সংস্কারবিরোধী তকমা প্রতিরোধে ‘ন্যারেটিভ’ যুদ্ধে বিএনপি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১১: ৪২
মাসজুড়ে ধারাবাহিকভাবে নেতাকর্মীরা তৃণমূলে গিয়ে বিএনপি ও সরকারের অবস্থান তুলে ধরবেন। স্ট্রিম গ্রাফিক

‘জুলাই সনদের পরিপন্থী’ ও ‘সংস্কারবিরোধী’– বিরোধীদের এমন রাজনৈতিক অপপ্রচার মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। মাসজুড়ে ধারাবাহিকভাবে নেতাকর্মীরা তৃণমূলে গিয়ে দল ও সরকারের অবস্থান তুলে ধরবেন।

বিএনপির নেতারা বলছেন, বিরোধী দল কৌশলে মানুষকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। সারা দেশেই বিএনপি ও সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি হচ্ছে। এটি পরিবর্তনে সরাসরি জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি করা হবে। মাঠের এই পদক্ষেপকে ‘ন্যারেটিভ যুদ্ধ’ বলছেন তাঁরা।

এ ব্যাপারে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে একটি অপপ্রচার চালানো হচ্ছে– বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের জনগণের কাছে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেভাবে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, মাসজুড়ে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মিছিল, পথসভা, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ, মতবিনিময় সভার মতো জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। ইতোমধ্যে জেলা ও মহানগর বিএনপি, এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনকে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর সই করা চিঠি পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ইস্যুতে বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে যে ‘সংস্কারবিরোধী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে, তার জবাব দিতে লিফলেট তৃণমূলে পাঠানো হচ্ছে।

দল সূত্র জানায়, লিফলেট উল্লেখ রয়েছে– গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে ‘খ’ নম্বর জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং ‘প্রতারণামূলক’। একইসঙ্গে লিফলেটে বিএনপি জুলাই সনদ অনুযায়ী ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে এবং সনদটি ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ– এমন তথ্যও বলা হয়েছে।

স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য ধারাবাহিকভাবে বিএনপিকে ‘জুলাই সনদবিরোধী’ হিসেবে জনগণের সামনে তুলে করার চেষ্টা করছে। তারা হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। তাই বিএনপি জনগণের কাছে সরাসরি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন থেকে মাঠে নামছে। যেসব এলাকায় বিরোধী দলগুলোর প্রচার বেশি, সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলাদা কর্মপরিকল্পনা পালন করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, অপপ্রচারে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বিরোধীরা যেভাবে একতরফা প্রচার চালাচ্ছে, তার জবাব মাঠে থেকেই দিতে হবে। নেতাকর্মীরা সরাসরি জনগণের কাছে বাস্তব তথ্য তুলে ধরবেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় জুলাই সনদ ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান নিয়ে লিফলেট বিতরণ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে পালন করা হবে।

১১-দলীয় ঐক্য ইতোমধ্যে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে রাজপথে নামার হুমকি দিয়েছে। রাজনৈতিক এই চাপ মোকাবিলায় বিএনপি সাংগঠনিক ইউনিট সক্রিয় করার পথ বেছে নিয়েছে। গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে জনগণের কাছে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরা, সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া এবং ‘ভুল তথ্যের জবাব’ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

নেতারা বলছেন, মাসজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে শুধু সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে মাঠের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংগঠনিক শক্তি দেখাতে হবে। কারণ সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন। মাঠ ছেড়ে দিলে পরে ভোটে বিপাকে পড়তে হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন এবং হাম পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এটি মোকাবিলায় বিএনপি ‘ন্যারেটিভ যুদ্ধে’ নামার কৌশল নিয়েছে।

মাসব্যাপী কর্মসূচির বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের নিজস্ব কর্মসূচি রয়েছে। সরকারে থাকায় জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পালন করতে হবে। এজন্য আমরা জনগণের কাছে যাব।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দাবি আদায়ে মিছিল-সমাবেশ কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মসূচি বিরোধী দল পালন করলে, এটা তাদের রাজনৈতিক অধিকার। এসব কর্মসূচি মোকাবিলা করার কোনো বিষয় নেই। তবে তাদের কোনো কর্মসূচিতে ধ্বংসাত্মক কিংবা জনজীবনের জন্য হুমকির প্রশ্ন সামনে আসে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

জুলাই সনদের চেতনা বিএনপি ধারণ করে না– এমন প্রচারের বিষয়ে রিজভী বলেন, আমরা জুলাই সনদের চেতনা ধারণ করি কিনা, তা প্রধানমন্ত্রীসহ নেতারা বারবার তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। আমরা সব সনদই ধারণ করি। আমরা ’৭১–এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করি, ’৯০–এর গণআন্দোলনের চেতনা ধারণ করি এবং ’২৪–এর গণঅভ্যুত্থানের চেতনাও ধারণ করি। কিন্তু যারা এসব প্রশ্ন তুলছেন, তারা ’৭১– এর চেতনা ধারণ করে কিনা, জনমনে সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত