এক্সপ্লেইনার

নৈতিক স্খলনের কারণে কি এমপি পদ বাতিল হয়

স্ট্রিম গ্রাফিক

কোনো জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে জনগণের পক্ষ থেকে প্রায়ই দাবি আসে সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ বা বহিস্কারের জন্য। তবে শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে কি একজন সংসদ সদস্য (এমপি) তাঁর পদ হারাতে পারেন?

বাংলাদেশে অতীতেও এমন প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে ঘিরে বিতর্কের সময় অনেকেই জানতে চেয়েছিলেন, তিনি মন্ত্রীত্ব হারালেও সংসদ সদস্য হিসেবে থাকতে পারবেন কি না। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কে একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে।

এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—না। শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগ বা সামাজিক সমালোচনার কারণে এমপি পদ বাতিল হয় না। তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী এমপি পদ শূন্য হতে পারে।

‘নৈতিক স্খলন’ আর ‘আইনগত অপরাধ’ এক জিনিস নয়

বাংলা ভাষায় ‘নৈতিক স্খলন’ বলতে সাধারণত এমন আচরণকে বোঝায়, যা সামাজিক বা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আইন সব সময় নৈতিকতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয় না। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি সমাজের চোখে অনৈতিক কাজ করলেও, সেটি যদি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত না হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবিধানিক শাস্তি কার্যকর হয় না। এ কারণেই রাজনৈতিক বা সামাজিক বিতর্ক এবং আইনি পরিণতি—দুইটি ভিন্ন বিষয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব বলেন, সংবিধানের ৬৬ (২), ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদে নৈতিক স্খলন নিয়ে উল্লেখ আছে। এই তিনটি অনুচ্ছেদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি নিজ থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হতে পারে এবং ওই আসনটি শূন্য বলে গন্য হতে পারে। তবে দল থেকে যদি বহিষ্কার করা হয়, তাহলেও তিনি সদস্যপদ হারাবেন কি না, তা নিয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই। সেখানে কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অভিযুক্ত যদি নৈতিক স্খলন-সম্পৃক্ত কোনো কারণে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এবং কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড পান তাহলে সদস্য পদ বাতিল হতে পারে। তবে এক্ষেত্রেও তা স্পষ্ট করে দেওয়া নেই।

‘মোরাল টারপিটিউড’ বা নৈতিক স্খলন-সম্পৃক্ত অপরাধ বলতে কী বোঝায়

সংবিধানে ‘মোরাল টারপিটিউড’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এর নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি।

সাধারণভাবে বিচারব্যবস্থায় এই শব্দটি এমন অপরাধ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে প্রতারণা, অসততা, দুর্নীতি, জঘন্য অনৈতিকতা বা সামাজিকভাবে গুরুতর অপরাধমূলক আচরণ জড়িত থাকে।

তবে কোনো অপরাধ মোরাল টারপিটিউড-এর মধ্যে পড়বে কি না, সেটি প্রতিটি মামলার প্রকৃতি, প্রযোজ্য আইন এবং আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিগত আচরণকে সাধারণ মানুষ নৈতিক স্খলন বললেও, আদালত সেটিকে একইভাবে দেখবে—এমন নয়।

শুধু নৈতিক অভিযোগে এমপি পদ যায় না কেন

বাংলাদেশের সংবিধান জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো অনুসরণ করে। কারণ, যদি শুধু নৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের পদ বাতিল করা যেত, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সহজেই অভিযোগ তুলে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে অপসারণের চেষ্টা করতে পারত। এ কারণেই সংবিধান অভিযোগ নয়, আইনগতভাবে প্রমাণিত অপরাধকে গুরুত্ব দিয়েছে।

আইনজীবী আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব বলেন, সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হতে পারে। সংসদ সদস্যের নিজ থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদের অনুমতি ছাড়া টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে পদ বাতিল হয়। এছাড়াও, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের কোনো অযোগ্যতা অর্জন করলে অথবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলত্যাগ বা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে আসন শূন্য হতে পারে।

এছাড়া সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচনের পরে অযোগ্য হয়েছেন কি না—এ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে যায়। নির্বাচন কমিশন শুনানি নিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টকশো বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়।

অন্য দেশেও কি একই রকম

অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই ব্যক্তিগত নৈতিক বিতর্ক এবং সাংবিধানিক অযোগ্যতাকে আলাদা করে দেখা হয়। যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কোনো জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক বা নৈতিক চাপে পদত্যাগ করতে পারেন। কিন্তু সংসদ সদস্যপদ হারাতে হলে সাধারণত আইনগত ভিত্তি, আদালতের রায় অথবা সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং আইনি অযোগ্যতা—দুইটি আলাদা ব্যবস্থা।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত