বাংলাদেশের আলোচিত ও বিতর্কিত চুক্তিগুলো

লেখা:
লেখা:
সানিউজ্জামান পাভেল ও রাতুল আল আহমেদ

স্ট্রিম গ্রাফিক

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম হাতিয়ার হলো আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। গত সাত দশকে দক্ষিণ এশিয়ার উত্তাল ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এবং স্বার্থ রক্ষায় সম্পাদিত হয়েছে নানা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। ১৯৫৪ সালের স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গঠিত সামরিক জোট ‘সিয়েটো’ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি পর্যন্ত— প্রতিটি পদক্ষেপই দেশের ইতিহাসে তৈরি করেছে আলোচনা ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক। কখনও সামরিক নিরাপত্তা, কখনও পানির ন্যায্য হিস্যা, আবার কখনও জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রয়োজনে রাষ্ট্র এসব চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় একটি প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে— এসব চুক্তি কি সত্যিই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেছে, নাকি সার্বভৌমত্বকে ঠেলে দিয়েছে ঝুঁকির মুখে?

এই রকম আলোচিত অন্যতম চুক্তিগুলোতে কী আছে? সেগুলো কী এখন কার্যকর?

সাউথ ইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সিয়েটো (১৯৫৪-১৯৭৭)

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের প্রভাব ও কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানোর লক্ষ্যে ১৯৫৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইনের ম্যানিলায় এক চুক্তির মাধ্যমে ‘সিয়েটো’ গঠিত হয়। আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালসের ‘ডমিনো থিওরি’র ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামষ্টিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাকিস্তান এই জোটে যোগ দিয়েছিল মূলত ভারতের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা এবং আধুনিক মার্কিন সমরাস্ত্র লাভের আশায়।

ভৌগোলিক কারণে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) সিয়েটোর কাছে অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব বহন করত। কিন্তু এই চুক্তিটি শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার প্রগতিশীল রাজনীতিতে প্রচণ্ড সমালোচিত হয়। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বামপন্থী দলগুলো একে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী একপক্ষীয় চুক্তি হিসেবে গণ্য করত। তাদের অভিযোগ ছিল, এই চুক্তির ফলে পাকিস্তান কার্যত আমেরিকার ‘লেজুড়’ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী এই চুক্তির বিরোধিতা করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক মাইলফলক।

বিশ্লেষকদের মতে, সিয়েটো ন্যাটোর মতো শক্তিশালী কোনো সামরিক কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিল। এর কোনো কেন্দ্রীয় কমান্ড বা স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল না। সিয়েটোর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা প্রকাশ পায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়। সেই সময় এটি পাকিস্তানকে কোনো সামরিক সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসেনি। বিপরীতে, এই জোটের দোহাই দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির অভিযোগ ছিল প্রবল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তান এই জোট থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। কার্যকারিতা হারিয়ে ১৯৭৭ সালে এটি বিলুপ্ত হয়।

সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সেন্টো (১৯৫৫-১৯৭৯)

স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাল সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিজম যেন দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘বাগদাদ চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৫৮ সালে ইরাকে বিপ্লবের পর দেশটি জোট থেকে বেরিয়ে গেলে ১৯৫৯ সালে এর সদর দপ্তর আঙ্কারায় সরিয়ে নেওয়া হয় এবং নতুন নাম দেওয়া হয় ‘সেন্টো’। ইরান, পাকিস্তান, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্মিলিত প্রয়াসটি মূলত ইউরোপের ন্যাটো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিয়াটো জোটের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করার জন্য পরিকল্পিত হয়েছিল।

চুক্তি অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলো একে অপরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়াও অবকাঠামো, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। এর আওতায় আঙ্কারা থেকে করাচি পর্যন্ত মাইক্রোওয়েভ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে রেল সংযোগ এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। তৎকালীন পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশও এই সামরিক জোটের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে এই চুক্তি তৎকালীন পূর্ব বাংলায় চরম রাজনৈতিক অসন্তোষ ও বিতর্কের জন্ম দেয়। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ (পরে ন্যাপ) এবং বামপন্থী দলগুলো একে ‘দেশবিরোধী’ ও ‘সাম্রাজ্যবাদী ফাঁদ’ হিসেবে আখ্যা দেয়। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী এই সামরিক চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে স্পষ্ট জানান যে, এটি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপত্তা নয় বরং যুদ্ধের ঝুঁকি বয়ে আনবে। সমালোচকদের মতে, সেন্টোর মাধ্যমে পাওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রায় পুরোটাই পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হতো, যা পূর্ব বাংলার ওপর এক ধরনের নিরাপত্তা বৈষম্য ও বঞ্চনা তৈরি করেছিল। এছাড়া ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে এই জোট পাকিস্তানের পক্ষে কোনো কার্যকর ভূমিকা না রাখায় একে একটি ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পর ইরান সদস্যপদ প্রত্যাহার করলে জোটটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি (১৯৭২)

১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ দুই দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী ২৫ বছর মেয়াদী এই চুক্তি সাক্ষর করেন।

মোট ১২টি ধারা সম্বলিত এই চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সৌহার্দ বজায় রাখার পাশাপাশি এক দেশ অন্য দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং একে অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দুই দেশ নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রাখবে। এছাড়াও দুই দেশ অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক এবং কারিগরি ক্ষেত্র সহ বাণিজ্য, যাতায়াত, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর অববাহিকা উন্নয়ন, জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন ও সেচ প্রকল্পের ক্ষেত্রে যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ করবে।

কিন্তু এই চুক্তি দেশবিরোধী হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। কেননা চুক্তি অনুযায়ী এক দেশ তৃতীয় অন্য কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে না, যা চুক্তি স্বাক্ষরকারী আরেক দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। এছাড়াও দুই দেশের কেউই তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে গোপনে বা প্রকাশ্যে এমন কোনো চুক্তি সম্পাদন করতে পারবে না, যা এই চুক্তির শর্তকে বিঘ্নিত করে। এসব ধারার কারাণে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে।

১৯৯৭ সালের ১৯ মার্চ চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং অতঃপর আর এ চুক্তির নবায়ন করা হয়নি।

ভারত-পাকিস্তান সিমলা চুক্তি (১৯৭২)

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয়ের পর উদ্ভূত পরিস্থিতির কূটনৈতিক নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২ জুলাই ভারতের হিমাচল প্রদেশের সিমলায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারত ও পাকিস্তানের যাবতীয় বিরোধ তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিরতি রেখাকে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

সিমলা চুক্তির সরাসরি অংশীদার না হলেও বাংলাদেশের ভাগ্য ও স্বার্থ এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। এই চুক্তির ওপর ভিত্তি করেই পরে ১৯৭৪ সালে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে পাকিস্তানে আটকে পড়া প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার বাঙালি দেশে ফেরার সুযোগ পান। তবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে এই চুক্তিটি বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল মূলত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুকে কেন্দ্র করে। সিমলা চুক্তির প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক কৌশলে শেষ পর্যন্ত ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুজিব সরকার ১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তার বিচার করতে চায়। সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার আর আলোর মুখ দেখেনি।

এছাড়া চুক্তির আরেকটি ব্যর্থতা ছিল বাংলাদেশে আটকে পড়া কয়েক লক্ষ উর্দুভাষীকে পাকিস্তান ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানানো। এইসব কারণে এই চুক্তিটি আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে আলোচিত হয়।

গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি (১৯৯৬)

গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে কয়েক দশকের বিরোধ মেটাতে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ৩০ বছর মেয়াদী এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া এই চুক্তির মূল রূপকার ছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কা পয়েন্টে প্রাপ্ত পানি একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক ফর্মুলার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদি পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের কম হয়, তবে দুই দেশ ৫০ শতাংশ করে পানি পাবে—এটিই ছিল চুক্তির অন্যতম প্রধান দিক।

তবে শুরু থেকেই এই চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী হিসেবে ব্যাপক সমালোচিত হয়। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য যে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বা ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা ছিল, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে তা রাখা হয়নি। অর্থাৎ, যদি কোনো কারণে গঙ্গার পানির প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, তবে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে কতটা পানি পাবে সে বিষয়ে কোনো অঙ্গীকার নেই।

এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের নদ-নদীগুলো, বিশেষ করে গড়াই নদী শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও কৃষি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, কিন্তু আজও পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার ক্ষোভ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান।

আদানি গ্রুপ পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (২০১৭)

২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর ভারতের আদানি পাওয়ার ও বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদী এই পিপিএ (পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট) বা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল।

চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ আগামী ২৫ বছরের জন্য ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি গ্রুপের কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয় করবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০–এর আওতায় বিনা দরপত্রে এই চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল, ফলে দ্রুতই এই চুক্তি বিতর্কিত হয়।

পরে এই চুক্তি দ্রুতই দেশবিরোধী আখ্যা পেয়েছিল কেননা ২০১৮ সালের এপ্রিলে ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইফা) এক প্রতিবেদন অনুসারে প্রথম আলোর এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, আদানি গ্রুপের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে বাংলাদেশকে ২৫ বছরে ৭০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় করতে হবে।

এছাড়াও চুক্তি অনুযায়ী আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতার ৩৪ শতাংশের চেয়ে কম বিদ্যুৎ ক্রয় করলে পিডিবিকে নির্দিষ্ট অঙ্কের জরিমানা দিতে হবে। পাশাপাশি বার্ষিক ঘোষিত চাহিদার যত কম বিদ্যুৎ পিডিবি নেবে, ততটুকু বিদ্যুতের কয়লার দাম, জাহাজের ভাড়া, বন্দরের খরচ দিতে হবে পিডিবিকে। আবার এ ধরনের অন্য সব চুক্তিতে কয়লার মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ কত হবে তার একটা সীমা নির্ধারণ করা থাকলেও আদানির সঙ্গে এই চুক্তিতে এ রকম কোনো সীমা নেই। বরং যে কয়লাই ব্যবহার করা হোক না কেন, কয়লার দাম হিসাব করার ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার ইনডেক্স ও নিউ ক্যাসেল ইনডেক্সের গড় ধরার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য ভারতের অংশে যে সঞ্চালন লাইন নির্মিত হয়েছে, তার ব্যয়ও বিদ্যুতের দামের মধ্যে ধরা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই চুক্তি বাতিলের দাবি উঠলেও অদ্যাবধি চুক্তিটি বহাল আছে। গত ২ এপ্রিল সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী জানান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার চিন্তা করছে সরকার।

ভারত-বাংলাদেশ উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক (২০১৯)

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ভারতের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক সাক্ষর করে।

স্মারক অনুযায়ী ভারতক বাংলাদেশে উপকূলীয় নজরদারির জন্য একটি রাডার ব্যবস্থা স্থাপন করবে, যা দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা এবং দুই দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সামুদ্রিক নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ।

কিন্তু একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের উপকূলের মত সংবেদনশীল এলাকায় ভিনদেশী রাডার স্থাপন এবং তা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মতপ্রকাশ করেন ও এই সমঝোতা স্মারককে দেশবিরোধী আখ্যা দেন।

সমঝোতা স্মারকটি এখনও কার্যকর রয়েছে এবং ভারত এই স্মারককে দুদেশের মেরিটাইম নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি (২০২৬)

২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সাক্ষরিত হয়। মূলত দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক হ্রাসের লক্ষ্যে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তি সম্পাদন করে।

চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্ক বসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোটা দেবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নির্ধারিত হারে শুল্ক বসাবে। এছাড়াও মার্কিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়াও এমন কোনো নিয়ম-কানুন, অনুমতি, পরীক্ষা, মান যাচাই বা লাইসেন্স আরোপের মতো নিয়ম করা যাবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজারে অগ্রাধিকার পাবে এবং বাংলাদেশ এমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি বা মানদণ্ড নেবে না, যাতে মার্কিন পণ্য অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের শক্ত সুরক্ষা দেবে এবং মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেবে যা অনলাইন ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। আবার বাংলাদেশ এমন কোনো ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপ করবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি করে।

এ চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গম-আটা, সয়াবিন তেল ইত্যাদি নানা নিত্যপণ্য কিনতে হবে। বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হবে।

চুক্তিতে বাজারে প্রবেশের শর্তানুযায়ী বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি, সোর্স কোড বা গোপন ব্যবসায়িক তথ্য দিতে বাধ্য করতে পারবে না। তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন কোনো কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে খুব কম দামে পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে। সর্বোপরি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে।

চুক্তির এসব শর্তের কারণে বেশিরভাগ বিশ্লেষক এই চুক্তিকে বাংলাদেশের স্বার্থ ও কর্তৃত্ববিরোধী, একপক্ষীয় ও অসম চুক্তি হিসেবে মূল্যায়িত করেছেন। চুক্তি ঘিরে বিতর্ক এবং এটি বাতিলের দাবি খুব জোরালো হলেও বিএনপি সরকার চুক্তিটি বাতিল করবে না বলেই এই সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বিবিসি বাংলাকে ধারণা দিয়েছে।

সম্পর্কিত