উৎপাদনের অপেক্ষায় রূপপুর, স্পেন্ট ফুয়েল রাশিয়ায় পাঠানো এখনো চূড়ান্ত নয়

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০০: ০১
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগামী আগস্টের শেষ দিকে উৎপাদন শুরু হতে পারে। তবে চুল্লিতে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর দীর্ঘমেয়াদি চূড়ান্ত আইনি চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে হওয়া আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তিতে রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল নিতে সম্মতি জানালেও চূড়ান্ত আইনি চুক্তি সই হওয়া বাকি রয়েছে। তবে এ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার দেড় থেকে দুই বছর পর চুল্লি থেকে ব্যবহৃত স্পেন্ট ফুয়েল বের করতে হবে, যা অত্যন্ত উত্তপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয়তাসম্পন্ন। তবে ২০১৭ সালে হওয়া আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির ভিত্তিতে সরাসরি স্পেন্ট ফুয়েল পাঠানো সম্ভব নয়।

প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন বলেন, বিদ্যমান চুক্তির ভিত্তিতে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রাশিয়ান ফেডারেশনে পাঠানো যাবে না। তাই রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি পৃথক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পাদনের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।

চূড়ান্ত চুক্তি সই না হলেও প্রথম কয়েক বছর বর্জ্য নিয়ে কোনো তাৎক্ষণিক সংকট হবে না বলে দাবি করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। প্রথম দিকে চুল্লিতে ব্যবহৃত যে জ্বালানি বের হবে, তা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে একটি বিশেষ পুলে (স্পেন্ট ফুয়েল পুল) রাখা হবে। এই পুলে পানির নিচে অন্তত ১০ বছর পর্যন্ত নিরাপদে বর্জ্য সংরক্ষণের কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবলই একটি সাময়িক ব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবহারের পর স্পেন্ট ফুয়েল অন্তত ১০ বছর পুলে রেখে ঠান্ডা করতে হয়। এটি একটি সাধারণ প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। কিন্তু তার মানে এই নয় যে চূড়ান্ত চুক্তি ঝুলিয়ে রাখা যাবে। বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগেই বর্জ্য ফেরত নেওয়ার আইনি পথ এবং এর বিশাল ব্যয়ভারের বিষয়টি শতভাগ পরিষ্কার হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, রাশিয়া এই বর্জ্য ফেরত নিয়ে স্থায়ীভাবে নিজ দেশে সংরক্ষণ করবে, নাকি পুনঃপ্রক্রিয়া (রিপ্রসেস) করে তার অবশিষ্টাংশ আবার বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে—তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো জনসমক্ষে আসেনি। এ ছাড়া এই বর্জ্য বিশেষায়িত জাহাজে করে রাশিয়ায় পরিবহন এবং সেখানে সংরক্ষণের বিশাল ব্যয়ভার কে এবং কীভাবে বহন করবে, তা নিয়ে আর্থিক সমীকরণ এখনো অস্পষ্ট।

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটের মূল নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে। পরের বছর শুরু হয় দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ। কয়েক দফায় সময়সীমা পেছানোর পর গত ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল প্রবেশ করানো শুরু হয়, শেষ হয় ১২ মে। সামনের মাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

উচ্চমাত্রার স্পেন্ট ফুয়েল রাশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা থাকলেও, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকালে উৎপন্ন নিম্ন ও মধ্যমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বাংলাদেশেই প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করা হবে।

প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন জানান, এ জন্য রূপপুরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মানদণ্ড অনুযায়ী একটি বিশেষায়িত ‘তেজস্ক্রিয় বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ স্থাপনা’ গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কঠিন বর্জ্য সংকোচন এবং তরল বর্জ্যকে সিমেন্টেশনের মাধ্যমে বিকিরণ-প্রতিরোধী পাত্রে রূপপুরের ভেতরেই ড্রামে সংরক্ষণ করা হবে।

এদিকে সরকার ২০১৯ সালের অক্টোবরে ‘তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক জাতীয় নীতি’ অনুমোদন দিয়ে গেজেট জারি করে। নীতিমালায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) অধীনে একটি স্বতন্ত্র ‘তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ (আরডাব্লিউএমসি) গঠনের কথা বলা হয়েছে। কোম্পানির কাজ হবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহৃত জ্বালানি ও বর্জ্য নিষ্পত্তিকরণ স্থাপনা নির্মাণ ও তার দেখভাল করা।

নীতিমালা অনুযায়ী, যতদিন পর্যন্ত এই কোম্পানি গঠিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য বাদে অন্যান্য তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে পরমাণু শক্তি কমিশন। তবে রূপপুরের প্রথম ইউনিট চালুর দ্বারপ্রান্তে এলেও কোম্পানি গঠন হয়নি।

এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, কোম্পানি গঠন না হওয়ার ব্যাপারে আমার বিস্তারিত জানা নেই, দেখতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম সংবেদনশীল অংশ হলো স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা। রাশিয়ার কাছে হস্তান্তরের আইনি চুক্তিটি দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রাশিয়া পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে যাবে এই চুক্তি তাদের সঙ্গে আছে। তবে এই বর্জ্য নেওয়ার কিছু অপারেশনাল বিষয় আছে, সেগুলো ঠিক করতে হবে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরেই নিম্ন ও মাঝারি লেভেলের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। এক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল যে প্র্যাক্টিস, এখানেও সেটা করা হচ্ছে।

আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, ২৪৬টি টেস্ট হয়ে ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এখনো ২৯০টি টেস্ট আছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে চলছে। তারপর পরের স্টেজে যেতে পারি। রূপপুরে ফুল সেফটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত