খায়েরুজ্জামান মজুমদার: তিন সরকারের এক অর্থসচিব

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ২৩: ৪৮
অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্রের বাজেট ঘোষণা হলে আলোটা সাধারণত গিয়ে পড়ে অর্থমন্ত্রীর ওপর। সংসদে বাজেট বক্তৃতা, রাজস্ব-ব্যয়ের বড় অঙ্ক, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে সেই দিনটি হয়ে ওঠে অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে থাকে এক দীর্ঘ, জটিল এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রশাসনিক শ্রম। সেই অদৃশ্য প্রক্রিয়ার ভেতরেই বারবার উঠে এসেছে একটি নাম—ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সময়েও জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপনার প্রস্তুতিপর্বে তিনি অর্থ সচিব। ফলে একাধিক রাজনৈতিক পর্ব পেরিয়েও বাজেট প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক ধারাবাহিকতায় তাঁর উপস্থিতি তৈরি করেছে এক নীরব কিন্তু দৃঢ় ছাপ। ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট অর্থসচিবের দায়িত্ব পান খায়েরুজ্জামান মজুমদার। আওয়ামী লীগ আমলে তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

অর্থ বিভাগের তৎকালীন সিনিয়র সচিব ফাতিমা ইয়াসমীন ওই মাসের শেষ দিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। তাঁর স্থলেই অর্থ বিভাগের নতুন সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয় খায়েরুজ্জামান মজুমদারকে।

অর্থ বিভাগের ভেতরে অনেকে বলেন, সরকার বদলায়, নীতি বদলায়, কিন্তু বাজেটের কারিগরি ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে যাঁদের হাতে—তাঁদের একজন ছিলেন তিনি।

বাজেট: বক্তৃতার বাইরে এক দীর্ঘ প্রস্তুতির গল্প

প্রতিবছরের জুন মাসে বাজেট ঘোষণার দিনটি যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ একটি প্রস্তুতি থাকে এর পেছনে। সেই প্রস্তুতি শুরু হয় বছরের শুরু থেকেই। অর্থ সচিব হিসেবে বাজেট প্রক্রিয়ার শুরুটা তাঁর তত্ত্বাবধানে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তিনি প্রথমেই সব মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট সার্কুলার জারি করেন, যেখানে নির্ধারণ করা হয় ব্যয়ের সীমা, অগ্রাধিকার খাত এবং রাজস্ব কাঠামোর নির্দেশনা।

এরপর একে একে মন্ত্রণালয়গুলো তাদের চাহিদা পাঠায়। সেসব চাহিদা বিশ্লেষণ, সামঞ্জস্য আনা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ঘাটতি হিসাব করা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় রাষ্ট্রের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চিত্র।

একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, বাজেট শুধু হিসাব নয়, এটা একধরনের সমন্বয়ের শিল্প। সেই সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় কাজটা হয় অর্থ সচিবের টেবিলে।

তিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একই প্রশাসনিক মুখ

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। কিন্তু অর্থ বিভাগের মতো জায়গায় ধারাবাহিকতা তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। খায়েরুজ্জামান মজুমদার এমন এক সময় অর্থ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু বাজেট প্রণয়নের কারিগরি প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা ছিল অবিচল।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, এই ধারাবাহিকতা বাজেট ব্যবস্থার ভেতরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে, বিশেষ করে তথ্য-উপাত্ত, হিসাব কাঠামো এবং মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে। রাজনীতি বদলায়, কিন্তু বাজেটের যন্ত্রটা যাতে থেমে না যায়—সেটা নিশ্চিত করতেই এই ধরনের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা দরকার।

প্রশাসনের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথচলা

১৯৯৩ সালে ১১তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু। শুরুটা ছিল মাঠ প্রশাসনে, এরপর ধীরে ধীরে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দিকে যাত্রা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কাজ করার সময় থেকেই তিনি রাজস্ব নীতি ও অর্থনীতির কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।

এরপর একে একে তিনি দায়িত্ব পালন করেন—অর্থ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিভিন্ন উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পে। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করে তোলে।

খায়েরুজ্জামানের শিক্ষাজীবনে যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পিএইচডি এবং কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি—এই দুটি অর্জন তাঁর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তি তৈরি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে শীর্ষস্থান অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে তাঁর ফলাফল ছিল ধারাবাহিকভাবে উজ্জ্বল। শুধু ডিগ্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতি বিষয়ে দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।

প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কাজ করেছেন। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত বাণিজ্য সহজীকরণ প্রকল্পে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজীকরণ নীতির সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করে।

পাশাপাশি অর্থনৈতিক নীতি গবেষণাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার নীতিমূল্যায়ন কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা ও প্রশাসনের সংযোগ ঘটিয়ে তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টে অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ে পাঠদানও করেছেন।

বর্তমানে অর্থ বিভাগের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে থেকে তাঁর সামনে রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা, বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্পর্কিত