নীরব মিয়ানমার সীমান্ত, আতঙ্ক কাটেনি টেকনাফবাসীর

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কক্সবাজার‌

কয়েকদিনের বিস্ফোরণের পর রাখাইন সীমান্তে কিছুটা শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফাইল ছবি

টানা কয়েক দিনের সংঘাত, বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের পর মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্তে আপাতত কিছুটা শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত শনিবার (৪ জুলাই) ও আজ রোববার (৫ জুলাই) পর্যন্ত টেকনাফ সীমান্তে নতুন করে কোনো গোলাগুলি বা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়নি। তবে কয়েক দিনের টানা উত্তেজনার রেশ এখনো কাটেনি। সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সীমান্তসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমান্তের কাছে না যেতে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘাতের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রভাব যাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা জলসীমায় না পড়ে, সে লক্ষ্যে কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নাফ নদী ও সীমান্তসংলগ্ন জলসীমায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

দীর্ঘ সময় তুলনামূলক শান্ত থাকার পর চলতি জুলাইয়ের শুরুতেই রাখাইন রাজ্যে আবারও সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। গত ১ ও ২ জুলাই জান্তা বাহিনী বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালায়। এসব হামলার বিকট শব্দ টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, সাবরাং ও আশপাশের এলাকায় স্পষ্টভাবে শোনা যায়। অনেক স্থানে বিস্ফোরণের কম্পনে বাড়িঘরও কেঁপে ওঠে।

হ্নীলার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন কাজল বলেন, ‘বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সীমান্তের ওপার থেকে কয়েক দফা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলেও শুক্রবার সকাল থেকে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে ভয় এখনো কাটেনি।’

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ জাকের বলেন, ‘আরাকান আর্মিকে লক্ষ্য করে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলার প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাতেও পড়ছে। কয়েক দিনের টানা বিস্ফোরণের কারণে সীমান্তবাসী আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন।’

মিয়ানমারের মংডু শহরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও নতুন করে বিমান হামলা শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য, অধিকাংশ রোহিঙ্গাই জন্মভূমি ছাড়তে চান না। তবে বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিলে খাদ্য ও নিরাপত্তার অভাবে কেউ কেউ বাংলাদেশে আশ্রয়ের চেষ্টা করতে পারেন।

মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদ প্লাটফর্ম 'গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্কের' প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ জুলাই বুথিডং টাউনশিপের ওয়ার নেট ইয়োন গ্রামের আশপাশে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তিনটি যুদ্ধবিমান দিয়ে বিমান হামলা চালানো হয়। এর আগে ১ জুলাই বুথিডংয়ের সাবেক সামরিক অপারেশনস কমান্ড-১৫ এলাকায় এবং ২ জুলাই মংডু টাউনশিপের কেইন চাউং গ্রামে একটি যুদ্ধবন্দি শিবিরেও বিমান হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় একজন সামরিক যুদ্ধবন্দি ক্যাপ্টেনসহ চারজন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল ফয়েজ বলেন, ‘গত কয়েক দিনের বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্তসংলগ্ন এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের উদ্বেগ ছিল বেশি।’

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমান্তের কাছাকাছি না যাওয়া এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণের জন্য জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মাইকিং ও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মো. অনীক চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে সীমান্ত এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং সীমান্ত এলাকায় অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

কক্সবাজারের রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, সীমান্ত ও নাফ নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। নতুন করে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ, বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রবেশ ঠেকাতে সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। পাশাপাশি নদীপথ ও সীমান্তবর্তী এলাকাজুড়ে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

যদিও গত দুই দিন সীমান্তে কোনো বিস্ফোরণ বা গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়নি, তবুও সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি নিয়ে টেকনাফের মানুষের উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত