যন্তর মন্তর থেকে ফেসবুক-ইউটিউব, র‍্যাপে মুখর ‘ককরোচদের’ আন্দোলন

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৪১
যন্তর মন্তর থেকে ফেসবুক-ইউটিউব, র‍্যাপে মুখর ‘ককরোচদের’ আন্দোলন। স্ট্রিম গ্রাফিক

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সরকারের আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করেছে সিজেপি। একইসঙ্গে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত দিল্লির যন্তর মন্তর ছেড়ে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।

এরই মধ্যে র‍্যাপ এই আন্দোলনের অন্যতম প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক নতুন গান প্রকাশ হচ্ছে, যা মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে লাখো মানুষের কাছে। অনেক পরিচিত র‍্যাপারও সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত র‍্যাপগুলোর একটি গেয়েছেন তরুণ র‍্যাপার গরম কালাকার। তাঁর ‘যন্তর মন্তর পে ক্যায়া দেখা’ শিরোনামের র‍্যাপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গানটিতে তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার কথা তুলে ধরেছেন। গানটি প্রকাশ করে তিনি জানান, যারা আন্দোলনের মাঠে যেতে পারেননি, তাঁদের কাছে যন্তর মন্তরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতেই তিনি এই গান তৈরি করেছেন।

একের পর এক নতুন গান প্রকাশের পর অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন, তখন দেশের বড় বড় তারকারা কেন চুপ? সেই আলোচনার মধ্যেই অনেকের কাছে র‍্যাপ এই আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।

তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ভারতীয় র‍্যাপার হনুম্যানকাইন্ড। বিশ্বের বড় বড় মিউজিক ফেস্টিভ্যালে পারফর্ম করা এই র‍্যাপার নেমে এসেছেন রাজপথে। গতকাল দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিছিলে হাঁটেন তিনি। শুরুতে মুখে মাস্ক ও মাথায় টুপি থাকায় অনেকেই তাঁকে চিনতে পারেননি। পরে আন্দোলনকারীরা তাঁকে দেখে ঘিরে ধরেন। তাঁর উপস্থিতির ভিডিও ও ছবি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন জন্তর মন্তরে জমায়েত হওয়া বিক্ষোভকারীরা। ছবি : এনডিটিভি
বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন জন্তর মন্তরে জমায়েত হওয়া বিক্ষোভকারীরা। ছবি : এনডিটিভি

শুধু হনুম্যানকাইন্ড নন, ভারতের আরও অনেক পরিচিত র‍্যাপার শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দিল্লির র‍্যাপার চ্যার দিওয়ারি, এনকোর এবিজে, রাগা ও কার্মা আন্দোলনে অংশ নেন। এ ছাড়া ভারতীয় হিপ-হপ অঙ্গনের আরও অনেক শিল্পী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের কেউ আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেছেন, কেউ আবার শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।

এরই মধ্যে ফেসবুক-ইউটিউবে ‘ককরোচদের’ আন্দোলন ঘিরে একের পর এক র‍্যাপ প্রকাশ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রুসপ্যান অফিশিয়াল–এর ‘সিজেপি নিউ র‍্যাপ সং’, এবি মিউজিক–এর ‘ককরোচ জনতা পার্টি অফিসিয়াল র‍্যাপ’, ‘ককরোচ জনতা পার্টি র‍্যাপ অ্যান্থেম’ এবং পীযূষ জি–এর ‘যন্তর মন্তর পর ককরোচ জনতা পার্টি’। তবে এগুলোর বেশিরভাগই ইউটিউবভিত্তিক স্বাধীন শিল্পীর তৈরি।

এদিকে র‍্যাপার এনকোর এবিজে আন্দোলনের ভিডিওর সঙ্গে নিজের একটি প্রতিবাদী র‍্যাপ গান ব্যবহার করেন। সেই গানে ভগত সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ ও এপিজে আবদুল কালামের মতো ব্যক্তিত্বের কথা উঠে এসেছে। গানটি আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল। আন্দোলনের সময় সেটি আবার নতুন করে আলোচনায় আসে।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত র‍্যাপগুলোর একটি গেয়েছেন তরুণ র‍্যাপার গরম কালাকার। সংগৃহীত ছবি
এই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত র‍্যাপগুলোর একটি গেয়েছেন তরুণ র‍্যাপার গরম কালাকার। সংগৃহীত ছবি

র‍্যাপার ও শিক্ষক সঞ্চয় ওয়াধভা মনে করেন, হনুম্যানকাইন্ডের মতো একজন আন্তর্জাতিক শিল্পীর রাজপথে উপস্থিতি আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, একজন পরিচিত শিল্পী যদি আরও কিছু মানুষকে আন্দোলনে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করতে পারেন, সেটিই বড় বিষয়। তিনি বলেন, র‍্যাপ আসলে সমাজের আয়না। চারপাশে যা ঘটছে, র‍্যাপ সেই গল্পই বলে।

দিল্লির আরেক র‍্যাপার ডমিনিক মেসাইয়া আন্দোলনের শুরু থেকেই যন্তর মন্তরে নিয়মিত যাচ্ছেন। তিনি সেখানে প্রতিবাদী র‍্যাপ পরিবেশন করছেন। আন্দোলনের মাঠেই র‍্যাপারদের নিয়ে বিশেষ পরিবেশনার আয়োজন করা হচ্ছে। হিপ-হপ সংস্কৃতিতে এমন পরিবেশনাকে ‘সাইফার’ বলা হয়। ডমিনিকের ভাষায়, হিপ-হপের জন্মই হয়েছে অন্যায়, বৈষম্য ও মানুষের কষ্টের কথা বলার জন্য। তাই আন্দোলনের মাঠে র‍্যাপ গাওয়া এই সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ।

জনপ্রিয় তামিল র‍্যাপার আরিভু শিক্ষার্থীদের সমর্থনে চেন্নাইয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে পুলিশ তাঁকে আটক করে। সংগৃহীত ছবি
জনপ্রিয় তামিল র‍্যাপার আরিভু শিক্ষার্থীদের সমর্থনে চেন্নাইয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে পুলিশ তাঁকে আটক করে। সংগৃহীত ছবি

দক্ষিণ ভারতেও এই আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে। জনপ্রিয় তামিল র‍্যাপার আরিভু শিক্ষার্থীদের সমর্থনে চেন্নাইয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে পুলিশ তাঁকে আটক করে। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বলেন, দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের প্রতিবাদ জানাতেই তিনি রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁর মতে, নিট পরীক্ষা বহু শিক্ষার্থীর মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তাই তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

জনপ্রিয় র‍্যাপার হানি সিংও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তিনি তাঁর নতুন গানের টিজার প্রকাশ পিছিয়ে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা আহত হওয়ার খবরের পর নতুন গানের প্রচারণা চালানো তাঁর কাছে ঠিক মনে হয়নি। তাঁর এই সিদ্ধান্তও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি করে।

কিন্তু কেন র‍্যাপ

প্রশ্ন উঠতেই পারে, আন্দোলনের সময় এত র‍্যাপ কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একটু গভীরে তাকাতে হবে। র‍্যাপের উৎস, এর ভাষা, ছন্দ, আর প্রযুক্তিগত দিকগুলো বোঝা জরুরি।

র‍্যাপের জন্মই হয়েছে প্রতিবাদের ভেতর দিয়ে। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস এলাকায় এর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। তখন আফ্রিকান-আমেরিকান ও লাতিন তরুণেরা দারিদ্র্য, বর্ণবাদ, বেকারত্ব, পুলিশি নির্যাতন ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজেদের কথা বলার নতুন ভাষা খুঁজছিলেন। সেই ভাষাই ছিল র‍্যাপ।

তবে র‍্যাপের শিকড় আরও গভীরে। আফ্রিকার গল্পকথক গ্রিওটরা ছন্দ আর গানের মাধ্যমে ইতিহাস, সমাজ আর মানুষের গল্প শুনিয়ে আসতেন শত শত বছর ধরে। অনেক গবেষক মনে করেন, সেই মৌখিক ঐতিহ্যের প্রভাবও র‍্যাপের বিকাশে রয়েছে। তাই শুরু থেকেই র‍্যাপ শুধু বিনোদনের জন্য নয়, মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রতিবাদ প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবেই পরিচিত।

র‍্যাপের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ভাষা। এখানে কঠিন কথা ঘুরিয়ে বলা হয় না। যা দেখা যায়, যা অনুভব করা হয়, তা সরাসরি বলা হয়। অন্যায়, ক্ষোভ, হতাশা কিংবা স্বপ্ন—সবকিছুই সহজ ভাষায় তুলে ধরা যায়। তাই আন্দোলনের সময় র‍্যাপ তরুণদের কাছে দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

তবে শুধু ভাষা নয়, র‍্যাপ তৈরির পদ্ধতিটাও একে আলাদা করে তোলে। চাইলে গান তৈরি করা যায় একেবারে ‘গেরিলা স্টাইলে’। মানে ছোট জায়গায়, অল্প খরচে, অল্প সরঞ্জামে। একটা মাইক্রোফোন, একটা ল্যাপটপ আর একটা সফটওয়্যার হলেও চালিয়ে নেওয়া যায়। ফলে কোনো ঘটনা ঘটার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন র‍্যাপ তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

স্থানীয় ভাষার ব্যবহারও র‍্যাপকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। অধিকাংশ র‍্যাপার নিজের এলাকার ভাষা, উচ্চারণ ও শব্দ ব্যবহার করেন। ফলে শ্রোতারা গানটিকে নিজের জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারেন। এর সঙ্গে যোগ হয় ছন্দ। র‍্যাপ সাধারণত ৯০ থেকে ১১০ বিট প্রতি মিনিটে চলে—যা মানুষের হৃৎস্পন্দন মতোই। তাই র‍্যাপ সহজেই মানুষের আবেগে ধাক্কা দেয়।

এসব কারণে আন্দোলনের সময় র‍্যাপ হয়ে ওঠে কার্যকর হাতিয়ার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন আন্দোলনে র‍্যাপ বারবার সামনে এসেছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনেও তরুণরা র‍্যাপকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এখন ভারতের ছাত্র আন্দোলনেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাজপথের স্লোগানের পাশাপাশি র‍্যাপও হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, ক্ষোভ আর দাবি তুলে ধরার শক্তিশালী মাধ্যম।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত