লেখা:

দুই সপ্তাহ ধরে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলছে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, এমন বয়ান বা ন্যারেটিভ বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে পাল্টা আঘাত হানছে। তেলের দাম আকাশচুম্বী এবং মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকেই এগোচ্ছে। মার্কিন সিনেটররা এই অভিযানকে ‘ভয়াবহ ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা বারবার সতর্ক করছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের তথা সারা বিশ্বের অর্থনীতির জন্যই বিপদ ডেকে আনবে।
কিন্তু এই সমালোচনা কিংবা বিশ্লেষণে সূক্ষ্ম কিন্তু উল্লেখযোগ্য ভুল আছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে সমালোচকদের বিশ্লেষণে ভুল নেই। ভুল আছে মূলত সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠিতে। সমালোচকরা কেবল হামলার আর্থিক মূল্য বা ব্যয়ের তালিকা তৈরি করছেন, কিন্তু এর 'কৌশলগত খতিয়ান' বা স্ট্র্যাটেজিক লেজার উপেক্ষা করছেন।
ইরানের ক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইল, পারমাণবিক অবকাঠামো, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌবাহিনী এবং প্রক্সি কমান্ড কাঠামোর বর্তমান অবস্থার দিকে তাকান, তবে এই হামলাকে ব্যর্থ বলা যাবে না। এই অভিযান সুশৃঙ্খল ও পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘হুমকি’কে দুর্বল করে দিয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে গড়া অস্ত্রভান্ডার, কয়েক দিনেই চূর্ণ
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণের সংখ্যা ছিল ৩৫০টি, ১৪ মার্চের মধ্যে তা ৯০ শতাংশ কমে মাত্র ২৫টিতে নেমে এসেছে। ড্রোন উৎক্ষেপণের চিত্রও একই: প্রথম দিনে যা ছিল ৮০০-র বেশি, ১৫তম দিনে তা নেমে এসেছে ৭৫-এ।
মার্কিন এবং ইরানি সামরিক বিবৃতির তথ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও উভয়েই এই নিম্নমুখী প্রবণতার বিষয়ে একমত। ইরানের শত শত মিসাইল লঞ্চার অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। কিছু রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসরায়েলে আঘাত হানতে পারে ইরানের এমন সক্ষমতার ৮০ শতাংশই নির্মূল করা হয়েছে।
ইরানের নৌ-সম্পদ, দ্রুতগামী আক্রমণযান (ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট), ছোট সাবমেরিন এবং মাইন বসানোর সক্ষমতাও ধ্বংস করা হচ্ছে। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের আকাশসীমায় নন-স্টিলথ বি-১ বোম্বার ওড়াচ্ছে।
এই অভিযানের প্রথম পর্যায়ে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ধ্বংস করা হয়েছে, তাদের কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং মিসাইল ও ড্রোন উৎক্ষেপণ অবকাঠামো দুর্বল করা হয়েছে। ২ মার্চের মধ্যেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড পশ্চিম ইরান ও তেহরানের আকাশসীমায় শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছে।
এখন চলমান দ্বিতীয় পর্যায়ে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বুনিয়াদি ভিত্তিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র এবং অস্ত্র মজুদের ভূগর্ভস্থ গুদাম। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা নিছক লক্ষ্যহীন বোমাবর্ষণ নয়, বরং ইরানের প্রতিরক্ষা যেন আবার ঘুরে দাঁড়াতে না পারে সেই পরিকল্পিত অভিযান।
ইরান প্রতিনিয়ত কৌশলগত দোটানায় পড়ছে। তারা যদি তাদের অবশিষ্ট মিসাইলগুলো ফায়ার করে, তবে তাদের লঞ্চারগুলোর অবস্থান প্রকাশ হয়ে যাবে এবং শত্রুর হাতে ধ্বংস হবে। আর যদি তারা সেগুলো রক্ষা করতে চায়, তবে যুদ্ধে ইসরায়েল বা আমেরিকার ওপর পাল্টা কোনো চাপ সৃষ্টি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করার সক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলবে।
মিসাইল ও ড্রোন লঞ্চের তথ্য নির্দেশ করছে, ইরান অবশিষ্ট সক্ষমতা নিয়মিত আক্রমণের জন্য নয় বরং কেবল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যবহারের জন্য জমিয়ে রাখছে।
পারমাণবিক সীমা
সামরিক অভিযানের যারা সমালোচনা করছেন, তারা মূলত যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি আর খরচের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। তাদের কথা শুনলে মনে হতে পারে, যুদ্ধ শুরুর আগের সময়টা বুঝি খুব শান্ত আর নিরাপদ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই সময় মোটেও ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। ইরান তখন দ্রুতগতিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছিল এবং শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তুলছিল।
২০২৬ সালের শুরুতে ইরানের কাছে ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ ছিল, যা আরও সমৃদ্ধ করলে অন্তত ১০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনের হামলার আগে তেহরান একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা থেকে মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে ছিল। সেই সময় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) স্বীকার করেছিল, ইরানের এই উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুদের পেছনে কোনো বেসামরিক যুক্তি নেই।
বর্তমান অভিযানে নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফোরদো স্থাপনা এখনো অকেজো হয়ে আছে। সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা শিল্প স্থাপনাগুলোকেও প্রতিনিয়ত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতিও হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত এই আলোচনা থেকে সরে এসেছিল কি না তা নিয়ে বৈধ প্রশ্ন আছে। কূটনৈতিক বিকল্প হাতে থাকা সত্ত্বেও হামলা করা নিয়ে যৌক্তিক কারণেই মানুষ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।
সমালোচকদের প্রস্তাবিত বিকল্প ব্যবস্থা অর্থাৎ সংযম প্রকাশ করে ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া। মজার ব্যাপার হলো, বর্তমান সংকট আসলে এই ধরনের সংযমের নীতি থেকেই জন্ম নিয়েছে। এই ‘কৌশলগত ধৈর্য’ (স্ট্র্যাটেজিক প্যাশেন্স) কেবল ইরানের সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা এবং ইউরেনিয়াম মজুদই বাড়িয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বাস্তব; হামলা চালিয়ে স্থাপনা ধ্বংস করা গেলেও জ্ঞান বা মেধা নির্মূল করা যায় না। এখনো সেই ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের পর ইরানে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা পারমাণবিক শক্তি অর্জনের ব্যাপারে আরও নিশ্চিত এবং যৌক্তিক অবস্থান পাবে।
হরমুজ প্রণালি: ইরানের ক্ষয়িষ্ণু তুরুপের তাস
সমালোচনায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। মার্কিন সিনেটর ক্রিস মার্ফি এই হামলাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ইরানের পাল্টা আঘাতের ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা হয়েছে। সিএনএন বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক আঘাত একটি বাস্তব ঘটনা। তেলের দাম বেড়েছে, বৈশ্বিক মজুত থেকে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়তে হবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে ড্রোন ও মিসাইল হামলার সম্মুখীন হচ্ছে।
কিন্তু এই প্রেক্ষাপট আসলে কৌশলগত যুক্তির বিপরীত। প্রণালি বন্ধ করা সবসময়ই ইরানের সবচেয়ে দৃশ্যমান তুরুপের তাস ছিল। কিন্তু এখন এই ক্ষমতা একটি 'ক্ষয়িষ্ণু সম্পদে’ পরিণত হয়েছে। ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই খার্গ দ্বীপ এবং এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
তেহরানের বৃহত্তম অবশিষ্ট অর্থনৈতিক অংশীদার চীনও ইরানি তেল পাবে না যদি এই প্রণালি বন্ধ থাকে। এই অবরোধ যতদিন চলবে, ইরান তত বেশি তার নিজের অর্থনৈতিক লাইফলাইন ধ্বংস করবে। পাশাপাশি জাতিসংঘে ইরানকে ক্রমাগত সুরক্ষা দিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকেও ক্ষুব্ধ করবে। এই অবরোধ কেবল বিশ্ব অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং খোদ ইরানের একাকিত্বকেও ত্বরান্বিত করছে।
এই অবরোধ টিকিয়ে রাখার জন্য ইরানের যে নৌ-সম্পদ প্রয়োজন—ফাস্ট অ্যাটাক বোট, ড্রোন, মাইন, উপকূলীয় জাহাজবিধ্বংসী মিসাইল তা প্রতিনিয়ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হচ্ছে। বন্দর আব্বাস ও চাবাহারে তাদের নৌ-ঘাঁটিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে কি না, এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো পুনরায় বন্ধ করার মতো কোনো নৌ-সক্ষমতা ইরানের অবশিষ্ট থাকবে কি না।
সমালোচকরা প্রতিদিন ১০০টি ট্যাঙ্কার পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়াকে অসম্ভব লজিস্টিক বোঝা বলছেন। কিন্তু শত্রুর যদি আক্রমণ করার ক্ষমতাই না থাকে, তবে ট্যাঙ্কার পাহারা দেওয়ার আর প্রয়োজন পড়বে না। অপারেশন এখন সেই পথেই এগোচ্ছে।
প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিস্তার নয়, বরং খণ্ড-বিখণ্ড
আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর হামলা, ইরাকি মিলিশিয়াদের মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ, লোহিত সাগরে হুতিদের হুমকি—এসবই যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, ইরাকের মতোই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, এই হামলা ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়া এবং তাদের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ (নির্দেশ কিংবা সহায়তা) দুর্বল করে দিচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যু এই ব্যবস্থার কেন্দ্রকে নির্মূল করেছে। তাঁর ছেলে মোজতাবাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির নয়, বরং ভঙ্গুরতার লক্ষণ। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কমান্ড কাঠামোও বিভিন্ন স্তরে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে; নিহতদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও ছিলেন।
ইরানের প্রক্সিরা অঞ্চলজুড়ে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এই হামলা প্রমাণ করে, কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থা যখন বুঝতে পারে যে তারা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা এই ধরনের এলোপাতাড়ি হামলা চালায়। এই ধরনের হামলা আসলে হতাশার চিহ্ন, শক্তির নয়। এর মানে হলো কেন্দ্র আর সমন্বয় করতে পারছে না। আক্রমণ চলবে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ক্রমেই সমন্বয়হীন, কৌশলগতভাবে অর্থহীন হয়ে পড়বে।
স্পষ্ট পরিণতি বা ‘এন্ডগেম’
সবচেয়ে জোরালো রাজনৈতিক সমালোচনা হলো, এই হামলার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো নির্দিষ্ট ‘এন্ডগেম’ বা পরিণতি নেই। ট্রাম্পের নিজস্ব বক্তব্যও এই ধারণাকে উসকে দিয়েছে: কখনও তিনি ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ’ বলছেন, আবার কখনও আলোচনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন; কখনও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছেন, আবার কখনও তা অস্বীকার করছেন। রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে ট্রাম্প তার লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু বক্তব্যের ধোঁয়াশা বাদ দিলেও সামরিক অভিযানের ধাপের দিকে তাকালে লক্ষ্য স্পষ্ট দেখা যায়। এর উদ্দেশ্য হলো—মিসাইল, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সীমান্তের বাইরে ইরানের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা।
একে বলা যেতে পারে ‘কৌশলগত নিরস্ত্রীকরণ’। তবে দখলদারত্ব ছাড়া কৌশলগত নিরস্ত্রীকরণ বজায় রাখতে যে কাঠামোর প্রয়োজন তা ইরানের ক্ষেত্রে এখনো কেউ প্রস্তাব করেনি।
কেউ তেহরান দখলের প্রস্তাব দিচ্ছে না। প্রশ্ন হলো বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়ার পর কী হবে? এখানে সিনেটর মার্ফিসহ অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানকে পুনরায় উৎপাদন (যেমন ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কার্যক্রম) শুরু করা থেকে কে থামাবে?
এর উত্তরের জন্য যুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামোর প্রয়োজন যা এখনো জনসমক্ষে আসেনি। ট্রাম্প প্রশাসনকে মার্কিন জনগণ ও আঞ্চলিক অংশীদারদের কাছে এই কাঠামোর স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তবে জনসমক্ষে কূটনৈতিক নীল নকশা নেই মানেই এই নয় যে সামরিক অভিযান ব্যর্থ হচ্ছে। এর মানে হলো অভিযান কূটনীতির চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে।
ইরানে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার নৈতিক দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বইতে হবে। তেলের দাম বাড়ার ফলে পৃথিবীর প্রত্যেক দেশই অল্প-বিস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই হতাহত ও ক্ষতিগুলো বাস্তব ও গুরুতর এবং যেকোনো বিশ্লেষণে এগুলো উপেক্ষা করা হবে অসততা।
কিন্তু সমালোচকরা দৃশ্যমান মূল্যকে বড় করে দেখছেন, কিন্তু নিষ্ক্রিয় কিংবা অদৃশ্য থাকা মূল্য যে কত বেশি হতে পারত তা ভাবছেন না। অভিযানের ১৭তম দিনে এসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মৃত, তার উত্তরসূরি আহত। ইরানের শক্তি প্রদর্শনের প্রতিটি প্রধান অস্ত্র—মিসাইল, পারমাণবিক স্থাপনা, আকাশ প্রতিরক্ষা, নৌবাহিনী এবং প্রক্সি কমান্ড নেটওয়ার্ক এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে নিকট ভবিষ্যতে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এই অভিযানের বাস্তবায়ন হয়তো নিখুঁত নয় এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনাও অপূর্ণ। তবে প্রকৃত সফলতা সংবাদপত্রের শিরোনামে নয় বরং সক্ষমতা ধ্বংসের মাপকাঠিতে পরিমাপ করা হয়।
লেখক: দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং ইউনিভার্সিটি অফ এক্সেটারের অনারারি রিসার্চ ফেলো।

দুই সপ্তাহ ধরে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলছে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, এমন বয়ান বা ন্যারেটিভ বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে পাল্টা আঘাত হানছে। তেলের দাম আকাশচুম্বী এবং মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকেই এগোচ্ছে। মার্কিন সিনেটররা এই অভিযানকে ‘ভয়াবহ ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা বারবার সতর্ক করছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের তথা সারা বিশ্বের অর্থনীতির জন্যই বিপদ ডেকে আনবে।
কিন্তু এই সমালোচনা কিংবা বিশ্লেষণে সূক্ষ্ম কিন্তু উল্লেখযোগ্য ভুল আছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে সমালোচকদের বিশ্লেষণে ভুল নেই। ভুল আছে মূলত সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠিতে। সমালোচকরা কেবল হামলার আর্থিক মূল্য বা ব্যয়ের তালিকা তৈরি করছেন, কিন্তু এর 'কৌশলগত খতিয়ান' বা স্ট্র্যাটেজিক লেজার উপেক্ষা করছেন।
ইরানের ক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইল, পারমাণবিক অবকাঠামো, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌবাহিনী এবং প্রক্সি কমান্ড কাঠামোর বর্তমান অবস্থার দিকে তাকান, তবে এই হামলাকে ব্যর্থ বলা যাবে না। এই অভিযান সুশৃঙ্খল ও পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘হুমকি’কে দুর্বল করে দিয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে গড়া অস্ত্রভান্ডার, কয়েক দিনেই চূর্ণ
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণের সংখ্যা ছিল ৩৫০টি, ১৪ মার্চের মধ্যে তা ৯০ শতাংশ কমে মাত্র ২৫টিতে নেমে এসেছে। ড্রোন উৎক্ষেপণের চিত্রও একই: প্রথম দিনে যা ছিল ৮০০-র বেশি, ১৫তম দিনে তা নেমে এসেছে ৭৫-এ।
মার্কিন এবং ইরানি সামরিক বিবৃতির তথ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও উভয়েই এই নিম্নমুখী প্রবণতার বিষয়ে একমত। ইরানের শত শত মিসাইল লঞ্চার অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। কিছু রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসরায়েলে আঘাত হানতে পারে ইরানের এমন সক্ষমতার ৮০ শতাংশই নির্মূল করা হয়েছে।
ইরানের নৌ-সম্পদ, দ্রুতগামী আক্রমণযান (ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট), ছোট সাবমেরিন এবং মাইন বসানোর সক্ষমতাও ধ্বংস করা হচ্ছে। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের আকাশসীমায় নন-স্টিলথ বি-১ বোম্বার ওড়াচ্ছে।
এই অভিযানের প্রথম পর্যায়ে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ধ্বংস করা হয়েছে, তাদের কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং মিসাইল ও ড্রোন উৎক্ষেপণ অবকাঠামো দুর্বল করা হয়েছে। ২ মার্চের মধ্যেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড পশ্চিম ইরান ও তেহরানের আকাশসীমায় শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছে।
এখন চলমান দ্বিতীয় পর্যায়ে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বুনিয়াদি ভিত্তিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র এবং অস্ত্র মজুদের ভূগর্ভস্থ গুদাম। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা নিছক লক্ষ্যহীন বোমাবর্ষণ নয়, বরং ইরানের প্রতিরক্ষা যেন আবার ঘুরে দাঁড়াতে না পারে সেই পরিকল্পিত অভিযান।
ইরান প্রতিনিয়ত কৌশলগত দোটানায় পড়ছে। তারা যদি তাদের অবশিষ্ট মিসাইলগুলো ফায়ার করে, তবে তাদের লঞ্চারগুলোর অবস্থান প্রকাশ হয়ে যাবে এবং শত্রুর হাতে ধ্বংস হবে। আর যদি তারা সেগুলো রক্ষা করতে চায়, তবে যুদ্ধে ইসরায়েল বা আমেরিকার ওপর পাল্টা কোনো চাপ সৃষ্টি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করার সক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলবে।
মিসাইল ও ড্রোন লঞ্চের তথ্য নির্দেশ করছে, ইরান অবশিষ্ট সক্ষমতা নিয়মিত আক্রমণের জন্য নয় বরং কেবল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যবহারের জন্য জমিয়ে রাখছে।
পারমাণবিক সীমা
সামরিক অভিযানের যারা সমালোচনা করছেন, তারা মূলত যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি আর খরচের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। তাদের কথা শুনলে মনে হতে পারে, যুদ্ধ শুরুর আগের সময়টা বুঝি খুব শান্ত আর নিরাপদ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই সময় মোটেও ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। ইরান তখন দ্রুতগতিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছিল এবং শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তুলছিল।
২০২৬ সালের শুরুতে ইরানের কাছে ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ ছিল, যা আরও সমৃদ্ধ করলে অন্তত ১০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনের হামলার আগে তেহরান একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা থেকে মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে ছিল। সেই সময় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) স্বীকার করেছিল, ইরানের এই উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুদের পেছনে কোনো বেসামরিক যুক্তি নেই।
বর্তমান অভিযানে নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফোরদো স্থাপনা এখনো অকেজো হয়ে আছে। সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা শিল্প স্থাপনাগুলোকেও প্রতিনিয়ত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতিও হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত এই আলোচনা থেকে সরে এসেছিল কি না তা নিয়ে বৈধ প্রশ্ন আছে। কূটনৈতিক বিকল্প হাতে থাকা সত্ত্বেও হামলা করা নিয়ে যৌক্তিক কারণেই মানুষ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।
সমালোচকদের প্রস্তাবিত বিকল্প ব্যবস্থা অর্থাৎ সংযম প্রকাশ করে ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া। মজার ব্যাপার হলো, বর্তমান সংকট আসলে এই ধরনের সংযমের নীতি থেকেই জন্ম নিয়েছে। এই ‘কৌশলগত ধৈর্য’ (স্ট্র্যাটেজিক প্যাশেন্স) কেবল ইরানের সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা এবং ইউরেনিয়াম মজুদই বাড়িয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বাস্তব; হামলা চালিয়ে স্থাপনা ধ্বংস করা গেলেও জ্ঞান বা মেধা নির্মূল করা যায় না। এখনো সেই ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের পর ইরানে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা পারমাণবিক শক্তি অর্জনের ব্যাপারে আরও নিশ্চিত এবং যৌক্তিক অবস্থান পাবে।
হরমুজ প্রণালি: ইরানের ক্ষয়িষ্ণু তুরুপের তাস
সমালোচনায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। মার্কিন সিনেটর ক্রিস মার্ফি এই হামলাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ইরানের পাল্টা আঘাতের ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা হয়েছে। সিএনএন বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক আঘাত একটি বাস্তব ঘটনা। তেলের দাম বেড়েছে, বৈশ্বিক মজুত থেকে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়তে হবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে ড্রোন ও মিসাইল হামলার সম্মুখীন হচ্ছে।
কিন্তু এই প্রেক্ষাপট আসলে কৌশলগত যুক্তির বিপরীত। প্রণালি বন্ধ করা সবসময়ই ইরানের সবচেয়ে দৃশ্যমান তুরুপের তাস ছিল। কিন্তু এখন এই ক্ষমতা একটি 'ক্ষয়িষ্ণু সম্পদে’ পরিণত হয়েছে। ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই খার্গ দ্বীপ এবং এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
তেহরানের বৃহত্তম অবশিষ্ট অর্থনৈতিক অংশীদার চীনও ইরানি তেল পাবে না যদি এই প্রণালি বন্ধ থাকে। এই অবরোধ যতদিন চলবে, ইরান তত বেশি তার নিজের অর্থনৈতিক লাইফলাইন ধ্বংস করবে। পাশাপাশি জাতিসংঘে ইরানকে ক্রমাগত সুরক্ষা দিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকেও ক্ষুব্ধ করবে। এই অবরোধ কেবল বিশ্ব অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং খোদ ইরানের একাকিত্বকেও ত্বরান্বিত করছে।
এই অবরোধ টিকিয়ে রাখার জন্য ইরানের যে নৌ-সম্পদ প্রয়োজন—ফাস্ট অ্যাটাক বোট, ড্রোন, মাইন, উপকূলীয় জাহাজবিধ্বংসী মিসাইল তা প্রতিনিয়ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হচ্ছে। বন্দর আব্বাস ও চাবাহারে তাদের নৌ-ঘাঁটিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে কি না, এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো পুনরায় বন্ধ করার মতো কোনো নৌ-সক্ষমতা ইরানের অবশিষ্ট থাকবে কি না।
সমালোচকরা প্রতিদিন ১০০টি ট্যাঙ্কার পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়াকে অসম্ভব লজিস্টিক বোঝা বলছেন। কিন্তু শত্রুর যদি আক্রমণ করার ক্ষমতাই না থাকে, তবে ট্যাঙ্কার পাহারা দেওয়ার আর প্রয়োজন পড়বে না। অপারেশন এখন সেই পথেই এগোচ্ছে।
প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিস্তার নয়, বরং খণ্ড-বিখণ্ড
আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর হামলা, ইরাকি মিলিশিয়াদের মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ, লোহিত সাগরে হুতিদের হুমকি—এসবই যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, ইরাকের মতোই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, এই হামলা ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়া এবং তাদের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ (নির্দেশ কিংবা সহায়তা) দুর্বল করে দিচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যু এই ব্যবস্থার কেন্দ্রকে নির্মূল করেছে। তাঁর ছেলে মোজতাবাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির নয়, বরং ভঙ্গুরতার লক্ষণ। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কমান্ড কাঠামোও বিভিন্ন স্তরে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে; নিহতদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও ছিলেন।
ইরানের প্রক্সিরা অঞ্চলজুড়ে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এই হামলা প্রমাণ করে, কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থা যখন বুঝতে পারে যে তারা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা এই ধরনের এলোপাতাড়ি হামলা চালায়। এই ধরনের হামলা আসলে হতাশার চিহ্ন, শক্তির নয়। এর মানে হলো কেন্দ্র আর সমন্বয় করতে পারছে না। আক্রমণ চলবে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ক্রমেই সমন্বয়হীন, কৌশলগতভাবে অর্থহীন হয়ে পড়বে।
স্পষ্ট পরিণতি বা ‘এন্ডগেম’
সবচেয়ে জোরালো রাজনৈতিক সমালোচনা হলো, এই হামলার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো নির্দিষ্ট ‘এন্ডগেম’ বা পরিণতি নেই। ট্রাম্পের নিজস্ব বক্তব্যও এই ধারণাকে উসকে দিয়েছে: কখনও তিনি ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ’ বলছেন, আবার কখনও আলোচনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন; কখনও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছেন, আবার কখনও তা অস্বীকার করছেন। রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে ট্রাম্প তার লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু বক্তব্যের ধোঁয়াশা বাদ দিলেও সামরিক অভিযানের ধাপের দিকে তাকালে লক্ষ্য স্পষ্ট দেখা যায়। এর উদ্দেশ্য হলো—মিসাইল, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সীমান্তের বাইরে ইরানের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা।
একে বলা যেতে পারে ‘কৌশলগত নিরস্ত্রীকরণ’। তবে দখলদারত্ব ছাড়া কৌশলগত নিরস্ত্রীকরণ বজায় রাখতে যে কাঠামোর প্রয়োজন তা ইরানের ক্ষেত্রে এখনো কেউ প্রস্তাব করেনি।
কেউ তেহরান দখলের প্রস্তাব দিচ্ছে না। প্রশ্ন হলো বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়ার পর কী হবে? এখানে সিনেটর মার্ফিসহ অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানকে পুনরায় উৎপাদন (যেমন ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কার্যক্রম) শুরু করা থেকে কে থামাবে?
এর উত্তরের জন্য যুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামোর প্রয়োজন যা এখনো জনসমক্ষে আসেনি। ট্রাম্প প্রশাসনকে মার্কিন জনগণ ও আঞ্চলিক অংশীদারদের কাছে এই কাঠামোর স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তবে জনসমক্ষে কূটনৈতিক নীল নকশা নেই মানেই এই নয় যে সামরিক অভিযান ব্যর্থ হচ্ছে। এর মানে হলো অভিযান কূটনীতির চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে।
ইরানে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার নৈতিক দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বইতে হবে। তেলের দাম বাড়ার ফলে পৃথিবীর প্রত্যেক দেশই অল্প-বিস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই হতাহত ও ক্ষতিগুলো বাস্তব ও গুরুতর এবং যেকোনো বিশ্লেষণে এগুলো উপেক্ষা করা হবে অসততা।
কিন্তু সমালোচকরা দৃশ্যমান মূল্যকে বড় করে দেখছেন, কিন্তু নিষ্ক্রিয় কিংবা অদৃশ্য থাকা মূল্য যে কত বেশি হতে পারত তা ভাবছেন না। অভিযানের ১৭তম দিনে এসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মৃত, তার উত্তরসূরি আহত। ইরানের শক্তি প্রদর্শনের প্রতিটি প্রধান অস্ত্র—মিসাইল, পারমাণবিক স্থাপনা, আকাশ প্রতিরক্ষা, নৌবাহিনী এবং প্রক্সি কমান্ড নেটওয়ার্ক এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে নিকট ভবিষ্যতে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এই অভিযানের বাস্তবায়ন হয়তো নিখুঁত নয় এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনাও অপূর্ণ। তবে প্রকৃত সফলতা সংবাদপত্রের শিরোনামে নয় বরং সক্ষমতা ধ্বংসের মাপকাঠিতে পরিমাপ করা হয়।
লেখক: দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং ইউনিভার্সিটি অফ এক্সেটারের অনারারি রিসার্চ ফেলো।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদের এক বৈঠকেও হামলা করেছিল। ওই হামলা দেশটির নেতৃত্ব হস্তান্তরের দীর্ঘদিনের আলোচনাকে হঠাৎ জরুরি অবস্থায় ঠেলে দেয়।
১১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে যদি সঠিকভাবে জাকাত আদায় ও বণ্টন করা যায়, তাহলে মাত্র সাত থেকে দশ বছরের মধ্যেই দেশ থেকে দারিদ্র্য অনেকটাই দূর করা সম্ভব। এটি কোনো কল্পনা নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত হিসাব। বাংলাদেশে জাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ বিদ্যমান রয়েছে, কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ প্রায় দেখা যায় না।
১ দিন আগে
পারস্য উপসাগরজুড়ে যুদ্ধের দামামার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথম ধাক্কা এসে লেগেছে তেলের বাজারে। তবে এর সুদূরপ্রসারী ধাক্কা হয়তো বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার মূলে আঘাত হানবে। গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে আন্তর্জাতিক আর্থিক শৃঙ্খলা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের অলিখিত চুক্তির ওপর টিকে আছে।
১ দিন আগে
খাল খনন কর্মসূচির এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি এর বাস্তবায়নে চরম পেশাদারত্বের পরিচয় দিতে হবে। খাল খননের পূর্বশর্ত হিসেবে হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে ও সারফেস ওয়াটার ডিস্ট্রিবিউশনের ওপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ 'মাস্টার প্ল্যান' প্রণয়ন করতে হবে।
২ দিন আগে