জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র মেরামতে এখনো নেই কোনো উদ্যোগ

প্রায় প্রতিটি ভাস্কর্যেই আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। কোথাও মাথা নেই, কোথাও হাত ভাঙা, আবার কোথাও সম্পূর্ণ কাঠামো মাটিতে লুটিয়ে আছে। এমন ছোট বড় ৬ শ ভাস্কর্য এখনো কম-বেশি ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে।

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মেহেরপুর

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ২৩: ১৮
ভাঙচুরয়ের শিকার মুজিবনগর সরকারকে গার্ড অব অনার দেওয়া স্মৃতিতে বানানো ভাস্কর্য। স্ট্রিম ছবি

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন বিকেলে মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র ভাঙচুর করে ক্ষুব্ধ জনতা। আজও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র বয়ে বেড়াচ্ছে ভাঙচুরের ক্ষতচিহ্ন, নেওয়া হয়নি মেরামতের কোনো উদ্যোগ।

১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল উদ্বোধন হয় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ। এরপর ১৯৯৬ সালে সেখানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই স্মৃতিকেন্দ্রে মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর উপস্থাপন করা হয় এবং নানা ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যগুলো ভগ্নদশায় পড়ে আছে। স্মৃতিকেন্দ্রের প্রবেশমুখ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাস্কর্যের ভাঙা অংশ আর ধ্বংসস্তূপ।

প্রায় প্রতিটি ভাস্কর্যেই আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। কোথাও মাথা নেই, কোথাও হাত ভাঙা, আবার কোথাও সম্পূর্ণ কাঠামো মাটিতে লুটিয়ে আছে। এমন ছোট বড় ৬ শ ভাস্কর্য এখনো কম-বেশি ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। তবে ঘরের ভেতরে থাকা ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের আবক্ষ পিতলের ভাস্কর্যগুলোতে কোনো আঁচড় পড়েনি।

১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে মেহেরপুরের ১২ আনসার সদস্য দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দিয়েছিলেন। সেখানে সৈয়দ নজরুলের ভাস্কর্যের ওপরের অংশ ভাঙা এবং আনসার সদস্যদের হাতে থাকা রাইফেলগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মুজিবনগর সরকারকে গার্ড অব অনার দেওয়া এক বীর মুক্তিযোদ্ধা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, ‘জায়গাটা শুধু স্মৃতিসৌধ না, এটা আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। এটাকে এভাবে ধ্বংস করা হলো, আর এতদিনেও ঠিক করার কোনো উদ্যোগ নেই। এটা খুবই কষ্টের।’

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাহবুবুল হক মন্টু ভাস্কর্য ভাঙচুর প্রসঙ্গে এক মন্তব্যে বলেন, ‘মুজিবনগরকে রক্ষা করা মানে আমাদের জাতীয় পরিচয়কে রক্ষা করা।’

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক শামসুল আলম সোনা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে জায়গা থেকে আমাদের স্বাধীনতার সূচনা, সেটাকে এভাবে ধ্বংস হতে দেখা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকার প্রশ্নে মেহেরপুর গণপূর্তের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘স্মৃতিকেন্দ্রটির সংস্কার, সংযোজন বা বিয়োজন সম্পূর্ণভাবে সরকারের ব্যাপার। সরকার যেভাবে চাইবে, সেভাবেই আমরা কাজ করব।’

এ প্রসঙ্গে গবেষক ও মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ আবদুল্লাহ আল আমিন মুজিবনগরকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি উল্লেখ করে দ্রুত এর সংস্কার ও সংরক্ষণ দাবি করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউয়ে যদি ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তা জাতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাসের বাহক ভাস্কর্যগুলো ভাঙচুরের শিকার হয়ে পড়ে আছে—যা শুধু অবহেলার নয়, বরং আমাদের সম্মিলিত স্মৃতির ওপর আঘাত।’

জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ তাজউদ্দীন খান ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়ে বলেন, ‘মুজিবনগর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে এমন ভাঙচুর নিঃসন্দেহে জাতির জন্য লজ্জার। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহ দেখছি। খুব শিগগিরই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পুনর্নির্মান ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই স্থানকে আমরা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চাই।’

সম্পর্কিত