ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোট শেষ হয়েছে। এখন রাজ্যজুড়ে কেবল অপেক্ষা ফল ঘোষণার। কিন্তু ভোটগ্রহণ শেষ মানেই রাজনৈতিক উত্তাপ শেষ, এমনটা কখনও হয় না। বরং অনেক সময় ভোটের পরের সময়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজনীতির ময়দানে লড়াই সরে গিয়ে শুরু হয় ব্যাখ্যার লড়াই—মানুষ কী ভাবল, কার বিরুদ্ধে রাগ জমল, কে সেই রাগকে ভোটে পরিণত করতে পারল, আর কে পারল না।
এবারও ঠিক সেই ছবিই দেখা যাচ্ছে। মোড়ের মাথায় চায়ের দোকান, বাজার, লোকাল ট্রেনে, অফিসপাড়ায়, এমনকী ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের গ্রুপেও একটাই প্রশ্ন ঘুরছে: বাংলায় কি সত্যিই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে? নাকি আবারও শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসই সরকার গড়বে?
এবার শাসকদলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ সত্যিই অনেক বেশি। প্রায় পনেরো বছরের শাসনের পরে তৃণমূলকে ঘিরে ক্লান্তি যে তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। দুর্নীতির অভিযোগ, শিক্ষক নিয়োগ থেকে সরকারি চাকরির কেলেঙ্কারি, স্থানীয় স্তরে কাটমানি, পঞ্চায়েতের দাদাগিরি, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব—এই সব বিষয় গত কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। ভোটের আগে বহু জায়গায় শোনা গিয়েছে, ‘সরকারকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার’।
কিন্তু রাজনীতি এত সরল অঙ্কে চলে না যে শাসকের বিরুদ্ধে রাগ মানেই বিরোধীর পক্ষে ভোটের ঢেউ উপচে পড়বে। এখানে বলতেই হয়, তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যতটা গভীর, বিজেপির প্রতি আস্থা ততটা দৃঢ় নয়। অনেক ভোটারই সরকারকে শিক্ষা দিতে চাইলেও, তার জন্য বিজেপিকেই ভরসা করে ভোট দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে এখনও অনেকের মনে দ্বিধা আছে।
এই দ্বিধার কারণ শুধু দলীয় সংগঠনের ঘাটতি নয়, তার চেয়েও বড় বিষয় আবেগগত দূরত্ব। বিজেপি বাংলায় এখনও সেই রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করতে পারেনি, যা বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়। বাংলার ভোটার শুধু উন্নয়ন বা দুর্নীতি দিয়ে ভোট বিচার করেন না; তাঁরা দেখেন ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মমর্যাদা, দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক, এবং বাংলাকে কে কতটা বোঝে। এই জায়গায় বিজেপির জাতীয়তাবাদী, হিন্দি-হিন্দুত্ব নির্ভর প্রচারভাষা বহু শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত ভোটারের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিরক্তি থাকলেও বিজেপিকে নিয়ে সেই মানসিক নিশ্চিন্ততা তৈরি হয়নি।
সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ির পর্যবেক্ষণও মূলত এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। তিনি বলছেন, আমার মনে হয়, তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ থাকলেও বিজেপির প্রতি সরকার গড়ার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন নেই৷ বিজেপিকে সরকারে আসতে হলে দক্ষিণবঙ্গে খুবই ভালো ফল করতে হবে৷ বিশেষত দুই ২৪ পরগনা এবং কলকাতায়৷ সেটা যথেষ্ট কঠিন৷
অর্ক ভাদুড়ির এই কথার মধ্যেই কোন কোন এলাকার ফল এই নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেই বাস্তব ছবিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গের বহু আসনে বিজেপির প্রভাব থাকলেও কেবল সেই ভরসায় সরকার গড়া সম্ভব নয়। ক্ষমতায় আসতে গেলে দক্ষিণবঙ্গের জনবহুল এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি ভাঙতেই হবে। কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান—এই সব এলাকায় বিজেপি যদি বড় সাফল্য না পায়, তাহলে বাংলায় সরকার গড়ার হিসেব মেলানো তাদের পক্ষে কঠিন হবে। আর এই অঞ্চলগুলিতেই বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন রয়েছে।
অর্ক ভাদুড়ি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে আঙুল তুলেছেন, এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা সংক্রান্ত বিতর্ক। তাঁর কথায়, এসআইআর সংক্রান্ত হয়রানির যথেষ্ট প্রভাব পড়বে। বস্তুত এই নির্বাচনে প্রধান ইস্যু এসআইআর৷ বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দিয়েছেন৷ সেই ভোটের একাংশ যেমন তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট, তেমনই আরেক অংশ নিশ্চিতভাবে এসআইআর সংক্রান্ত হয়রানির বিরুদ্ধে ভোট, নাগরিকত্ব বাঁচানোর উদ্বেগ থেকে দেওয়া ভোট৷ এই ভোট বিজেপির পক্ষে যাওয়া কঠিন।
এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিজেপি যেখানে নির্বাচনকে শাসকবিরোধী রায়ে পরিণত করতে চাইছিল, সেখানে তৃণমূল কৌশলে ভোটার তালিকা সংশোধন, নাম বাদ পড়া, নাগরিক পরিচয় নিয়ে সন্দেহ—এই সব আশঙ্কাকে ‘অস্তিত্বের প্রশ্ন’ হিসেবে সামনে আনে। বহু সাধারণ ভোটার, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয় যে নাগরিক অধিকার নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
সাংবাদিক সম্বিত পালের বিশ্লেষণ এই কথাকেই আরেকভাবে সামনে আনে। তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এবারের নির্বাচনে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কোনো হাওয়া প্রথম দফার ভোট গ্রহণ পর্যন্ত ছিল না। গত কয়েক মাস ধরে এসআইআর একমাত্র ইস্যু ছিল পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে।
অর্থাৎ জনঅসন্তোষ থাকলেও তা শুরু থেকেই একমুখী শাসকবিরোধী ঢেউ হয়ে ওঠেনি। বরং ভোটের আবহে নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার, নাম বাদ পড়া, প্রশাসনিক হয়রানি—এই সব উদ্বেগ জায়গা দখল করে নেয়। সম্বিত পালের মতে, তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে এবং সংখ্যালঘু বিদ্বেষী হিন্দুদের পুরনো রাগ দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগে জাগিয়ে তোলা হয়েছে। শুধু সেই রাগ দিয়ে ১৪৮ আসন বিজেপির পক্ষে পাওয়া একটু কষ্টকর।
এই কথাতেই বিজেপির লড়াইয়ের বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিজেপি শেষ মুহূর্তে তৃণমূলের দুর্নীতি, হিন্দু মেরুকরণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা—সব একসঙ্গে জোরদার করলেও সেটা ভোটের সার্বিক মেজাজ দখল করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ ভোটারের মন ইতোমধ্যেই নানা স্তরে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একদিকে ক্ষোভ, অন্যদিকে ভয়; একদিকে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে অচেনা বিকল্প নিয়ে সংশয়।
সম্বিত পাল আরও নির্দিষ্টভাবে বলেন, ক্ষমতায় আসতে গেলে বিজেপিকে দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে তৃণমূলের শক্ত দুর্গকে ভাঙতে হবে। দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, কলকাতা, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান মিলিয়ে প্রায় ১০০টি আসন এবং মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর মিলিয়ে প্রায় ৪০টি আসনে খুব ভাল ফল করতে হবে বিজেপিকে।
এই বক্তব্য আসলে জানিয়ে দেয়, যেসব এলাকায় তৃণমূলের সংগঠন খুব শক্ত, মহিলা ভোট অনেকটাই তাদের দিকে, আর স্থানীয় নেতারাও সক্রিয় সেখানে বিজেপি এখনও পুরোপুরি জায়গা করে নিতে পারেনি।
তার ওপর রয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রশ্ন। একশো দিনের কাজ, আবাস যোজনা, গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প, কেন্দ্র-রাজ্য আর্থিক সংঘাত—এসব নিয়েও মানুষের ক্ষোভ আছে। কিন্তু সেই ক্ষোভ কেবল নবান্নমুখী নয়, অনেক ক্ষেত্রেই দিল্লিমুখীও। বহু গ্রামীণ পরিবার মনে করেছে, কেন্দ্রীয় বরাদ্দ আটকে দিয়ে বাংলাকে চাপের মধ্যে রাখা হচ্ছে। ফলে বিজেপি কেন্দ্রের দল হওয়ায় তাদেরও দায় এড়ানো কঠিন হয়েছে। তৃণমূলের দুর্বলতা বিজেপির সরাসরি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি।
এখানেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুমন কল্যাণ মৌলিক ভরসার প্রশ্নটিকে সামনে আনছেন। তাঁর কথায়, রাজনীতিতে ভরসা একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। আর তারজন্য সমস্ত দল, বিশেষ করে তাদের অগ্রগণ্য নেতৃত্ব তাঁদের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার সঙ্গে ভরসাকে যুক্ত করেন।
এই নির্বাচনেও বিজেপি বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—মাসে তিন হাজার টাকা সহায়তা, যুবশক্তির জন্য আর্থিক প্রকল্প, কেন্দ্রীয় হারে ডিএ, স্বাস্থ্যসাথীর বিকল্প আয়ুষ্মান ভারত, দ্রুত পে কমিশন। কিন্তু সুমন কল্যাণ মৌলিক মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মানুষ যাতে ভরসা করে তারজন্য একের পর এক প্রচারসভায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী একে মোদির গ্যারান্টি বলে অভিহিত করেছেন। সমস্যাটা হলো, আর্থিক প্রশ্নে মোদির প্রতিশ্রুতি মানুষকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না।
কেন দেয় না? কারণ তাঁর মতে অতীতের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, মোদি জমানা শুরু হওয়ার সময় প্রত্যেক ভারতবাসীর অ্যাকাউন্টে বিদেশ থেকে উদ্ধার করে আনা টাকার অংশ হিসাবে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। নির্বাচনে জয়লাভের কিছুদিন পরে সেটিকে বিজেপি নেতৃত্ব নিজেরাই ‘জুমলা’ বলে স্বীকার করেন। তখন সেটা হাসির খোরাক হয়ে যায়।
অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি যত বড়ই হোক, ভোটার এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি হিসেবি। বিশেষ করে নগদ সহায়তা বা বিভিন্ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে তারা অন্য রাজ্যের অভিজ্ঞতাও দেখছেন। সুমন কল্যাণ মৌলিক সেই কারণেই বলেন, লক্ষীর ভান্ডারের বিকল্প হিসাবে তিন হাজার টাকার বিষয়টা প্রথমে চমক সৃষ্টি করলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা লোককে চিন্তিত করে তোলে। মহারাষ্ট্রে এই প্রকল্প শুরুর তিন মাসের মধ্যে একটা বড় অংশের গ্রহীতার নাম বাদ দেওয়া, বিহারে এককালীন টাকা দিয়ে পরে অনেককে টাকা ফেরত দিতে বলা এবং দিল্লিতে নির্বাচনে জিতে আসার পর প্রকল্প চালু না করার বিষয়টা মহিলারা অবগত হয়েছেন।
এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তৃণমূলের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচগুলির একটি হলো মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী—এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে সরকার সরাসরি ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছে। দুর্নীতি বা স্থানীয় ক্ষোভ থাকলেও পরিবারের মহিলা সদস্যদের মধ্যে একটি আর্থিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। বিজেপি তার বিকল্প প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই ভরসা আদায় করা সহজ নয়।
তবে সুমন কল্যাণ মৌলিক একতরফা ছবি আঁকছেন না। তিনি মনে করিয়ে দেন, রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকরা যাঁরা ডিএ-র প্রশ্নে অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ এবং দীর্ঘ দিন আইনি ও রাস্তার লড়াইয়ে আছেন তাঁদের কাছে বিজেপির কেন্দ্রীয় হারে ডিএ এবং পঁয়তাল্লিশ দিনের মধ্যে পে কমিশন আশার সৃষ্টি করেছে।
অর্থাৎ অসন্তুষ্টির কিছু সুসংগঠিত ক্ষেত্র বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু সেখানেও দ্বিধা রয়ে গিয়েছে। তাঁর কথায়, আবার একই সঙ্গে ত্রিপুরায় ক্ষমতায় আসার পর সরকারি কর্মচারীদের পেনশন তুলে দেওয়া নিয়ে কর্মচারী মহলে আশঙ্কাও কম নেই।
মানুষের রাগ আছে, বদলও চাইছে, কিন্তু কাকে ভরসা করবে তা নিয়ে এখনও পুরো নিশ্চিন্ত নয়।
রেকর্ড ভোটদান নিয়েও তাই একরৈখিক ব্যাখ্যা করা কঠিন। বেশি ভোট পড়েছে মানেই শাসকবিরোধী ঝড়, এই ধারণা বিজেপি প্রচার করছে। কিন্তু তৃণমূলও বলছে, বেশি ভোট তাদের সমর্থনে পড়ছে। বিশেষ করে মহিলা, সংখ্যালঘু, গ্রামের গরিব মানুষ এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা বেশি সংখ্যায় ভোট দেওয়ায় শাসকদল ভরসা পাচ্ছে। ফলে ভোটের হার দিয়ে সরাসরি সরকার বদলের ভবিষ্যদ্বাণী করা যাচ্ছে না।
এখন ফল যা-ই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলার ভোটাররা তৃণমূলকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, কিন্তু বিজেপিকে নিঃশর্ত অনুমোদন দিয়েছেন কি না, তার উত্তর এখনও ধোঁয়াশায়।