পশ্চিমবঙ্গের পশু জবাই নিয়ে কড়াকড়ি কি বাংলাদেশের সীমান্তে চামড়া চোরাচালান বাড়াবে

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ২০: ১২
স্ট্রিম গ্রাফিক

র‍্যাডক্লিফ লাইনের দুই পারে এখন একই সুতোয় বাঁধা দুটি সংকট। একদিকে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে জারি হওয়া পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ বিধি, অন্যদিকে বাংলাদেশের ধুঁকতে থাকা চামড়াশিল্প। সাদা চোখে এ দুটি সমস্যা দেখতে আলাদা মনে হলেও আদতে এরা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে প্রশ্ন কেবল কাঁটাতারের এপার-ওপারের নয়। প্রশ্ন হলো একটি দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত কীভাবে আরেকটি দেশের শিল্প, জীবিকা এবং চোরাচালানের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে কী ঘটছে

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়, এবং কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৫০ সালের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন নতুন করে প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। নবান্নের জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সি এবং সুস্থ বা প্রজননক্ষম গরু জবাই করা যাবে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে পশুকল্যাণের একটি সাধারণ পদক্ষেপ এটি। কিন্তু এর অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে এ রাজ্যের চর্মশিল্পে, যা ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বানতলা লেদার কমপ্লেক্স আজ ভারতের চামড়াশিল্পের একটি আন্তর্জাতিক মডেল। পরিবেশগত মান বজায় রেখে 'লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ' বা এলডব্লিউজি সনদ অর্জন করে বানতলা ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিশ্বস্ত সরবরাহকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে।

এখন এ শিল্পের কাঁচামাল হচ্ছে চামড়া, এবং উন্নতমানের চামড়া মেলে তুলনামূলক কম বয়সী গরু থেকে। নতুন বিধি কার্যকরের পরে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি কার্যত বন্ধই। ফলে, বাজারে উন্নতমানের কাঁচা চামড়ার সরবরাহ কমে যাবে এবং বানতলার কারখানাগুলো কাঁচামালের তীব্র সংকটে পড়বে। ১৪ বছরের বেশি বয়সি পশুর চামড়া নিম্নমানের, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গের ট্যানারিগুলো বিকল্প কাঁচামালের খোঁজে মরিয়া হয়ে উঠবে। আর কোথায় আছে সেই কাঁচামাল? সীমান্তের ওপারে, বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে প্রায় ১৬০টি ট্যানারি থাকলেও এলডাব্লিউজি সনদ পাওয়া কমপ্লায়েন্ট ট্যানারি আছে মাত্র আটটি। পাকিস্তানে এই সনদ পাওয়া ট্যানারির সংখ্যা ৫৬, ভারতে ২৪১, চীনে ২২টি, তাইওয়ানে ১৬, ভিয়েতনামে ২৪ এবং ইন্দোনেশিয়া ২১। নাইকি, অ্যাডিডাস বা এইচঅ্যান্ডএমের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো পরিবেশগত মানদণ্ড না মানা কারখানা থেকে পণ্য কেনে না।

বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের সম্ভাবনা ও সংকট

সোনালি আঁশ, পাটের সোনালি দিন হারিয়ে যাওয়ার পরে বাংলাদেশের নতুন সোনালি সম্পদের সম্পাদনা দেখা গিয়েছিল চামড়ার মধ্যে। বিশ্বের অন্যতম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে প্রতি বছর কোরবানির ঈদে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে গবাদি পশু জবাই হয়। এই একটিমাত্র উৎসব থেকেই দেশের বার্ষিক চাহিদার অর্ধেকের বেশি কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয়। অন্যদিকে, এই বিশাল সম্পদকে কাজে লাগানোর পরিকাঠামো এখনও দুঃখজনকভাবে অপ্রস্তুত।

নব্বইয়ের দশকে পাটশিল্পের পতনের পর নীতিনির্ধারকেরা চামড়াশিল্পকে পরবর্তী 'সোনালি আঁশ' হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল ২০৩০ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও অধরা। পরিবেশ আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগের পুরনো ট্যানারি পাড়া সরিয়ে সাভারে নতুন চামড়া শিল্পনগরীও গড়া হয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। এই একটি ব্যর্থতাই পুরো শিল্পের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।

এলডব্লিউজি সনদ আজকের আন্তর্জাতিক চামড়া বাজারে প্রবেশের প্রায় অপরিহার্য শর্ত। বাংলাদেশে প্রায় ১৬০টি ট্যানারি থাকলেও এলডাব্লিউজি সনদ পাওয়া কমপ্লায়েন্ট ট্যানারি আছে মাত্র আটটি। পাকিস্তানে এই সনদ পাওয়া ট্যানারির সংখ্যা ৫৬, ভারতে ২৪১, চীনে ২২টি, তাইওয়ানে ১৬, ভিয়েতনামে ২৪ এবং ইন্দোনেশিয়া ২১। নাইকি, অ্যাডিডাস বা এইচঅ্যান্ডএমের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো পরিবেশগত মানদণ্ড না মানা কারখানা থেকে পণ্য কেনে না। সাভারের অধিকাংশ ট্যানারি এই সনদ পায়নি বলে তাদের কাছে ইউরোপ বা আমেরিকার বাজারের দরজা বন্ধ। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ট্যানারিগুলো সেই একই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়েছে এবং প্রিমিয়াম মূল্যে পণ্য বিক্রি করছে। যে অর্ডারগুলো বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো ক্রমশ চলে যাচ্ছে কলকাতায়।

মূল্যের ব্যবধান এবং চোরাচালানের রাজনৈতিক অর্থনীতি

অর্থনীতির ক্ষেত্রে এটা ধ্রুব যে দামের হেরফের ঘটলে সেখানে বৈধ পথে সম্ভব না হলে অবৈধ পথে হলেও ব্যবসাবাণিজ্য চলতে থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পরে পাটশিল্পের ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় এমনটিই ঘটেছিল। কলকাতাকেন্দ্রিক পাটকলে কাঁচামালের উৎস পূর্ববাংলা রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় কাঁচাপাটের চোরাচালান ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল।

চামড়াশিল্পের ক্ষেত্রেও বর্তমানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের চামড়া বাজারের মধ্যে এমনটাই দেখা যাচ্ছে।

কোরবানির ঈদের আগে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর চামড়ার সরকারি মূল্য ঘোষণা করে। দেখা যায়, এই মূল্য প্রায়শই আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক নিচে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বাজারে যদি কাঁচা চামড়ার দাম বর্গফুটের এক ডলারেরও নিচে থাকে, আর পশ্চিমবঙ্গের বাজারে সেই একই মানের চামড়ার দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়, তাহলে চোরাচালানের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক। আইন দিয়ে, বিজিবি দিয়ে, কাঁটাতার দিয়ে এই অর্থনৈতিক মাধ্যাকর্ষণকে ঠেকানো কতটুকুই বা সম্ভব!

পশ্চিমবঙ্গের নতুন পশু জবাই বিধির কারণে রাজ্যের অভ্যন্তরে কাঁচা চামড়ার সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে বানতলা-সহ পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত ট্যানারির কাঁচামালের চাহিদা আরও বাড়বে। এই বর্ধিত চাহিদা মেটাতে গিয়ে সীমান্তের দুই পারের ফড়িয়া ও সিন্ডিকেটগুলো আরও সক্রিয় হবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের আইনি কড়াকড়ি বাস্তবে বাংলাদেশ থেকে চামড়া পাচারের নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এটি একটি গুরুতর এবং এখন পর্যন্ত অনেকটাই অনালোচিত ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি।

একটি গরুর চামড়া ছাড়ানো থেকে শুরু করে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা পর্যন্ত যা খরচ হয়, আড়তে সেই চামড়া বিক্রি করে সেই খরচটুকুও ওঠে না। লবণের দাম বেড়েছে, আর ট্যানারি মালিকদের কাছে বছরের পর বছর পড়ে আছে মাদ্রাসার বকেয়া টাকা। ফলে কোরবানির ঈদের পর মাঠে মাঠে পড়ে থাকতে দেখা যায় শত শত চামড়া।

সাভার বনাম বানতলা: দুই প্রকল্পের দুই ভাগ্য

সাভার চামড়া শিল্পনগরী এবং কলকাতার বানতলা লেদার কমপ্লেক্স, এ দুই প্রকল্পের ইতিহাস পাশাপাশি রেখে পড়লে বাংলাদেশের ব্যর্থতার কারণগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বানতলা প্রকল্পও শুরু হয়েছিল পুরনো ট্যানারি পাড়াকে পরিবেশবান্ধব কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে। বানতলার পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের বদলে পেশাদার কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বেশি ছিল এবং পরিবেশগত অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রতি সত্যিকারের মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে বানতলা আজ এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত একটি আন্তর্জাতিক মানের শিল্পকেন্দ্র। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ব্র্যান্ডগুলো বানতলার কারখানাকে তাদের সাপ্লাই চেইনে যুক্ত করেছে।

সাভারের গল্পটি ঠিক উল্টো। আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে আনার পর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। বুড়িগঙ্গাকে দূষণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সরিয়ে আনা হলেও, এখন দুষণের শিকার হচ্ছে ধলেশ্বরী। ফলাফল? একদিকে পরিবেশ দূষণ অব্যাহত, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সনদ থেকে বঞ্চনা। বিশ্ববাজারের যে প্রিমিয়াম অর্ডারগুলো বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো অবলীলায় চলে যাচ্ছে বানতলায়।

কোরবানির চামড়ার নির্মম পরিণতি

বাংলাদেশের চামড়া সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো এর সামাজিক পরিণতি। ঐতিহাসিকভাবে কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ ছিল দেশের কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর আয়ের একটি উৎস। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এ চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

একটি গরুর চামড়া ছাড়ানো থেকে শুরু করে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা পর্যন্ত যা খরচ হয়, আড়তে সেই চামড়া বিক্রি করে সেই খরচটুকুও ওঠে না। লবণের দাম বেড়েছে, আর ট্যানারি মালিকদের কাছে বছরের পর বছর পড়ে আছে মাদ্রাসার বকেয়া টাকা। ফলে কোরবানির ঈদের পর মাঠে মাঠে পড়ে থাকতে দেখা যায় শত শত চামড়া। বর্তমান পরিণতি কোথাও রাস্তায় ফেলা, কোথাও মাটিতে পুঁতে দেওয়া। যে সম্পদ ইসলামি বিধানে দুঃস্থ ও এতিমদের হকের অংশ, তা আজ নর্দমায় পচছে। এর চেয়ে বড় জাতীয় অপচয় আর কী হতে পারে?

পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিধির ফলে যদি সীমান্তের ওপারে কাঁচা চামড়ার চাহিদা বাড়ে, তাহলে এই অবহেলিত সম্পদের একটি অংশ চোরাচালানিদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। তখন এতিমের হক শুধু ট্যানারি সিন্ডিকেটের কারণেই মারা যাবে না, যোগ হবে সীমান্তের চোরাচালানিদের মুনাফাও।

পাটকে একসময় বলা হতো বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। সেই সোনালি আঁশ কীভাবে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক অযোগ্যতার শিকার হয়ে আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে, সেই গল্প আমাদের সবার জানা। চামড়াশিল্প এখন একই পথে হাঁটছে কি না, সেই প্রশ্ন আজ গুরুত্বের সাথে তুলতে হবে।

চীনের সুযোগ এবং বাংলাদেশের অসহায়ত্ব

ইউরোপ ও আমেরিকার দরজা যখন এলডব্লিউজি সনদের অভাবে বন্ধ, তখন বাংলাদেশ চামড়া বিক্রির জন্য একমাত্র ক্রেতা হিসেবে চীনের দিকে মুখ ফেরাতে বাধ্য হয়ে পড়ে। এই অসহায়ত্বের সুযোগ চীন নিচ্ছে। তারা বাংলাদেশের কাঁচা চামড়া 'ডাম্পিং' মূল্যে কিনে নিচ্ছে এবং নিজের দেশে প্রক্রিয়া করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে বাংলাদেশের কাছেই।

জাতীয় আমদানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ১ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য আমদানি করা হয়। পরবর্তী ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এই আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকায়। আর ২০২৪–২৫ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ছয় মাসে প্রায় ৯৭৬ কোটি টাকার চামড়াপণ্য আমদানি হয়েছে।

এই চিত্রটির সাথে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি তুলনা করলে বোঝা যায়, ভারত বানতলার মাধ্যমে একই কাজটি আরও কৌশলে করছে। তারা নিজেরাই কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে প্রিমিয়াম মূল্যে বিক্রি করছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে কাঁচামালের সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশের চামড়া পাচার হয়ে সেই শূন্যস্থান পূরণ করার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সমাধান কোথায়

এই জটিল সংকটের সমাধান কেবল সরকারি মূল্য নির্ধারণ বা লবণ আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন একটি কাঠামোগত পরিবর্তন।

প্রথমত, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি কার্যকর করার বিষয়টি এখন আর পরিকল্পনার স্তরে থাকলে চলবে না। এলডব্লিউজি সনদ অর্জন করতে পারলেই ইউরোপ-আমেরিকার বাজার খুলবে। ফলে চামড়ার দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছাবে।

দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলভাবে কাজে লাগাতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনের মতো বাটিক প্রিন্ট বা হাতে তৈরি চামড়াজাত পণ্য উচ্চমূল্যে বিশ্ববাজারে বিক্রি হয়। বাংলাদেশেও এই সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বিসিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামোর দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর পার করছে।

তৃতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের নতুন পশু জবাই বিধির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক ও সীমান্তে সতর্ক ও কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। সীমান্ত বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে চোরাচালানের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

পাটকে একসময় বলা হতো বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। সেই সোনালি আঁশ কীভাবে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক অযোগ্যতার শিকার হয়ে আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে, সেই গল্প আমাদের সবার জানা। চামড়াশিল্প এখন একই পথে হাঁটছে কি না, সেই প্রশ্ন আজ গুরুত্বের সাথে তুলতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণের নতুন বিধি একটি আইনি ও সামাজিক প্রশ্নের পাশাপাশি একটি ভূরাজনৈতিক সুযোগও। যদি বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সাভারের সিইটিপি সক্রিয় করে এলডব্লিউজি সনদ অর্জন করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মূল্যে চামড়া বিক্রির পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের কাঁচামালের সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বাড়তি রপ্তানির সুযোগ হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে, তাতে আশঙ্কা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা বাড়লে বাংলাদেশের চামড়া চোরাচালানের পথে সেই চাহিদা মেটাবে, আর দেশের সম্পদ আবার বিদেশে পাচার হবে।

সম্পর্কিত