সিংড়ায় রিকশা-ভ্যানে ‘চাঁদাবাজি’

শ্রমিক কল্যাণের নামে ‘সিন্ডিকেট’ বাণিজ্য, জিম্মি চালক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নাটোর

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১১: ১৫
স্ট্রিম কোলাজ

নাটোরের সিংড়ায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও মিশুক চালকদের কাছ থেকে আবার সদস্য ফি, কার্ড নবায়ন ও জরিমানার নামে অর্থ আদায় শুরু হয়েছে।

‘সিংড়া উপজেলা রিকশা/ভ্যান চালক শ্রমিক ইউনিয়ন’-এর নামে চলা কার্যক্রমকে শ্রমিকেরা ‘সিন্ডিকেট বাণিজ্য’ আখ্যা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, টাকা না দিলে গাড়ি চালাতে বাধা, চাবি কেড়ে নেওয়া, এমনকি ইউনিয়ন কার্যালয়ে নিয়ে হেনস্তা করা হয়।

শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যে, সিংড়ায় রিকশা, ভ্যান ও মিশুকের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। যদিও প্রকৃত সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি। সেই হিসাবে সদস্য ফি, কার্ড নবায়ন, জরিমানা এবং বিভিন্ন অনুদানের অর্থ মিলিয়ে বছরে প্রায় কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে কিছুদিন অর্থ আদায় বন্ধ ছিল। আগের মতোই ‘শ্রমিক কল্যাণের’ নামে আদায় করা অর্থের বড় অংশ প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে, যা সংগঠনের একাংশের নেতারাও জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্যে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সময় শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সাধারণ রিকশাচালক ছিলেন। বর্তমানে পৌর এলাকায় তার দুটি পাঁচতলা ভবন। শ্রমিকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থে এই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি।

সিংড়া উপজেলা নির্বাহীকে দেওয়া ইউনিয়নের বর্তমান আহ্বায়কের অভিযোগপত্র
সিংড়া উপজেলা নির্বাহীকে দেওয়া ইউনিয়নের বর্তমান আহ্বায়কের অভিযোগপত্র

সম্প্রতি আগের কমিটির বিরুদ্ধে ‘হিসাব বুঝিয়ে না দেওয়ার’ অভিযোগ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দেন বর্তমান আহ্বায়ক শাহাদৎ হোসেন সাধু। সেই চিঠির একটি কপি স্ট্রিমের হাতে এসেছে। এতে আগের সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ টাকার হিসাব না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

শাহাদৎ হোসেনের অভিযোগ, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন চাঁদাবাবদ রিকশা-ভ্যান থেকে আদায় করা হতো ১৩ হাজার টাকা করে। সবমিলিয়ে গত ১০ বছরে এই চাঁদার পরিমাণ আনুমানিক ৪ কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া সদস্য ফি বাবদ আদায়কৃত অর্থ ও সমিতি জমি বিক্রয়ের অর্থের তথ্যও আলাদাভাবে তুলে ধরে হিসাব দাবি করেছেন শাহাদৎ।

আগে প্রতিদিন উপজেলায় রিকশা-ভ্যান চালকদের ২০ টাকা করে চাঁদা দিতে হতো, তা নিশ্চিত করেছেন উপজেলার একাধিক চালক। এমনকি আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সিংড়া উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম নিজেও টাকা নেওয়া অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, আমি দায়িত্বে থাকাকালে ৫০০, ৬০০ ও ৭০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে, এটা ঠিক। তবে হিসাব করলে দেখা যাবে—ইউনিয়ন আমার কাছে টাকা পাবে, নাকি আমিই ইউনিয়নের কাছে পাওনাদার।

সদস্য ভর্তি ফি-র রশিদ
সদস্য ভর্তি ফি-র রশিদ

ইউনিয়নের টাকায় নিজের পাঁচতলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমি একসময় রিকশা চালাতাম। সেখান থেকেই শ্রমিক নেতা হিসেবে উঠে এসেছি। ভবন নির্মাণে সাবেক মেয়রসহ অনেক শ্রমিক খুশি হয়ে সহযোগিতা করেছেন। কেউ কেউ সিমেন্ট কিনে দিয়েছেন, কেউ ইট।’

অভিযোগ আছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর এই চাঁদাবাজি বন্ধ হলেও গত প্রায় ছয় মাস ধরে চালুর প্রচেষ্টা হয়েছে। প্রতিদিন না নিলেও সপ্তাহে দুদিন, বৃহস্পতিবার ও সোমবার ২০ টাকা চাঁদা নেওয়া শুরু করেছিল সমিতির লোকজন। তবে গত কয়েকদিন ধরে প্রতিবেদনের জন্য বিভিন্ন রিকশা-ভ্যান চালকের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের আলাপের পর থেকে তা বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভ্যান থামিয়ে চেক করা হয় সদস্য কার্ড
ভ্যান থামিয়ে চেক করা হয় সদস্য কার্ড

চাঁদাবাজি ‘আপাতত’ বন্ধ থাকলেও থেমে নেই সদস্য ফি ও নবায়নের নামে অর্থ আদায়। গত সোমবার ও মঙ্গলবার সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কের একাধিক পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, রিকশা, ভ্যান ও মিশুক থামিয়ে চালকদের সদস্য কার্ড যাচাই করা হচ্ছে। কার্ড না থাকলে শুরু হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদ ও চাপ প্রয়োগ। অনেক চালককে সেখানেই সদস্য হওয়ার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চালকদের দাবি, নতুন করে শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য হতে ৬০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হচ্ছে। আর আগে যারা সদস্য ছিলেন, তাদের কার্ড নবায়নের জন্য নেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা। টাকা না দিলে গাড়ির চাবি কেড়ে নেওয়া, গাড়ি আটকে রাখা এবং ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হচ্ছে।

রিকশাচালক মো. রাসেল বলেন, ‘দিনে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসারই ঠিকমতো চলে না। তার ওপর আবার ৬০০ টাকা চাঁদা দিতে হবে। টাকা না দিলে রাস্তায় গাড়ি চালাতে দেয় না। কয়েকবার চাবিও নিয়ে গেছে।’

আরেক রিকশা চালক মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। সারাদিন রোদে পুড়ে গাড়ি চালাই। কিন্তু ইউনিয়নের নামে জোর করে টাকা নেয়। কোনো বিপদে পড়লে পরে আর কাউকে পাশে পাওয়া যায় না।’

অর্থ আদায়ের পর লিখে রাখা হয় খাতায়
অর্থ আদায়ের পর লিখে রাখা হয় খাতায়

একাধিক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই টাকা তুলতেন, এখন বিএনপি লোকজন একইভাবে আদায় করছে। ভয়ে তারা মুখ খুলতে সাহস পান না।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ‘সিংড়া ভ্যান, রিকশা ও মিশুক চালক শ্রমিক ইউনিয়ন’-এর আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি শাহাদৎ হোসেন সাধু ও সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ মণ্ডল। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের সময় চাঁদা নেওয়া হতো। এখন শুধু সদস্য ফি নেওয়া হচ্ছে। আর আওয়ামী লীগের সময় যারা চাঁদা দিয়েছে, এদের মধ্যে যাদের সদস্য কার্ড ছিল, তাদের কাছ থেকে শুধু নবায়ন ফি নেওয়া হচ্ছে।

শাহাদৎ হোসেন সাধু দাবি করেন, ‘কার্ড ছাড়া গাড়ি চালানো যাবে না। সদস্য না হলে তা গঠনতন্ত্রবহির্ভূত হবে। শ্রমিকদের কল্যাণের জন্যই এই অর্থ নেওয়া হয়।’ গত ছয় মাসে কতজন শ্রমিককে এই ফান্ড থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, ‘এ ধরনের টাকা আদায়ের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনু স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি চলতে দেওয়া হবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে বলা হবে।’

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত