ইরান যুদ্ধের জেরে ঢাকায় জ্বালানি সংকট ও নানা ধরনের রাজনৈতিক-প্রাকৃতিক উত্তাপের ছড়াছড়ি। এর মধ্যেও গত ২৪ এপ্রিল (শুক্রবার) ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) গাড়ি ও যন্ত্রাংশের মেলায় বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) প্রদর্শনীর মুগ্ধতা যেন গ্রীষ্মের প্রার্থীত বৃষ্টি। আমরা যখন মেলায় পৌছালাম তখন বিকেল প্রায় সাড়ে ৫টা। পড়ন্ত বিকেলের রোদে বসুন্ধরার হলুদাভ সোনালু ফুলগুলো হয়ে উঠলো আরও অপরূপ।
ঢাকা অটো শো
গত ২৩ এপ্রিল থেকে আইসিসিবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিন দিনব্যাপী (২৩-২৫ এপ্রিল) ১৯তম ঢাকা অটো সিরিজ অব এক্সিবিশনস ২০২৬। এখানে একই ছাদের নিচে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রদর্শনীর পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো ‘৩য় ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বাংলাদেশ প্রদর্শনী’।
এবারের এক্সিবিশনে জাপান, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ ১০টি দেশের ৭০ টিরও বেশি কোম্পানি অংশ নিয়েছে এবং প্রায় ২০০ বুথে নতুন প্রযুক্তি ও যানবাহন প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে অংশ নিয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অটো মোবাইল কোম্পানি, যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীরা। প্রদর্শনীতে মিতসুবিশি, টয়োটা, মার্সিডিজ বেঞ্জ, হোন্ডা, এমজি, প্রোটন, চাঙ্গান প্রভৃতি ব্র্যান্ডের গাড়ি প্রদর্শন করা হয়েছে। মেলাটির আয়োজক ছিলেন সেলস-গ্লোবাল।
ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক গাড়ি বলতে বোঝায় এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চালিত যানবাহন, যার ট্রাকশন শক্তি গাড়িতে ইন্সটলকৃত রিচার্জেবল ব্যাটারি দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে। মেলায় প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন মডেলের বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল (ই-বাইক)। দেশে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি। তাই দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেলের স্টলগুলোতে। বিশেষ করে তরুণ দর্শনার্থীদের বেশি আকর্ষণ ছিল বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের (ই-বাইক) স্টলে।
দল বেঁধে গাড়ি দেখা
তরুণ-তরুণীদের ভিড় ঠেলে আমরা প্রথমে এলাম বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বেইল) এর প্রদর্শনীতে। আমরা মানে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ১৪তম ব্যাচের দশ বারোজন সতীর্থ বা ব্যাচমেট।
বেইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবিরের আমন্ত্রণেই এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি ইভি দেখতে আসা। এই প্রদর্শনীতে বেইল তাদের বহুল প্রতীক্ষিত প্রোটোটাইপ মডেল উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এই অটো প্রদর্শনীতে তাদের তিনটি ব্র্যান্ড-চার চাকার যাত্রী ও পণ্যবাহী যান ‘এমইভি’, মোটরবাইক ব্র্যান্ড ‘গ্লাইডার’ এবং তিন চাকার যান ‘অটোম্যাক্স’- উন্মোচন করে।
হল-১ এ বেইল ও অন্যান্য কোম্পানির মোটর বাইক ও তিন চাকার যান দেখা ছিলো চমৎকার এক অভিজ্ঞতা। চোখে পড়ার মতো দৃশ্য হলো, এসব গাড়িতে চড়ে তরুণ তরুণীদের ছবি বা সেলফি তোলার ধুম। আমরাও অংশ নিলাম এই ফটো-উৎসবে।
ইভিতে চড়ে কিশোর কালের উচ্ছ্বাস
এর পর যাওয়া হলো হল-২ এ বেইলের ৪ চাকার যাত্রীবাহী গাড়ি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি) দেখতে। কোম্পানিতে এই ব্রান্ডের আদুরে নাম-‘এমইভি’। মীর মাসুদ কবির (অপু) তার ইভির কথা ২০১৫ সালের বসন্তে এক সান্ধ্যকালীন আড্ডায় আমাদের বলেছিলেন। অবশেষে ২০২৬ এর কৃষ্ণচূড়া-জারুল-সোনালু ফোটা গ্রীষ্মে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলো।
বহুদিন আগের কথা। ছুটি শেষে পদ্মা পাড়ের রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে আমরা যাচ্ছি। ক্যাডেটদের বড় একটা অংশ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে মূলত ট্রেন ধরে (বিশেষত উত্তরা এক্সপ্রেস) কলেজে যোগদান করত। বন্ধু মীর মাসুদ কবির (অপু) আসত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। বাবা মা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা কেউ পাকশী, ইশ্বরদী, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ থেকে...।
সরদহ বা সারদা রেল স্টেশন থেকে মোক্তারপুর (ক্যাডেট কলেজ) প্রায় ৩ মাইলের পথ। স্টেশন থেকে কলেজের বাসে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা। তবে মাঝেমধ্যে আমরা ঘোড়ার গাড়ি বা টমটমেও যেতাম। সে ছিল অসম্ভব আনন্দের এক যাত্রা। সেদিন বেইলের সাদা রঙের বৈদ্যুতিক গাড়িতে (এসইউভি) বসে আমরা কয়েকজন সানন্দে ছবি-টবি তুললাম। একজন সুরসিক বন্ধুর মন্তব্য মনে ধরলো-‘ফ্রম টমটম টু ইভি’। ইভিতে বসে যেন সেই কিশোর বয়সে টমটমে চড়ার উচ্ছাস। তবে এর মাঝে চলে গেছে কত বছর। জীবন এভাবেই এগিয়ে যায়। জানিনা, ঘোড়াগাড়ির চালক আমাদের প্রিয় গফুর ভাই এখন কেমন আছেন।
শতভাগ দেশে তৈরি গাড়ির যে গল্প
মাসুদ কবির ও বেইলের চেয়ারম্যান এ মান্নান খান (চেয়ারম্যান, ম্যাংগো টেলিসার্ভিস লি.) গল্পের মতো করে ইভি তৈরির অত্যান্ত চ্যালেঞ্জময় জার্নির কথা আমাদের বলেন। চট্টগ্রামের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি ইভি উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে যানবাহনের প্ল্যাটফর্ম ও বডি তৈরি করে আমদানী নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা বলেন, দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়।
বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ি সংযোজন হওয়া শুরু হয়েছে আগেই। তবে বেইলের ইভি হবে ব্যাটারিসহ শতভাগ বাংলাদেশেই তৈরি। প্রদর্শনীতে বেইলের একটা চমৎকার ব্যানার চোঁখে পড়লো-‘দি ফাস্ট মেইড ইন বাংলাদেশ ইভি’ আনভেইলড বাই দি ‘কান্ট্রিস ফাস্ট অটোমোবাইল ম্যানুফেকচারার’-বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লি...। অর্থাৎ সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদন করছে বেইল। এক্ষেত্রে বেইলই অগ্রপথিক বা পাইওনিয়ার।
ইভি নিয়ে আরও কিছু কথা
আয়োজকরা আশা করছেন, এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজার আরও সম্প্রসারিত এবং স্থানীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ হবে। দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে এই উদ্যোগ নতুন দিগন্ত উন্মোচক করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং পরিবেশ বান্ধব পরিবহনের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইভি খাতের এই অগ্রগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক হতে পারে।
অটোমোবাইল শিল্পে সম্ভাবনা
অটোমোবাইল শিল্পে নতুন সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মোটর গাড়ি শিল্প দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তৃতীয়। এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের দুই চাকার মোটর সাইকেল বাজারের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। একে বিপ্লব বলা যায়।
বাংলাদেশে কয়েকটি বড় গাড়ির কারখানা রয়েছে যা মিতসুবিশি এবং প্রোটনের যাত্রীবাহী গাড়ি এবং হাইনো ও টাটার বাণিজ্যিক যানবাহনগুলো সংগ্রহ করে সংযোজন করে থাকে। এছাড়াও কয়েকটি দেশি কোম্পানি তাদের বিদেশি প্রযুক্তিবিষয়ক অংশীদারদের সঙ্গে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। বিদেশি কোম্পাননি সমূহ তাদের ব্রান্ডেড যানবাহন প্রাথমিকভাবে গাড়ি সংযোজনের জন্য বিনিয়োগ করছে। ধীরে ধীরে সংযোজন কারখানাগুলো পূর্ণ গাড়ি উৎপাদন কারখানায় উন্নিত হবে।
গাড়ি তৈরির পাশাপাশি যন্ত্রাংশ (অটোমটিভ যন্ত্রাংশ) উৎপাদনেরও আছে বিশাল সম্ভাবনা। তবে সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের অটোমোবাইল শিল্পে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না কেন? মেলায় কয়েকজন তরুন উদ্যোক্তাকে এ প্রশ্ন করেছিলাম। তারা ৫টি বাধার কথা বললেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, সহায়ক কর কাঠামো না থাকা, স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্তভাবে কাঁচামালের জোগান না থাকা, দক্ষ মানব সম্পদের অভাব ও অপর্যাপ্ত ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ...।
এখন গাড়ি নির্মাণ শিল্প এগিয়ে যাওয়ার সময়। অটোমোবাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও এগ্রো মেশিনারি খাত বাংলাদেশের শিল্পখাতের সম্ভাবনা ও সক্ষমতা তুলে ধরেছে। এই সেক্টরগুলো সরকারের অগ্রাধীকার প্রাপ্তখাত। যা দেশের বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানে ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। ইভিই অটোমোবাইলের ভবিষ্যৎ। এখানেই আমাদের উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অটোমোবাইল শিল্পে এখন ‘ইলেকট্রিক ভেহিকল’ বা ইভির জয়জয়াকার। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। জনঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান দূষণ বিবেচনায় বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে বর্তমানে দিন দিন ইভির চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে শহর এলাকায় বায়ুদূষণ কমাতে এবং আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বৈদ্যুতিক গাড়ি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ৩০ শতাংশ যানবাহনকে বৈদ্যুতিক যানে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারলে কার্বন নিঃসরণ কমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পরিবহন খরচও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশে গাড়ি তৈরির ইতিহাস: গান্ধারা থেকে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামে (বাড়বকুন্ডে) যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরসের যৌথ উদ্যোগে ”গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজ” প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল হাবিবুল্লাহ খান খট্রক (অব.) ছিলেন এর উদ্যোক্তা। ষাট দশকের শেষের দিকে এখানে সেডান গাড়ি ‘ভক্সহল ভিভা’ এবং ’বেড ফোর্ড ট্রাক’ উৎপাদন (অ্যাসেম্বলিং) শুরু হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সরকার কোম্পানীটিকে জাতীয়করণ করে এবং নাম পরিবর্তন করে ‘প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ’ রাখে। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ (পিআইএল) বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরানো এবং বৃহত্তম মোটর গাড়ি সংযোজনকারীদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭২ সালে দিল্লীতে একটি মেলায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে প্রগতি নির্মিত একটি গাড়ি উপহার দেয়া হয়েছিল। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের গাড়ি নির্মানের বিষয়টি তখন ভারতীয় সাংবাদিকদের অবাক করেছিলো।
বাঙালির উদ্যোক্তা ঐতিহ্য: অনালোচিত একটি অধ্যায়
গাড়ির মেলাতে এসে বাঙালির উদ্যোক্তা ঐতিহ্যের কথা ভাবছিলাম:- ব্রিটিশ আমলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় শিল্পায়নে বাঙালি বেশ অগ্রসর ছিলো। উনিশ শতকের প্রথমার্ধেই কোলকাতা কেন্দ্রিক একটি বাঙালি বনিক সম্প্রদায়ের (মূলত হিন্দু) উদ্ভব হয়। কোলকাতা ও হাওড়ার আশেপাশে বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে ওঠে।
পাকিস্তান হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশে নতুনভাবে শিল্পায়ন শুরু হয়। তবে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে মূলত ১৯৫৮ সালের পর। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানে শিল্প নীতির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি শিল্প বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হয়। অনেক বিদেশি ওষুধ কোম্পানি থেকে শুরু করে পাট কোম্পানি ও দেশি শিল্পের ব্যাংক, বীমা, পাটকল, কাগজকল এই সময়ে গড়ে ওঠে।
একটি আত্মনির্ভরশীল বাঙালি উদ্যোক্তা শ্রেণি এ সময়ে গড়ে ওঠে। পাট রপ্তানি আগে হলেও, চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ও চিংড়ি মাছ রপ্তানি এই সময়ে মাসে ষাটের দশকের শেষে হয় এবং বাঙালিরা এই সময়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় হাত পাকায়। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও খুলনায় অদ্ভুদভাবে শিল্পের বিকাশ হয়। যদিও অবাঙালিরা ছিলো অধিকাংশ শিল্পের মালিক, তারপরও এই সময়েই বাঙালি শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
শিল্পায়নে গুরুত্ব দেওয়া হোক
গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য শিল্পায়ন হয়েছে। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ঔষধ ও চামড়াশিল্প খুব ভালো করেছে। কয়েকটিতো বিশ্বমানের। আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া উচিত শিল্প। আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পায়নেও নতুন করে ভাবতে হবে।
আমাদের লক্ষ লক্ষ তরুণ এখন বেকার। ব্যাপক শিল্পায়ন না হলে এই বেকারত্ব দূর করা খুব কঠিন। তাই আমাদের ফোকাস হওয়া উচিত শিল্পায়নে। তবে শিল্প স্থাপনের সময় ২টি বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত শিল্প যেন পরিবেশ ধ্বংস না করে। দ্বিতীয়ত কৃষি জমি যেন নির্বিচারে শিল্পে ব্যবহার না করা হয়।
সরকারের শিল্প পরিচালনায় যুক্ত হওয়া উচিত নয়। সরকারের কাজ শিল্পের ফ্যাসিলিটেটর হওয়া। উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ও সমর্থন দেওয়া। বাংলাদেশে ইভিকে স্বাগতম। তরুণ শিল্পোদ্যোক্তাদের শুভেচ্ছা-তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। অটোমোবাইলসহ সম্ভাবনাময় শিল্প সেক্টরসমূহকে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশে ইভির যে সুযোগ সম্ভাবনা আছে তা কাজে লাগাতে হবে। ইভিই অটোমোবাইলের ভবিষ্যৎ। শিল্পে এগিয়ে যাক আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রাণের বাংলাদেশ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক, সাবেক চেয়ারম্যান বিটিএমসি