সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন মামলা করায় ভুক্তভোগীকে মারধর, বাড়ি ভাঙচুর

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নোয়াখালী

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ১৩
নোয়াখালীর মানচিত্র

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন হেনস্তার অভিযোগে থানায় মামলার পর ভুক্তভোগীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। এ সময় ভুক্তভোগীকে মারধর ও তার পরিবারে সদস্যদের লাঞ্ছিত করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নের মধ্য চরবাগ্যা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয়ভাবে ‘তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে অংশগ্রহণকারীরা লাঠিসোটা নিয়ে ভুক্তভোগীর বাড়িঘর হামলা করে। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভুক্তভোগী কিশোরী (১৪) উপজেলার দারুল আকরাম ইসলামিয়া মাদ্রাসায় হেফজ শ্রেণিতে পড়ত। অভিযুক্ত আবুল খায়ের ওই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক। গত ‍বৃহস্পতিবার চরজব্বর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন ভুক্তভোগীর বাবা। এর পর থেকে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছেন ওই শিক্ষক।

এদিকে মামলা করার আগে থেকেই স্থানীয়দের চাপ ও পরে বাড়িতে হামলার ঘটনায় পরিবার নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা।

শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, ‘আমার মেয়েকে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের ঝাড়ফুঁকের কথা বলে যৌন হেনস্তা করেন। আমরা এর বিচার চাওয়াতে উল্টো আমাদের বাড়িঘরে হামলা ও আমার মেয়েকে মারধর করে এলাকাবাসী। বর্তমানে আমরা আতঙ্কে সময় পার করছি।’

সুবর্ণচরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাড়িতে ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে হামলা। ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
সুবর্ণচরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাড়িতে ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে হামলা। ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

থানায় অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ভুক্তভোগী ছাত্রীকে দেখতে দারুল আকরাম ইসলামিয়া মাদ্রাসায় যান তার দাদী। সেখানে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের তাঁকে জানান, কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর নাতনিকে ঝাড় ফুঁক দিতে হবে। এ জন্য তাঁকে সরিষার তেল আনতে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে ওই ছাত্রীকে নিজের শোয়ার কক্ষে নিয়ে যান ওই শিক্ষক। সেখানে ওই ছাত্রীকে যৌন হেনস্তা করেন তিনি। এ সময় ভুক্তভোগী কান্নার শব্দ শুনে তার দাদী কক্ষে প্রবেশ করলে ছাত্রীকে কক্ষ থেকে বের করে দেন শিক্ষক।

এদিকে ওই ঘটনা জানাজানি হলে শিক্ষক আবুল খায়ের পক্ষে বিষয়টি সমঝোতার জন্য ভুক্তভোগীর পরিবারকে চাপ দেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত গত ‍বৃহস্পতিবার চরজব্বর থানায় একটি মামলা করেন ভুক্তভোগীর বাবা।

এদিকে মামলায় দায়েরের পর অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে তৌহিদী জনতার ব্যানারে ‘ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের দাবিতে’ মানববন্ধন করেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন। পরে লাঠিসোটা নিয়ে ভুক্তভোগীর বাড়িতে হামলা চালানো হয়।

আজ স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপকালে ভুক্তভোগীর বাবা জানান, ঘটনার পর প্রধান শিক্ষক ছাত্রীর দাদীকে ডেকে নিয়ে বিষয়টি জানাজানি করলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেন। তাঁর মেয়ের সঙ্গেও তিনি একই কথা বলেন।

এই হুমকির পর তাঁরা স্থানীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করলে কেউ কেউ পুলিশে না গিয়ে ঘরোয়াভাবে মীমাংসার প্রস্তাব দেন। তবে অন্যরা তাকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে শেষ পর্যন্ত মামলা করেন ছাত্রীর বাবা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চরজব্বর থানার উপ-পরিদর্শক বাপন চক্রবর্তী বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজখবর নিচ্ছি। আমি বর্তমানে ছুটিতে থাকায় এ বিষয়ের আপডেট জানি না।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ লুৎফুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তাঁর মন্তব্য জানা যায়নি।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত