কে এম মহিউদ্দিন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি একটি প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে—কোনো সংসদ সদস্য গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগে নিজ রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত হলে কি তাঁর সংসদ সদস্যপদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অভিযোগের পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে এই প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে।
এর আগে ২০২১ সালে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসান বিতর্কিত ও অশালীন মন্তব্যের কারণে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেও তাঁর সংসদ সদস্যপদ বহাল ছিল। দুটি ঘটনাই একই প্রশ্ন উত্থাপন করে—সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলনের শাস্তি কী এবং সেই শাস্তি নির্ধারণের ক্ষমতা কার?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই সংসদের মর্যাদা সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কান সংসদকে কখনোই কেবল একটি প্রশাসনিক ভবন হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে এটি ছিল একটি জাতির নৈতিক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতীক। প্রকৃতি, আলো এবং স্থানের অনন্য ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এমন একটি পরিবেশ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে আইন প্রণয়ন কেবল রাজনৈতিক কাজ নয়, বরং একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও প্রতিভাত হবে। সম্ভবত সে কারণেই জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার ও সংসদ সদস্যরা সংসদকে প্রায়শই “মহান সংসদ” বলে সম্বোধন করেন।
এই প্রেক্ষাপটে কোনো সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি সংসদ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত। জনগণ যাঁদের আইন প্রণয়ন এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পণ করেন, তাঁদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণের প্রত্যাশা থাকে। ফলে দুর্নীতি, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা তথ্য প্রদান, সংসদীয় আচরণবিধি লঙ্ঘন কিংবা অন্য কোনো অনৈতিক আচরণ শুধু আইনভঙ্গ নয়; এটি সংসদের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তবে নৈতিক স্খলনের শাস্তি সব দেশে এক নয়। অনেক সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক আচরণবিধি (কোড অব কনডাক্ট), এথিকস কমিটি বা স্ট্যান্ডার্ডস কমিটি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী তিরস্কার, ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ, সাময়িক বরখাস্ত, সংসদীয় কমিটি থেকে অপসারণ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সংসদ থেকে বহিষ্কারেরও সুপারিশ করতে পারে। তবে এই ক্ষমতার পরিধি সংশ্লিষ্ট দেশের সংবিধান, সংসদীয় বিশেষাধিকার এবং কার্যপ্রণালি-বিধির ওপর নির্ভর করে।
উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের কথা বলা যায়। ঐতিহাসিকভাবে হাউস অব কমন্সের সদস্য বহিষ্কারের ক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেই ক্ষমতা খুব কমই প্রয়োগ করা হয়। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য সাময়িক বরখাস্ত, পদত্যাগ অথবা ‘রিকল অব এমপিজ অ্যাক্ট ২০১৫’-এর অধীনে ভোটারদের মাধ্যমে সদস্যপদ প্রত্যাহারের ব্যবস্থা বেশি ব্যবহৃত হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী বহিষ্কারের সাধারণ ক্ষমতা নেই; তবে সাময়িক বরখাস্তের বিধান রয়েছে। কানাডাতেও সংসদের শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতা থাকলেও স্থায়ী বহিষ্কার অত্যন্ত বিরল। অন্যদিকে ভারতে সংসদ থেকে সদস্য বহিষ্কারের ক্ষমতার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক ও সংসদীয় ঐতিহ্য রয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রথম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৯৫১ সালে, যখন লোকসভার সদস্য এইচ. জি. মুডগাল সংসদ সদস্যপদের অপব্যবহারের অভিযোগে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির তদন্তের ভিত্তিতে বহিষ্কৃত হন। সংবিধানে পার্লামেন্ট কর্তৃক সদস্য বহিষ্কারের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বিধান না থাকলেও একটি সার্বভৌম আইনসভা হিসেবে সংসদের নিজস্ব মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে। ভারতীয় সংসদের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে ২৩ ডিসেম্বর ২০০৫ সালে। 'ক্যাশ ফর কোয়েশ্চেনস' কেলেঙ্কারিতে অর্থের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন উত্থাপনের অভিযোগে লোকসভার ১০ জন এবং রাজ্যসভার একজন সদস্যসহ মোট ১১ জন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়।
এই ঘটনায় পরবর্তীকালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘রাজা রাম পাল ভার্সেস স্পিকার, লোকসভা (২০০৭)’ মামলায় সংসদের সদস্য বহিষ্কারের সাংবিধানিক ক্ষমতা স্বীকৃতি দিয়ে বলেন যে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৫-এ স্বীকৃত সংসদীয় বিশেষাধিকার (পার্লিয়ামেন্টারি প্রিভিলেজেস)-এর অংশ হিসেবে সংসদের নিজস্ব মর্যাদা, সততা ও কার্যকারিতা রক্ষার স্বার্থে সদস্য বহিষ্কারের ক্ষমতা বিদ্যমান। তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করে যে, এ ক্ষমতা সীমাহীন নয়; সংসদের সিদ্ধান্ত যদি সংবিধানবিরোধী, বিদ্বেষপ্রসূত বা সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করে, তাহলে তা বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত হবে।
সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলন বা অপরাধের শাস্তিকে সাধারণভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়—সংসদীয় শাস্তি, আইনগত বা ফৌজদারি শাস্তি এবং রাজনৈতিক শাস্তি। সংসদীয় গণতন্ত্রে এ তিনটি ব্যবস্থা পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং অপরাধের প্রকৃতি ও গুরুত্ব অনুযায়ী একাধিক শাস্তি একই সঙ্গে কার্যকর হতে পারে। প্রথমত, সংসদের নিজস্ব বিশেষাধিকার (পার্লিয়ামেন্টারি প্রিভিলেজেস) ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে তিরস্কার, ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অধিবেশন থেকে সাময়িক বরখাস্ত, সংসদীয় কমিটি থেকে অপসারণ এবং কিছু দেশে গুরুতর ক্ষেত্রে সংসদ থেকে বহিষ্কার।
তবে কোনো সদস্যকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার বা তাঁর আসন শূন্য ঘোষণার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট দেশের সংবিধান, সংসদীয় বিশেষাধিকার এবং কার্যপ্রণালি-বিধির ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, কোনো সংসদ সদস্য যদি দুর্নীতি, ঘুস, জালিয়াতি, অর্থপাচার, যৌন অপরাধ, হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হন, তাহলে তিনি অন্য যে কোনো নাগরিকের মতোই আইনের অধীন। আদালতে দোষী সাব্যস্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাদণ্ড প্রাপ্ত হলে তিনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হন এবং সংবিধান বা নির্বাচনী আইনের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যপদও হারাতে পারেন। কোথাও দণ্ডপ্রাপ্ত, কোথাও দেউলিয়াত্ব, নাগরিকত্ব হারানো, স্বার্থের সংঘাত বা দলত্যাগ সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাস্তি হলো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা। সংসদীয় গণতন্ত্রে ভোটাররাই সর্বোচ্চ প্রিন্সিপাল, আর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের এজেন্ট। ফলে কোনো সংসদ সদস্য জনগণের আস্থা হারালে পরবর্তী নির্বাচনে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা ভোটারদের হাতেই থাকে। একইভাবে রাজনৈতিক দলও মনোনয়ন না দেওয়া, দলীয় পদ থেকে অপসারণ বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ করতে পারে।
এ ছাড়া বিশ্বের অনেক সংসদে আচরণবিধি, এথিকস কমিটি বা স্ট্যান্ডার্ডস কমিটি কার্যকর রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সদস্যদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজন হলে স্বার্থের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলা, ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা স্থগিত করা কিংবা সংসদীয় শাস্তির সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখে। এসব ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; বরং সংসদের মর্যাদা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখা।
বাংলাদেশের সংবিধান সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলন বা অপরাধের প্রশ্নে দুটি ভিন্ন বিষয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করেছে। একদিকে রয়েছে ফৌজদারি অপরাধের কারণে সদস্যপদের অযোগ্যতা, অন্যদিকে রয়েছে দলত্যাগ বা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ফলে আসন শূন্য হওয়ার বিধান। ফলে কোনো সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই তাঁর সংসদ সদস্যপদ যাবে কি না, তার উত্তর খুঁজতে হবে সংবিধানের ৬৬, ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে। সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রাপ্ত হলে এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য থাকবেন না।
একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৬৭(১)(ঘ) অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এ ধরনের অযোগ্যতা সৃষ্টি হলে তাঁর আসন শূন্য হবে। অর্থাৎ, শুধু নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়; অপরাধটির জন্য কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডও হতে হবে। দুই বছরের কম সাজা হলে অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ঘ)-এর অযোগ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না। তবে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু অন্য একটি প্রশ্ন সামনে আসে—কোনো সংসদ সদস্যকে তাঁর রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করলে কি তাঁর সংসদ সদস্যপদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের দিকে তাকাতে হয়। বাংলাদেশে এই অনুচ্ছেদ সাধারণত 'ফ্লোর ক্রসিং'-বিরোধী বিধান হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তান আমলে ঘন ঘন দলত্যাগ ও সরকার পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানে এই বিধান সংযোজন করা হয়। অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী, কোনো সদস্য যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি যদি স্বেচ্ছায় সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিধানটি আরও কঠোর করা হলেও ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর তা মূলত ১৯৭২ সালের অবস্থায় ফিরে আসে। বর্তমানে একজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ কিংবা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোটদানই প্রধান সাংবিধানিক ভিত্তি।
এখানেই বর্তমান বিতর্কের মূল বিষয়টি নিহিত। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে 'দল থেকে পদত্যাগ'-এর কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কিন্তু 'দল কর্তৃক বহিষ্কার'-এর কোনো উল্লেখ নেই। ফলে কেবল দলীয় বহিষ্কারের কারণে কোনো সংসদ সদস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সদস্যপদ হারাবেন—এমন বিধান সংবিধানে নেই।
এ কারণেই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সাংবিধানিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে দলীয় বহিষ্কারের কোনো রাজনৈতিক পরিণতি নেই। দলীয় সমর্থন হারানো, জনসমালোচনার মুখে পড়া, নির্বাচনী এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া, এসব কারণে সংশ্লিষ্ট সদস্যের ওপর পদত্যাগের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অতীতেও বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক চাপের মুখে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগের নজির রয়েছে।
বাংলাদেশে সংসদ সদস্যের অপরাধের বিচার সাধারণ ফৌজদারি আইনেই হয়। পাশাপাশি সংবিধানের ৬৬, ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদ সদস্যপদ হারানোর সাংবিধানিক ভিত্তি নির্ধারণ করে। কিন্তু উন্নত সংসদীয় গণতন্ত্রের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় আচরণবিধি, স্বাধীন সংসদীয় কমিশনার ফর স্ট্যান্ডার্ডস, শক্তিশালী ইথিকস কমিটি কিংবা ভোটারদের উদ্যোগে সদস্য প্রত্যাহারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনো বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যের নৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কেবল ফৌজদারি শাস্তিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সংসদের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা, কার্যকর আচরণবিধি, দলীয় শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি ভোটারদের রাজনৈতিক জবাবদিহিতার সমন্বিত কাঠামো। কারণ সংসদের মর্যাদা রক্ষা শুধু আইনের প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষারও প্রশ্ন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি একটি প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে—কোনো সংসদ সদস্য গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগে নিজ রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত হলে কি তাঁর সংসদ সদস্যপদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অভিযোগের পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে এই প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে।
এর আগে ২০২১ সালে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসান বিতর্কিত ও অশালীন মন্তব্যের কারণে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেও তাঁর সংসদ সদস্যপদ বহাল ছিল। দুটি ঘটনাই একই প্রশ্ন উত্থাপন করে—সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলনের শাস্তি কী এবং সেই শাস্তি নির্ধারণের ক্ষমতা কার?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই সংসদের মর্যাদা সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কান সংসদকে কখনোই কেবল একটি প্রশাসনিক ভবন হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে এটি ছিল একটি জাতির নৈতিক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতীক। প্রকৃতি, আলো এবং স্থানের অনন্য ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এমন একটি পরিবেশ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে আইন প্রণয়ন কেবল রাজনৈতিক কাজ নয়, বরং একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও প্রতিভাত হবে। সম্ভবত সে কারণেই জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার ও সংসদ সদস্যরা সংসদকে প্রায়শই “মহান সংসদ” বলে সম্বোধন করেন।
এই প্রেক্ষাপটে কোনো সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি সংসদ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত। জনগণ যাঁদের আইন প্রণয়ন এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পণ করেন, তাঁদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণের প্রত্যাশা থাকে। ফলে দুর্নীতি, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা তথ্য প্রদান, সংসদীয় আচরণবিধি লঙ্ঘন কিংবা অন্য কোনো অনৈতিক আচরণ শুধু আইনভঙ্গ নয়; এটি সংসদের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তবে নৈতিক স্খলনের শাস্তি সব দেশে এক নয়। অনেক সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক আচরণবিধি (কোড অব কনডাক্ট), এথিকস কমিটি বা স্ট্যান্ডার্ডস কমিটি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী তিরস্কার, ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ, সাময়িক বরখাস্ত, সংসদীয় কমিটি থেকে অপসারণ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সংসদ থেকে বহিষ্কারেরও সুপারিশ করতে পারে। তবে এই ক্ষমতার পরিধি সংশ্লিষ্ট দেশের সংবিধান, সংসদীয় বিশেষাধিকার এবং কার্যপ্রণালি-বিধির ওপর নির্ভর করে।
উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের কথা বলা যায়। ঐতিহাসিকভাবে হাউস অব কমন্সের সদস্য বহিষ্কারের ক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেই ক্ষমতা খুব কমই প্রয়োগ করা হয়। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য সাময়িক বরখাস্ত, পদত্যাগ অথবা ‘রিকল অব এমপিজ অ্যাক্ট ২০১৫’-এর অধীনে ভোটারদের মাধ্যমে সদস্যপদ প্রত্যাহারের ব্যবস্থা বেশি ব্যবহৃত হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী বহিষ্কারের সাধারণ ক্ষমতা নেই; তবে সাময়িক বরখাস্তের বিধান রয়েছে। কানাডাতেও সংসদের শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতা থাকলেও স্থায়ী বহিষ্কার অত্যন্ত বিরল। অন্যদিকে ভারতে সংসদ থেকে সদস্য বহিষ্কারের ক্ষমতার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক ও সংসদীয় ঐতিহ্য রয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রথম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৯৫১ সালে, যখন লোকসভার সদস্য এইচ. জি. মুডগাল সংসদ সদস্যপদের অপব্যবহারের অভিযোগে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির তদন্তের ভিত্তিতে বহিষ্কৃত হন। সংবিধানে পার্লামেন্ট কর্তৃক সদস্য বহিষ্কারের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বিধান না থাকলেও একটি সার্বভৌম আইনসভা হিসেবে সংসদের নিজস্ব মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে। ভারতীয় সংসদের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে ২৩ ডিসেম্বর ২০০৫ সালে। 'ক্যাশ ফর কোয়েশ্চেনস' কেলেঙ্কারিতে অর্থের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন উত্থাপনের অভিযোগে লোকসভার ১০ জন এবং রাজ্যসভার একজন সদস্যসহ মোট ১১ জন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়।
এই ঘটনায় পরবর্তীকালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘রাজা রাম পাল ভার্সেস স্পিকার, লোকসভা (২০০৭)’ মামলায় সংসদের সদস্য বহিষ্কারের সাংবিধানিক ক্ষমতা স্বীকৃতি দিয়ে বলেন যে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৫-এ স্বীকৃত সংসদীয় বিশেষাধিকার (পার্লিয়ামেন্টারি প্রিভিলেজেস)-এর অংশ হিসেবে সংসদের নিজস্ব মর্যাদা, সততা ও কার্যকারিতা রক্ষার স্বার্থে সদস্য বহিষ্কারের ক্ষমতা বিদ্যমান। তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করে যে, এ ক্ষমতা সীমাহীন নয়; সংসদের সিদ্ধান্ত যদি সংবিধানবিরোধী, বিদ্বেষপ্রসূত বা সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করে, তাহলে তা বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত হবে।
সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলন বা অপরাধের শাস্তিকে সাধারণভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়—সংসদীয় শাস্তি, আইনগত বা ফৌজদারি শাস্তি এবং রাজনৈতিক শাস্তি। সংসদীয় গণতন্ত্রে এ তিনটি ব্যবস্থা পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং অপরাধের প্রকৃতি ও গুরুত্ব অনুযায়ী একাধিক শাস্তি একই সঙ্গে কার্যকর হতে পারে। প্রথমত, সংসদের নিজস্ব বিশেষাধিকার (পার্লিয়ামেন্টারি প্রিভিলেজেস) ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে তিরস্কার, ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অধিবেশন থেকে সাময়িক বরখাস্ত, সংসদীয় কমিটি থেকে অপসারণ এবং কিছু দেশে গুরুতর ক্ষেত্রে সংসদ থেকে বহিষ্কার।
তবে কোনো সদস্যকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার বা তাঁর আসন শূন্য ঘোষণার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট দেশের সংবিধান, সংসদীয় বিশেষাধিকার এবং কার্যপ্রণালি-বিধির ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, কোনো সংসদ সদস্য যদি দুর্নীতি, ঘুস, জালিয়াতি, অর্থপাচার, যৌন অপরাধ, হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হন, তাহলে তিনি অন্য যে কোনো নাগরিকের মতোই আইনের অধীন। আদালতে দোষী সাব্যস্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাদণ্ড প্রাপ্ত হলে তিনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হন এবং সংবিধান বা নির্বাচনী আইনের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যপদও হারাতে পারেন। কোথাও দণ্ডপ্রাপ্ত, কোথাও দেউলিয়াত্ব, নাগরিকত্ব হারানো, স্বার্থের সংঘাত বা দলত্যাগ সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাস্তি হলো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা। সংসদীয় গণতন্ত্রে ভোটাররাই সর্বোচ্চ প্রিন্সিপাল, আর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের এজেন্ট। ফলে কোনো সংসদ সদস্য জনগণের আস্থা হারালে পরবর্তী নির্বাচনে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা ভোটারদের হাতেই থাকে। একইভাবে রাজনৈতিক দলও মনোনয়ন না দেওয়া, দলীয় পদ থেকে অপসারণ বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ করতে পারে।
এ ছাড়া বিশ্বের অনেক সংসদে আচরণবিধি, এথিকস কমিটি বা স্ট্যান্ডার্ডস কমিটি কার্যকর রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সদস্যদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজন হলে স্বার্থের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলা, ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা স্থগিত করা কিংবা সংসদীয় শাস্তির সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখে। এসব ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; বরং সংসদের মর্যাদা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখা।
বাংলাদেশের সংবিধান সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলন বা অপরাধের প্রশ্নে দুটি ভিন্ন বিষয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করেছে। একদিকে রয়েছে ফৌজদারি অপরাধের কারণে সদস্যপদের অযোগ্যতা, অন্যদিকে রয়েছে দলত্যাগ বা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ফলে আসন শূন্য হওয়ার বিধান। ফলে কোনো সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই তাঁর সংসদ সদস্যপদ যাবে কি না, তার উত্তর খুঁজতে হবে সংবিধানের ৬৬, ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে। সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রাপ্ত হলে এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য থাকবেন না।
একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৬৭(১)(ঘ) অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এ ধরনের অযোগ্যতা সৃষ্টি হলে তাঁর আসন শূন্য হবে। অর্থাৎ, শুধু নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়; অপরাধটির জন্য কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডও হতে হবে। দুই বছরের কম সাজা হলে অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ঘ)-এর অযোগ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না। তবে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু অন্য একটি প্রশ্ন সামনে আসে—কোনো সংসদ সদস্যকে তাঁর রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করলে কি তাঁর সংসদ সদস্যপদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের দিকে তাকাতে হয়। বাংলাদেশে এই অনুচ্ছেদ সাধারণত 'ফ্লোর ক্রসিং'-বিরোধী বিধান হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তান আমলে ঘন ঘন দলত্যাগ ও সরকার পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানে এই বিধান সংযোজন করা হয়। অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী, কোনো সদস্য যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি যদি স্বেচ্ছায় সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিধানটি আরও কঠোর করা হলেও ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর তা মূলত ১৯৭২ সালের অবস্থায় ফিরে আসে। বর্তমানে একজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ কিংবা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোটদানই প্রধান সাংবিধানিক ভিত্তি।
এখানেই বর্তমান বিতর্কের মূল বিষয়টি নিহিত। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে 'দল থেকে পদত্যাগ'-এর কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কিন্তু 'দল কর্তৃক বহিষ্কার'-এর কোনো উল্লেখ নেই। ফলে কেবল দলীয় বহিষ্কারের কারণে কোনো সংসদ সদস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সদস্যপদ হারাবেন—এমন বিধান সংবিধানে নেই।
এ কারণেই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সাংবিধানিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে দলীয় বহিষ্কারের কোনো রাজনৈতিক পরিণতি নেই। দলীয় সমর্থন হারানো, জনসমালোচনার মুখে পড়া, নির্বাচনী এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া, এসব কারণে সংশ্লিষ্ট সদস্যের ওপর পদত্যাগের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অতীতেও বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক চাপের মুখে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগের নজির রয়েছে।
বাংলাদেশে সংসদ সদস্যের অপরাধের বিচার সাধারণ ফৌজদারি আইনেই হয়। পাশাপাশি সংবিধানের ৬৬, ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদ সদস্যপদ হারানোর সাংবিধানিক ভিত্তি নির্ধারণ করে। কিন্তু উন্নত সংসদীয় গণতন্ত্রের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় আচরণবিধি, স্বাধীন সংসদীয় কমিশনার ফর স্ট্যান্ডার্ডস, শক্তিশালী ইথিকস কমিটি কিংবা ভোটারদের উদ্যোগে সদস্য প্রত্যাহারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনো বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যের নৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কেবল ফৌজদারি শাস্তিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সংসদের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা, কার্যকর আচরণবিধি, দলীয় শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি ভোটারদের রাজনৈতিক জবাবদিহিতার সমন্বিত কাঠামো। কারণ সংসদের মর্যাদা রক্ষা শুধু আইনের প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষারও প্রশ্ন।
.png)

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রভাবশালী তত্ত্ববিদ জন জে মিয়ারশাইমারের অফেনসিভ রিয়ালিজম ব্যাখ্যা করে কেন দীর্ঘ ও সতর্ক কূটনৈতিক আলোচনার পরও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পাদিত অনেক চুক্তি শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে।
২ ঘণ্টা আগে
আমার ব্যবসাকে যদি হিসাব রাখতে হয়, ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হয়, নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হয় এবং সরকারের কাছে তার আর্থিক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে সরকার কেন আমাকে একই মাত্রার জবাবদিহি দেবে না?
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক নিঃসঙ্গ শেরপা তাজউদ্দীন আহমদ। যাঁর প্রজ্ঞা, পারদর্শিতা, দরকষাকষির ক্ষমতা, তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা এবং কুশলী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করেছিল।
৭ ঘণ্টা আগে
কল্পনা করুন, আপনি স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় হাঁটছেন কিংবা কোনো যানবাহনে করে কোথাও যাচ্ছেন। এমন সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা আপনাকে থামালেন। তাঁর সন্দেহ, আপনার কাছে মাদক থাকতে পারে। শুরু হলো তল্লাশি। ব্যাগের প্রতিটি অংশ, পকেট, সবকিছু খুঁজে দেখা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো মাদক পাওয়া গেল না।
৮ ঘণ্টা আগে