নির্মাণ স্থগিতের পরও অনলাইনে রাম বিগ্রহ বিতর্ক

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

গত ১১ জুন মন্দির কমিটি রামচন্দ্রের বিগ্রহ নির্মাণকাজ স্থগিতের ঘোষণা দেয়। সংগৃহীত ছবি

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রাম বিগ্রহ নির্মাণকাজ স্থগিতের ঘোষণা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে উত্তেজনা থামছে না। সম্প্রীতি রক্ষায় মাঠের কাজ বন্ধ হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার করে অনলাইনে উসকানিমূলক পোস্ট ও পাল্টাপাল্টি বিতর্ক চলছে।

গত ১১ জুন বিকেলে মন্দির কমিটি নির্মাণকাজ স্থগিতের ঘোষণা দেয়। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে নির্মাণকাজের খবর প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়ভাবে আপত্তি ওঠে।

ইমাম-ওলামা পরিষদসহ কয়েকটি সংগঠন সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের মাধ্যমে নির্মাণ বন্ধ ও নির্মাণাধীন বিগ্রহ অপসারণের দাবি জানায়। অন্যদিকে রামচন্দ্রের ছবি ‘অবমাননা’র অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে এবং শাহবাগে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ করেন।

রাম বিগ্রহ নির্মাণকাজের উদ্যোক্তাদের একজন হিসেবে আলোচনায় আসেন হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস। তিনি মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত। অন্যদিকে, ২০২২ সালে হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে প্রতারণার অভিযোগে র‍্যাব-এনএসআইয়ের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

ফেসবুকে পাওয়া সাম্প্রতিক পোস্টগুলোতে দেখা যায়, নির্মাণ স্থগিতের পরও ইস্যুটি অনলাইনে সক্রিয়। সেখানে বিগ্রহ অপসারণ এবং বিদেশি সম্পৃক্ততার দাবি ছড়ানো হয়। পরে রামচন্দ্রের ছবি ‘অবমাননা’র অভিযোগে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিবাদ সম্পর্কিত পোস্টও অনলাইনে ছড়াতে দেখা যায়।

স্থগিতের পরও দাবি

বিগ্রহ নির্মাণ স্থগিত ঘোষণার পরও ফেসবুকে পাওয়া কয়েকটি পোস্টেও উসকানিমূলক দাবি থামেনি। নির্মাণকাজ স্থগিতকে যথেষ্ট না মেনে অপসারণ ও ভাঙার কথা বলা হয়।

গত ১২ জুন ‘জাজিরাতুল আরব’ নামের একটি ফেসবুক পোস্টে নির্মাণাধীন বিগ্রহের ছবি ব্যবহার করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে স্থগিত ঘোষণাকে কৌশল হিসেবে দেখানো হয় এবং বিগ্রহ ভাঙার আহ্বান জানানো হয়। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘হরিদাস তার রাজ্যে সাংবাদিক সম্মেলনের ডাক দিয়েছিল। উপস্থিত সাংবাদিকদের মাধ্যমে সে জানান দিল, বর্তমানে পরিস্থিতি গরম, তাই আপাতত রামের বিগ্রহ নির্মানকাজ বন্ধ থাকবে। এই বন্ধের ঘোষণাতে আমাদের ক্ষ্যান্ত হওয়া যাবে না...।’ পোস্টটিতে ৩ হাজার ৯০০ প্রতিক্রিয়া, ১ হাজার মন্তব্য এবং ৪৫০টি শেয়ার দেখা যায়।

গত ১৩ জুন ‘Md Rahad Akondo’ নামের একটি আইডি থেকে আরেকটি পোস্ট করা হয়। এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত একটি ছবি যুক্ত করে বিগ্রহ ভাঙতে দেখা যায়। ক্যাপশনে প্রকাশ্যে মূর্তি বানালে তা গুড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘মূর্তি বানানোর প্রয়োজন হলে চার দেয়ালের ভিতরে বানাও। প্রকাশ্যে আমার বাবার মূর্তি বানালেও তা ভেঙ্গে দিব।’ পোস্টটিতে ৮৩৯টি মন্তব্য এবং ৪০টি শেয়ার দেখা যায়।

একই দিনে ‘সারোয়ার’ নামের একটি আইডি থেকে এআই নির্মিত একটি ছবি সংযুক্ত পোস্টের ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘মূর্তি থাকবে মন্দিরের ভিতর। মন্দিরের বাইরে এত বড় মূর্তি ৯৫% ইসলামিক রাষ্ট্রে এটা কোনোভাবেই থাকা যাবে না।’ পোস্টটিতে প্রায় ৩১ হাজার ৯০০ প্রতিক্রিয়া, ৪ হাজার ৫০০ মন্তব্য এবং ১ হাজার ৩০০ শেয়ার হয়েছে।

১৮ জুন H M Jobayer Ansari-এর পোস্টে রাম মূর্তি সহ্য না করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে মুসলিমদের আওয়াজ তুলতে বলা হয়। এর পরদিন জি.এম আমিরের পোস্টে মূর্তি ভাঙাকে ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ছবির লেখাতেও মূর্তি ভাঙার পক্ষে স্লোগানধর্মী ভাষা দেখা যায়।

সবগুলো পোস্টে এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিগুলোতে ভাঙা বিগ্রহ ও আক্রমণাত্মক দৃশ্য দেখানো হয়েছে। ভিজ্যুয়ালগুলো ক্যাপশনের দাবিকে দৃশ্যমান করেছে। একই ধরনের আরও পোস্ট দেখুন এখানে, এখানেএখানে

পাল্টা প্রতিবাদের ভাষা

বিগ্রহ অপসারণ ও ভাঙার আহ্বানধর্মী পোস্টের বিপরীতে ফেসবুকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিবাদী পোস্টও দেখা যায়। পোস্টে এআই নির্মিত ছবি সংযুক্ত করে রাম বিগ্রহকে ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনার অধিকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

১৩ জুন ‘Viral Golap’ পেজের একটি পোস্টে একজন তরুণকে নির্মাণাধীন রাম বিগ্রহের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘গাইবান্ধার পলাশ বাড়িতে এত বড় রাম মূর্তি হচ্ছে এতে তো গোটা দেশের গর্ব হওয়া উচিত।’ এতে ১ হাজার ১০০ প্রতিক্রিয়া, ১১৪ মন্তব্য ও ১৯টি শেয়ার দেখা যায়।

পরের দিন ‘Milon Roy’ নামের আইডি থেকে করা পোস্টে রামচন্দ্রের ছবি ‘অবমাননা’র অভিযোগ ঘিরে প্রতিবাদ জানানো হয়। পোস্টটি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ঘিরে করা হয়েছিল। পোস্টটিতে ৫১৮ প্রতিক্রিয়া, ২২৩ মন্তব্য ও ৭টি শেয়ার দেখা যায়।

১৮ জুন ‘Nayan Sikder’ নামের একটি আইডি থেকে করা পোস্টে রাম মূর্তি নির্মাণের পক্ষে অবস্থান দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘...আমাদের স্বপ্ন কি পূর্ণ হবে না ভগবান!’

১৯ জুনের আরেকটি পোস্টে রাম মন্দিরের কাজ স্থগিতের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। পোস্টে থাকা ছবিতে ‘ধর্মের অবমাননা মানি না, মানব না’ লেখা প্ল্যাকার্ড এবং ‘দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি’ লেখা ব্যানার দেখা যায়। একই ধরনের আরও পোস্ট দেখুন এখানে, এখানেএখানে

এই ধারার পোস্টগুলোতে বিগ্রহ ভাঙার আহ্বানের বিপরীতে বিশ্বাস ও অধিকারের ভাষা সামনে এসেছে। এখানেও এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। রাম বিগ্রহকে শুধু নির্মাণ প্রকল্প নয়, ধর্মীয় উপস্থিতির অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে অনলাইন আলোচনায় অপসারণের দাবির পাশাপাশি পাল্টা প্রতিবাদের ভাষাও স্পষ্ট হয়।

বিশেষজ্ঞের মত

ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অ্যাক্টিভেট রাইটসের গবেষণা প্রধান মিনহাজ আমান স্ট্রিমকে বলেন, অনলাইনে মানুষ অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে বেশি বিভাজিত থাকে। তার মতে, প্ল্যাটফর্মের নকশাই মানুষকে দ্রুত উত্তেজিত ও বিভাজিত করে রাখতে পারে। ফলে মাঠের পরিস্থিতি ও অনলাইন উত্তেজনার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়াও এই সমস্যাকে বাড়ায় বলে তিনি মনে করেন।

এআই দিয়ে তৈরি ছবি নিয়েও তিনি সতর্ক করেন। মিনহাজ আমানের ভাষায়, এআই টুল এখন সহজলভ্য এবং এগুলো সূক্ষ্মভাবে বাস্তবতা বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের ডিজিটাল লিটারেসি কম হওয়ায় অনেকেই বাস্তব ছবি ও এআই ছবির তফাত করতে পারেন না।

বিগ্রহ ভাঙার আহ্বান বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করা পোস্টকে তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নীতির দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন। তার মতে, সহিংসতার আহ্বান ঠেকানোর জন্য কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দুর্বল। আগের বিভিন্ন ঘটনার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘোষিত হামলার ঝুঁকিতেও প্ল্যাটফর্মগুলোর তৎপরতা অনেক সময় যথেষ্ট দেখা যায় না।

বিদেশি সম্পৃক্ততার অযাচাইকৃত দাবির ঝুঁকি নিয়েও তিনি বলেন, সীমান্ত পেরিয়ে ছড়ানো অপতথ্য এখন বিশ্বজুড়ে ফ্যাক্টচেকার ও গবেষকদের জন্য বড় উদ্বেগ। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ইস্যুতে এমন দাবির মাধ্যমে মানুষের ধারণা প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, অনেক দেশে নির্বাচনেও এ ধরনের অপতথ্য ভূমিকা রাখছে।

একই ধরনের ছবি ও ক্যাপশন বারবার ছড়ানো প্রসঙ্গে মিনহাজ আমান বলেন, সংগঠিত প্রচারণা শনাক্তের কিছু ফ্রেমওয়ার্ক আছে। এর মধ্যে সিআইবি বা কো-অর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার একটি পরিচিত ধারণা। তবে কোনো পোস্টকে সংগঠিত প্রচারণা বলতে হলে পোস্টের ধরন, অ্যাকাউন্টের আচরণ, সময়, ক্যাপশন ও নেটওয়ার্ক মিলিয়ে আরও বিশ্লেষণ দরকার।

তার বক্তব্যে উঠে আসে, এমন পরিস্থিতিতে অনলাইন পোস্টকে শুধু মতামত হিসেবে দেখলেই হবে না। পোস্টের ভাষা, ছবি, পুনরাবৃত্তি এবং প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত