এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে দলবদ্ধ ধর্ষণ: ১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সিলেট

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৯: ৪৮
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের দায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন। ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় প্রধান আসামি সাইফুর রহমানের মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই রায় ঘোষণা করেন।

সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন জানান, রায়ে মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে (২৮) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮) ও অর্জুন লস্করকে (২৬)। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তিনজনকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন রবিউল ইসলাম (২৫), মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও মিজবাউল ইসলাম রাজন (২৭)। দণ্ড ও খালাসপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী।

রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, ‘এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দেয়নি। ভিকটিমও আসামিদের শনাক্ত করেনি। অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব।’

এর আগে সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তারা সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, তারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত নন, রাজনৈতিক কারণে তাদের আসামি করা হয়েছে। তাদের দাবি, ভুক্তভোগীও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেননি।

মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে স্বামীর সঙ্গে সিলেটের এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক গৃহবধূ। তাকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে ছাত্রাবাসে নিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।

ঘটনাটি দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। প্রতিবাদে সরব হয় বিভিন্ন সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী ও অধিকার সংগঠন। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

মামলার নথি থেকে আরও জানা যায়, ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার আট আসামিকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। প্রধান আসামি সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম তারেক, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি এবং অর্জুন লস্কর ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেন।

এ ছাড়া রবিউল ও মাহফুজুর ধর্ষণে সহায়তার কথা স্বীকার করেন। সন্দেহভাজন দুই আসামিও জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে আসামিদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় আটজন আসামির মধ্যে ছয়জনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়।

ঘটনার মাত্র দুই মাস আট দিন পর ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর আটজনের বিরুদ্ধে ১৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য। পরে মামলাটি নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে গত বছরের মে মাসে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।

মামলায় ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে গৃহবধূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক ও ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক রয়েছেন।

এ ছাড়া ঘটনার রাতে ছাত্রাবাসে সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আলাদা মামলা হয়। পরে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনিকে ওই মামলায় আসামি করা হয়। আর ভুক্তভোগী নারীর স্বামীর কাছে চাঁদা দাবি ও গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করে।

২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি অপহরণ ও ধর্ষণ মামলায় অভিযোগ গঠন করে আসামিদের বিচার শুরুর আদেশ দেয় সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে দুটি মামলার বিচারকাজ একই আদালতে করার নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করে বাদীপক্ষ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত