মিয়ারশাইমারের তত্ত্বে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি: কেন ভেঙে পড়ে পরাশক্তির সমঝোতা

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৮: ৫৯
এআই জেনারেটেড ছবি

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রভাবশালী তত্ত্ববিদ জন জে মিয়ারশাইমারের অফেনসিভ রিয়ালিজম ব্যাখ্যা করে কেন দীর্ঘ ও সতর্ক কূটনৈতিক আলোচনার পরও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পাদিত অনেক চুক্তি শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। এই তত্ত্ব সংঘাতের কারণ হিসেবে দুর্বল কূটনীতি, অস্পষ্ট ভাষা বা অকার্যকর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নয়; বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত নৈরাজ্যকে চিহ্নিত করে।

এমন এক বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কোনো সর্বময় বৈশ্বিক কর্তৃত্ব নেই, সেখানে কোনো রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে না। এই অনিশ্চয়তা জন্ম দেয় ভয়ের; ভয় সৃষ্টি করে নিরাপত্তাগত প্রতিযোগিতা; আর সেই প্রতিযোগিতা রাষ্ট্রগুলোকে আপেক্ষিক শক্তির পরিবর্তনের প্রতি সর্বদা সতর্ক থাকতে বাধ্য করে। কূটনীতি সাময়িকভাবে প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; কিন্তু যে কাঠামোগত বাস্তবতা এই প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়, তা অতিক্রম করতে পারে না।

এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ২০২৬ সালের জুন মাসে সম্পাদিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক কোনো ব্যর্থ শান্তি উদ্যোগ নয়; বরং এমন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সাময়িক সমঝোতা, যাদের কৌশলগত স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

অফেনসিভ রিয়ালিজমের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় প্রধানত ভুল বোঝাবুঝির কারণে নয়। বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরাজ্য, প্রতিপক্ষের ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্থায়ী অনিশ্চয়তা এবং টিকে থাকার অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয়তাই তাদেরকে শক্তি অর্জনের প্রতিযোগিতায় বাধ্য করে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রকৃত মুদ্রা প্রতিশ্রুতি নয়—শক্তি।

এই সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করেনি; পরিবর্তন করেনি উভয় পক্ষের কৌশলগত প্রণোদনাও। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কখনোই কেবল হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল পারস্য উপসাগরে এমন কোনো আঞ্চলিক শক্তির উত্থান রোধ করা, যা এককভাবে এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে কিংবা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরকে ভূরাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অফেনসিভ রিয়ালিজমের ভাষায় এটি একটি সুসংহত মহাকৌশলের বা গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির অংশ। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে রাখা এবং কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকে আঞ্চলিক প্রাধান্যকে বৈশ্বিক কৌশলগত সুবিধায় রূপান্তর করতে না দেওয়া।

অন্যদিকে ইরানের কৌশলগত হিসাব এর সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি। ভূগোল তেহরানকে এমন এক সুপ্ত স্ট্র্যাটেজিক শক্তি দিয়েছে, যা মিয়ারশাইমারের বিশ্লেষণে বিরল কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। হরমুজ প্রণালি কেবল একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ নয়; এটি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লিভারেজ। যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল প্রচলিত সামরিক শক্তির মুখোমুখি হয়ে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই অ্যাসিমেট্রিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নিজস্ব ডিটারেন্স জোরদার করেছে। প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক নৌ-চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা; অথবা সেই সক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি—ইরানের অন্যতম মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ। ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ছাড়াই ইরানকে এই লিভারেজ ত্যাগ করতে বলা বাস্তবতার বিচারে অবাস্তব প্রত্যাশাই ছিল।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সমঝোতা স্মারকের বিধানগুলোতেই এই কাঠামোগত দ্বন্দ্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। ওয়াশিংটনের কাছে অবাধ নৌ-চলাচল ছিল এমন একটি আন্তর্জাতিক জনস্বার্থ, যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-প্রাধান্য। অন্যদিকে, তেহরানের দৃষ্টিতে একই বিধান ছিল উপকূলবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে তার সার্বভৌম অধিকার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বীকৃতির প্রশ্ন। অফেনসিভ রিয়ালিজমের আলোকে এই ভিন্ন আইনি ব্যাখ্যাগুলো মূল সংঘাতের কারণ ছিল না; বরং গভীরতর কৌশলগত বাস্তবতার এপিফেনমেনা, অর্থাৎ গভীরতর কাঠামোগত বাস্তবতার উপপ্রপঞ্চ বা বহিঃপ্রকাশ ছিল। প্রকৃত বিরোধ ছিল পারস্য উপসাগরে শক্তির বণ্টন, প্রতিরোধক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে। আইনি বিতর্ক সেই মৌলিক শক্তির উৎসকে নিয়ে নয় বরং রাজনীতির বহিঃপ্রকাশকে নিয়ে।

এই পার্থক্যটি অফেনসিভ রিয়ালিজম বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক চুক্তি, আইনি নীতিমালা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান—এসবকে মিয়ারশাইমার রাষ্ট্রের আচরণের স্বাধীন চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেন না। বরং এগুলো নির্দিষ্ট সময়ের শক্তির ভারসাম্য ও কৌশলগত বাস্তবতার প্রতিফলনমাত্র। রাষ্ট্রগুলো তাদের তৎকালীন স্বার্থ ও শক্তির অবস্থান অনুযায়ী চুক্তি সম্পাদন করে। কিন্তু যখন সেই কৌশলগত প্রণোদনা পরিবর্তিত হয় তখন কোনো চুক্তির ভাষা বা আইনি কাঠামো সহযোগিতাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। সেই অর্থে, এই সমঝোতা স্মারক বিদ্যমান শক্তির ভারসাম্যকে প্রতিফলিত করেছিল; নতুন কোনো শক্তির ভারসাম্য সৃষ্টি করেনি।

অর্থনৈতিক বিধানগুলোর ক্ষেত্রেও একই কাঠামোগত সংকট বিদ্যমান ছিল। নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, পুনর্গঠন সহায়তা এবং জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করে দেওয়াকে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু অফেনসিভ রিয়ালিজমে আস্থা সহযোগিতার কারণ নয়; বরং সহযোগিতা সম্ভব হলে তার ফল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রগুলো সহযোগিতাকে পরিমাপ করে কেবল মোট লাভের ভিত্তিতে নয়, বরং আপেক্ষিক লাভের বিচারে।

ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে। অপরদিকে, তেহরানের উদ্বেগ ছিল—শর্তসাপেক্ষ নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ গ্রহণ করলে তার অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ফলে যে অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো আপাতদৃষ্টিতে উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক ছিল, সেগুলোই একই সঙ্গে উভয় রাষ্ট্রের কাছে আপেক্ষিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

এর ফল ছিল অফেনসিভ রিয়ালিজমের ভাষায় এক ধ্রুপদি নিরাপত্তাগত প্রতিযোগিতা। একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে, প্রতিপক্ষ সেটিকেই নিজের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। যেহেতু কোনো রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে না, তাই সীমিত মাত্রার ছাড়ও ভবিষ্যৎ দুর্বলতার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। এই অনিশ্চয়তা থেকেই জন্ম নেয় ভয়; আর সেই ভয়ই নিরাপত্তাগত প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তোলে। ফলত সাময়িক সহযোগিতা সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী পারস্পরিক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

সমঝোতা স্মারকটি নিজেই ছিল একটি উপপ্রপঞ্চ বা এপিফেনমেনা—একটি স্বল্পস্থায়ী কৌশলগত ভারসাম্যের কূটনৈতিক বহিঃপ্রকাশ; নিজস্ব কোনো স্বাধীন পরিবর্তন সৃষ্টিকারী শক্তি নয়। এর স্থায়িত্ব ভাষার সূক্ষ্মতা, আইনি নিখুঁততা কিংবা কূটনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছিল না; বরং নির্ভর করছিল সেই শক্তির ভারসাম্যের ওপর, যার ভিত্তিতে এটি গড়ে উঠেছিল।

এই বাস্তবতার আলোকে বিচার করলে, সমঝোতা স্মারকটি প্রকৃত অর্থে কোনো শান্তিচুক্তি ছিল না; বরং একটি সাময়িক কৌশলগত বিরতি। এটি সাময়িকভাবে উত্তেজনা প্রশমনের রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছিল বটে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো সমাধান দেয়নি। পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা কাঠামো কে নির্ধারণ করবে? হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার চূড়ান্ত গ্যারান্টর কে হবে? এবং সর্বোপরি, এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য কার পক্ষে থাকবে? শক্তির বণ্টনে মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলে কেবল কূটনৈতিক ভাষা দিয়ে এসব প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ফলে সহযোগিতার প্রতিটি পর্যায় অনিবার্যভাবেই অস্থায়ী থেকে যায়।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরবর্তী বিরোধগুলোকে তাই কেবল সমঝোতা বাস্তবায়নের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এগুলো ছিল বিদ্যমান কাঠামোগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধ, পারস্পরিক সামরিক প্রতিক্রিয়া এবং একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ—এসব কোনো কূটনৈতিক অদক্ষতার ফল ছিল না; বরং দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত বাস্তবতারই প্রতিফলন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান—কোনো পক্ষই এমন কোনো মৌলিক ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়, যা তার আপেক্ষিক শক্তি বা প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

সমগ্র সংকটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এটিই যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরান—উভয়েই নিজেদেরকে সমঝোতা স্মারকের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে দাবি করেছে, আবার একই সঙ্গে অপর পক্ষকে সেই স্মারক লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে। উদার প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদের অনুসারীরা হয়তো বলবেন, এটি দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অপর্যাপ্ত যাচাইব্যবস্থা কিংবা কার্যকর বিরোধ-নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার অভাবের ফল। কিন্তু অফেনসিভ রিয়ালিজম সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করে।

মিয়ারশাইমারের মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, চুক্তি কিংবা সমঝোতা নিজেই এক ধরনের উপপ্রপঞ্চ বা এপিফেনমেনা। এগুলো রাষ্ট্রের আচরণকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে না; বরং বিদ্যমান শক্তির বণ্টন ও কৌশলগত বাস্তবতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরবিরোধী নিরাপত্তাগত লক্ষ্য অনুসরণ করবে, ততক্ষণ কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বা চুক্তিই তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতায় বাধ্য করতে পারবে না। সমঝোতা স্মারকটি কেবল একটি সাময়িক স্বার্থ-সমাপতনকে লিপিবদ্ধ করেছিল; এটি সেই স্বার্থগুলোর উৎস কিংবা কৌশলগত যুক্তিকে পরিবর্তন করেনি।

এই বাস্তবতার তাৎপর্য পারস্য উপসাগরের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র এখনও এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর, যেখানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর কোনো বৈরী শক্তির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে যাবে না। অন্যদিকে, ইরানও সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং কৌশলগত গুরুত্ব যেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া না যায়।

এসব লক্ষ্য মূলত কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা কূটনৈতিক ভাষার ফল নয়। এগুলো উদ্ভূত হয়েছে ভূগোল, বস্তুগত সামর্থ্য এবং একটি নৈরাজ্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের টিকে থাকার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা থেকে। ব্যক্তি পরিবর্তিত হতে পারে, সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, এমনকি কূটনৈতিক ভাষাও পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত প্রণোদনা অপরিবর্তিত থাকলে রাষ্ট্রের মৌলিক কৌশলগত আচরণও খুব কমই পরিবর্তিত হয়।

সুতরাং, ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক সেই কাঠামোগত বাস্তবতার কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়নি। সর্বোচ্চ যা করেছে, তা হলো সংঘাতের তাৎক্ষণিক প্রকাশকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে। কিন্তু অন্তর্নিহিত কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা অক্ষুণ্ণই থেকেছে।

অফেনসিভ রিয়ালিজমের ভাষায়, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সুচারুভাবে রচিত কূটনৈতিক দলিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় না; প্রতিষ্ঠিত হয় একটি স্থিতিশীল এবং পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত শক্তির ভারসাম্যের ওপর। যেখানে সেই ভারসাম্য অনুপস্থিত, সেখানে আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটাতে পারে না; সর্বোচ্চ যা করতে পারে, তা হলো সাময়িকভাবে তার গতি ও রূপ নিয়ন্ত্রণ করা।

এই অর্থে সমঝোতা স্মারকটি নিজেই ছিল একটি উপপ্রপঞ্চ বা এপিফেনমেনা—একটি স্বল্পস্থায়ী কৌশলগত ভারসাম্যের কূটনৈতিক বহিঃপ্রকাশ; নিজস্ব কোনো স্বাধীন পরিবর্তন সৃষ্টিকারী শক্তি নয়। এর স্থায়িত্ব ভাষার সূক্ষ্মতা, আইনি নিখুঁততা কিংবা কূটনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছিল না; বরং নির্ভর করছিল সেই শক্তির ভারসাম্যের ওপর, যার ভিত্তিতে এটি গড়ে উঠেছিল। আর যখন সেই ভারসাম্য টলতে শুরু করল, তখন সমঝোতার রাজনৈতিক ভিত্তিও অনিবার্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল।

অতএব ২০২৬ সালের জুন মাসের এই সমঝোতা স্মারককে একটি ব্যর্থ শান্তি উদ্যোগ হিসেবে দেখা যথার্থ হবে না। বরং এটি ছিল এমন দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সাময়িক সমন্বয়, যাদের মৌলিক কৌশলগত লক্ষ্য, নিরাপত্তাগত অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পরস্পরের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক ছিল। অফেনসিভ রিয়ালিজম এমন ফলাফলকেই প্রত্যাশা করে। কারণ, শক্তির ভারসাম্য যখন নিরাপত্তাগত স্বার্থকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, তখন কূটনীতি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সাময়িকভাবে প্রশমিত করতে পারে বটে, কিন্তু তাকে বিলুপ্ত করতে পারে না।

এই ঘটনাপ্রবাহের শিক্ষা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সমগ্র আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি মৌলিক সত্যকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় স্থায়ী শান্তি কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক আশাবাদ কিংবা সুপরিকল্পিত চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। শান্তির প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে এমন একটি শক্তির ভারসাম্যের ওপর, যা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য এবং পারস্পরিকভাবে নিরুৎসাহমূলক। সেই ভারসাম্য অনুপস্থিত থাকলে আন্তর্জাতিক চুক্তি সাধারণত প্রতিযোগিতার অবসান ঘটায় না; বরং প্রতিযোগিতার দুটি পর্যায়ের মধ্যবর্তী একটি বিরতিতে পরিণত হয়।

মিয়ারশাইমারের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ট্র্যাজেডি এখানেই। রাষ্ট্রসমূহ প্রায়ই সংঘাত চায় না; কিন্তু এমন একটি নৈরাজ্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামোতে তারা পরিচালিত হয়, যেখানে অন্যের অভিপ্রায় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাই অনেক সময় নতুন অনিরাপত্তার জন্ম দেয়। এই নিরাপত্তা-দ্বিধা থেকেই প্রতিযোগিতা, অস্ত্রসঞ্চয়, অবিশ্বাস এবং সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঘটে। সুতরাং সমস্যার উৎস কোনো একক নেতা, সরকার বা কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়; সমস্যার উৎস নিহিত রয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত প্রকৃতির মধ্যেই।

অতএব, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে কোনো নতুন সমঝোতা স্মারকের ভাষা দ্বারা নয়; বরং পারস্য উপসাগরে শক্তির ভারসাম্য কীভাবে পরিবর্তিত হয়, উভয় রাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা কীভাবে বিকশিত হয়, এবং তাদের নিরাপত্তাগত প্রণোদনা কোন দিকে অগ্রসর হয়—তার দ্বারা।

অফেনসিভ রিয়ালিজমের ভাষায় বলা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কূটনীতি কখনো অপ্রয়োজনীয় নয়; কিন্তু তার কার্যকারিতার সীমানা নির্ধারণ করে শক্তি। প্রতিশ্রুতি হয়তো সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে কেবল এমন একটি শক্তির ভারসাম্য, যা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাগত উদ্বেগকে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম।

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)
Ad 300x250

সম্পর্কিত