হবিগঞ্জে হাওরে থই থই পানি, ডুবল সোনালি ফসল

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
হবিগঞ্জ

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৪৮
অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট ভেঙে দ্রুত পানি প্রবেশ করেছে হাওরে। স্ট্রিম ছবি

টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বেড়েছে। এতে তলিয়ে গেছে নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ বোরো ধানের জমি। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট ভেঙে দ্রুত পানি প্রবেশ করেছে হাওরে। আকস্মিক এই বন্যায় বছরের একমাত্র বোরো ফসল হারিয়ে চরম সংকটের মুখে পড়েছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক।

বুধবার (২৯ এপ্রিল) বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুরের দত্তগাঁও অংশে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ও উপচে পানি হাওরে প্রবেশ করতে শুরু করে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে শত শত একর ফসলি জমি প্লাবিত হয়। তবে আজ বৃহস্পতিবার সকালে আকাশে রোদ দেখা দিয়েছে। এতে কৃষকের চিন্তা কিছুটা কমেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ৯টি উপজেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩০ শতাংশ ধান এখনও কাটা হয়নি
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩০ শতাংশ ধান এখনও কাটা হয়নি

জেলা কৃষি সস্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক বলেন, ‘ভারী বর্ষণের ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরে এখনও প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটতে বাকি রয়েছে। কৃষকদের আগাম সতর্ক করা হয়েছিল’। আগামী ২৪ ঘণ্টা বৃষ্টি হলে অবশিষ্ট জমির ধানও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে’।

তবে কৃষকদের দাবি, জেলায় এখনো ৫০ শতাংশ জমির ধান কাটার বাকি রয়েছে। এরমধ্যে অনেক জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়েছেন তারা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, জেলার বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার বিভিন্ন হাওরে আকস্মিক বন্যায় ডুবে গেছে কৃষকের সোনালি ফসল। জমিতে বুক সমান পানি থাকায় ধান কাটতে গিয়ে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন কৃষকেরা। অনেক জমিতে বাতাসের তীব্রতায় ধান গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ায় ফসল সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত শ্রম ও সময় লাগছে। হঠাৎ করে পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক তাদের পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেননি।

শুকনো জায়গার অভাবে ধান শুকানো নিয়েও রয়েছে বিপত্তি
শুকনো জায়গার অভাবে ধান শুকানো নিয়েও রয়েছে বিপত্তি

অন্যদিকে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে হাওরের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বেড়ে যায়। রাস্তাঘাট-ভেঙে দ্রুতবেগে হাওরে প্রবেশ করে পানি। ছোট নৌকা ব্যবহার করে কোনরকম আংশিক জমির ধান কাটছেন ডুবে যাওয়া জমি থেকে ধান উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বানিয়াচংয়ের সুবিদপুরের কৃষক আলমগীর মিয়া বলেন, ‘১৬ বিঘা জমি চাষ করেছিলাম। মাত্র ৫ বিঘা জমির ধান ঘরে তুলতে পেরেছি। বাকি সবটুকু এখন পানির নিচে। নৌকা নিয়ে কিছু ধান কাটার চেষ্টা করছি’।

কাবিলপুর গ্রামের রফিক আলী বলেন, ‘এ বছর ১০ বিঘা জমির ধান চাষ করতে আমার প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ধান আধা পাকা অবস্থায় পানিতে তলিয়ে গেছে। লাভের আশায় ধান চাষ করে সবটুকুই জলে গেল’।

লাখাইর স্বজনগ্রামের কৃষক সুশিল দাস বলেন, ‘লাভের আশায় ধান চাষ করেছিলাম। স্বপ্ন ছিল বছরের খাওয়ার জন্য রেখে কিছু ধান বিক্রি করে দেনা পরিশোধ করব। কিন্তু আমার স্বপ্ন এখন পানিতে ডুবে গেল, খাওনতো দূরের কথা, কীভাবে দেনা পরিশোধ করব বুঝতে পারছি না’।

ভেঙে গেছে ব্রিজের অ্যাপ্রোচ। স্ট্রিম ছবি
ভেঙে গেছে ব্রিজের অ্যাপ্রোচ। স্ট্রিম ছবি

এছাড়া জেলার চুনারুঘাট ও লাখাইর কয়েকটি এলাকার রাস্তাও ভেঙে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। পুরাতন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চুনারুঘাট উপজেলার রামগঙ্গা ও চন্ডী এলাকায় রাস্তা ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। রামগঙ্গা ব্রিজের কাছে রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ায় যে কোনও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, লাখাইর বলভদ্র সেতুর এপ্রোচে (সড়কের সঙ্গে সংযোগ অংশ) ধস দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, টানা বৃষ্টির ফলে রাস্তা ভেঙে রামগঙ্গায় বড় আকারের গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা চারপাশে বালু ভর্তি বস্তা দিয়ে চিহ্নিত করে রেখেছি। যাতে যান চলাচলে দুর্ঘটনা না হয়’।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, দ্রুত গতিতে বাড়লেও এখনও নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচেই আছে। বানিয়াচংয়ে খোয়াই নদীর বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে পরিদর্শন করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে’।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত