হামের মধ্যে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি, কতটা প্রস্তুত সরকার

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ০৮: ২৬
টানা বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ সময়। এবারের ডেঙ্গুর ঢেউ হয়তো ২০২৩ সালের মতো ভয়াবহ হবে না। তবে গত বছরের চেয়ে প্রকোপ বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

হাম নিয়ে ত্রাহি অবস্থা। এর মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে কিউলেক্স মশার উপদ্রব কিছুটা কমেছে। তবে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার ডেঙ্গুর ধরন ও বিস্তার জটিল আকার নিতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরে মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, টানা বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ সময়। এবারের ডেঙ্গুর ঢেউ হয়তো ২০২৩ সালের মতো ভয়াবহ হবে না। তবে গত বছরের চেয়ে প্রকোপ বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

তিনি সিটি কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে বলেন, এখনই যদি কীটনাশকের পর্যাপ্ত মজুত এবং মাঠপর্যায়ে মশকনিধন অভিযান জোরদার করা না হয়। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এ ছাড়া ডেঙ্গু বিস্তারের পেছনে শুধু মশা নয়, বরং আমাদের ত্রুটিপূর্ণ নগর পরিকল্পনাকেও দায়ী করে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ঢাকা এখন একটি উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ শহর। এখানে মশা দ্রুত রোগ ছড়াতে পারে। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা শহরের বিশেষ কিছু স্থানে অতিরিক্ত উষ্ণতা মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে আদিল মুহাম্মদ বলেন, সিটি করপোরেশন মশা মারার নামে শুধু ফগিং করে, যা লোক দেখানো। ফগিং করে উড়ন্ত মশা হয়তো কিছুক্ষণ দূরে থাকে। কিন্তু লার্ভা ধ্বংস হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত সমন্বিত নগর পরিকল্পনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আসবে না, ততক্ষণ রাসায়নিক দিয়ে মশা তাড়ানো সম্ভব নয়।

সিটি করপোরেশনের দৌড়ঝাঁপ

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে সারা দেশে ১০৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান, যার মধ্যে রাজধানীর বাসিন্দা ১৫। ২০২২ সালে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৮১ জনে, যেখানে রাজধানীবাসী ছিলেন ১৭৩। কিন্তু ২০২৩ সাল ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাছর। সেই বছর ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও যথাক্রমে ৫৭৫ ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি মৌসুমের শুরুতেই ইতোমধ্যে চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের মধ্যে দুজনই রাজধানীর।

ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি সামাল দিতে উত্তর ও দক্ষিণ— উভয় সিটি করপোরেশনই নড়েচড়ে বসেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, তারা বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম জোরদার করেছে। ড্রেন, খাল এবং জলাবদ্ধ স্থানে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। সচেতনতা বাড়াতে বাউল গানের মাধ্যমে প্রচারের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে এবং বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৭৫টি ওয়ার্ডে ‘প্রাক-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ’ শুরু করেছে। ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, দায়িত্বে অবহেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। আমরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি প্রত্যেক শনিবার নিজ নিজ বাসাবাড়ি পরিষ্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন।

হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে। অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ জানান, দেশের প্রতিটি হাসপাতালে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষাসামগ্রীর কোনো ঘাটতি নেই এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি জানান, হাম বা অন্যান্য রোগের কারণে ডেঙ্গুকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের কাছে প্রতিটি প্রাণই মূল্যবান। কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক কাজ করছে যাতে কোনো এলাকায় সংক্রমণ বাড়লেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

ডেঙ্গু প্রসঙ্গে ১৭ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার বকুল বলেন, ‘প্রতি শনিবার সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে এবং মশানিধনে স্প্রে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে কেবল সরকারি উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং মশার বংশবিস্তার রোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।’

এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতির একটি উদ্বেগের বিষয় হলো এডিস মশা আর শুধু শহরে সীমাবদ্ধ নেই। একসময় একে কেবল অভিজাত এলাকার রোগ মনে করা হলেও, এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়েছে। এই নতুন বিপদ মোকাবিলায় গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা সক্ষম, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সম্পর্কিত