ী রোল নম্বরের ক্রমানুসারে সাজিয়ে হাতে হাতে মাধ্যমিক পরীক্ষা শাখায় জমা দিতে হবে। এ ছাড়া, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের ৭ দিনের মধ্যে পুনঃনিরীক্ষণের জন্য অনলাইনে আবেদন করা যাবে বলে বোর্ড জানিয়েছে।

বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যান

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১৪ লাখ ১২ হাজার ৪৭৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৭ লাখ ৫১ হাজার ৯৩ জন।

বোর্ডভিত্তিক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩৩৫ জন রয়েছে। অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে রাজশাহীতে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৭০৯ জন; কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩০৬ জন; যশোর বোর্ডে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৮৯ জন; চট্টগ্রামে ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৭৯ জন; বরিশালে ৮১ হাজার ৮৩১ জন; সিলেটে ৮৯ হাজার ১৯০ জন; দিনাজপুরে ১ লাখ ৮০ হাজার ৭০১ জন এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৯ হাজার ২৩৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন। তাদের মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ৬১ হাজার ৪৯১ জন এবং ছাত্রী ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৯৫ জন। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ১ হাজার ৫০৯ জন এবং ছাত্রী ৩৩ হাজার ১৫১ জন।

সারা দেশে মোট ৩ হাজার ৯০২টি কেন্দ্রে ৩০ হাজার ৪২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান মতে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫১ হাজার ৪২৩ জনে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছরের ৩০ হাজার ৪৫টি থেকে বেড়ে এ বছর ৩০ হাজার ৪২৫টিতে উন্নীত হয়েছে।

বিভাগ ও গ্রুপভিত্তিক পরিসংখ্যান

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে মোট ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৬৩ জন; মানবিক বিভাগে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৪৫১ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২ লাখ ২১ হাজার ১৮৪ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। আর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে সাধারণ বিভাগে ২ লাখ ৬২ হাজার ৩২০ জন; বিজ্ঞান বিভাগে ৪১ হাজার ৫২১ জন এবং মুজাব্বিদ বিভাগে ৪৩৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ১ হাজার ৫০৯ জন এবং ছাত্রী ৩৩ হাজার ১৫১ জন পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এসএসসি (ভোকেশনাল)-এ ১ লাখ ৩২ হাজার ১৯৮ জন এবং দাখিল (ভোকেশনাল)-এ ২ হাজার ৪৬২ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে।

নিবন্ধিত সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় নেই

এবারের পরীক্ষার পরিসংখ্যানে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।

গেলবারের তুলনায় এবার এসএসসি ও সমমানে ৭৯ হাজার ২৩৫ জন পরীক্ষার্থী কমেছে। এবার মোট পরীক্ষার্থী ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি।

শিক্ষা বোর্ডের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৯টি সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন দুই বছর আগে (২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ) নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিল ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন। কিন্তু এবার নিয়মিত হিসেবে পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন। অর্থাৎ, নিবন্ধিত প্রায় সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষা দিচ্ছে না। তারা হয় ঝরে গেছে, না হয় আগের ক্লাসে রয়ে গেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, ‘এবার কেন এত পরীক্ষার্থী কম হলো, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। তবে গত বছর অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই করে দেখা গিয়েছিল, তাদের বড় অংশেরই বাল্যবিবাহ হয়েছিল।’

সব মিলিয়ে এবার মোট ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এবার অনিয়মিত পরীক্ষার্থী রয়েছে ৪ লাখের বেশি।

পরীক্ষায় থাকছে না ‘নীরব বহিষ্কার’

পাবলিক পরীক্ষায় সাইলেন্ট এক্সপেলের (নীরব বহিষ্কার) পুরোনো নিয়ম এবছর বাদ দেওয়া হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালায় অনুচ্ছেদ নম্বর ২৯ ধারায় সাইলেন্ট এক্সপেলের কথা বলা হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা পরিচালনা–সংক্রান্ত নীতিমালা ২০২৬–এর ২৯ অনুচ্ছেদটি বাতিল করা হলো। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ থেকে এই ধারা বাতিল বলে গণ্য হবে।

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, বর্তমান সরকার একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা সম্পন্ন করতে চায়। কড়াকড়ি পদক্ষেপগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং শিক্ষক ও কেন্দ্রসচিবদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য। আসন্ন কোনও পাবলিক পরীক্ষায় ‘নীরব বহিষ্কার’-এর সুযোগ থাকছে না। ১৯৬১ সালের নীতিমালার ২৯ নং অনুচ্ছেদ ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।

অনুচ্ছেদ নম্বর ২৯ এ বলা ছিল, কোনো পরীক্ষার্থীকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ্যে বহিষ্কার করলে যদি আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে অথবা কক্ষ প্রত্যবেক্ষকসহ পরীক্ষাসংক্রান্ত দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তা–কর্মচারীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, কেবল সে ক্ষেত্রেই নীরব বহিষ্কার করা যাবে। তবে বিষয়–পত্রের পরীক্ষা শেষে প্রত্যবেক্ষকের সুস্পষ্ট বিবরণসহ গোপনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত করে উত্তরপত্র আলাদা প্যাকেটে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে পাঠাতে হবে। (উত্তরপত্রের ওএমআরের প্রথম অংশ আলাদা করা যাবে না)।

পরীক্ষা বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের ১৪ নির্দেশনা

পরীক্ষা বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ১৪টি নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

প্রথমে বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) ও পরে রচনামূলক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। উভয় পরীক্ষার মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না। পরীক্ষার্থীকে রচনামূলক, বহুনির্বাচনী ও ব্যবহারিক অংশে পৃথকভাবে পাস করতে হবে।

উত্তরপত্রের ওএমআর ফরমে রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও বিষয় কোড সঠিকভাবে বৃত্ত ভরাট করতে হবে। উত্তরপত্র কোনো অবস্থাতেই ভাঁজ করা যাবে না। পরীক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত সাধারণ ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারবে। কেন্দ্রসচিব ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা পরীক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রে মুঠোফোন আনতে বা ব্যবহার করতে পারবে না।

সম্পর্কিত