এ কেমন বইপড়া কর্মসূচি

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ১৮
গ্রাফিক: এআই দিয়ে তৈরি
গ্রাফিক: এআই দিয়ে তৈরি

সরকার ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে ‘দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম ২০২৬’ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। পাঠ্যবইয়ের বাইরে নানা ধরনের বই পড়ার সুযোগ তৈরি করার এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক ও পাঠমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই পাইলট কার্যক্রম। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যসূচির বাইরে বই পড়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। এমন একটি উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি বইয়ের প্রতি তাদের আগ্রহও বাড়াতে পারে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ২৫টি বই নির্ধারণ করা হয়েছে, বইয়ের মোট পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার কপি। মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য নির্ধারিত বই ৪৮টি। এই বইয়ের পরিমাণও ১ লাখ ৮০ হাজার কপি।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত ৪৮টি বই মোট আটটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে কেনা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নিজস্ব প্রকাশনা থেকে ২৯টি বই নেওয়া হয়েছে। আবার, একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকেই আটটি বই কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাকি বইগুলো কোন কোন প্রকাশনা থেকে এবং কী প্রক্রিয়ায় নির্বাচন ও কেনা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

একটি ভালো উদ্যোগের সাফল্য শুধু তার উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেটি কতটা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরও। আর এখানেই বই নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে।

অনেক প্রকাশক অভিযোগ করেছেন, কোনো বিজ্ঞপ্তি বা দরপত্রের মাধ্যমে তাদের বই সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বই নির্বাচন করে সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

এই তাড়াহুড়োর প্রয়োজন কতটা ছিল, আর প্রকাশকদের অংশগ্রহণের সুযোগ কী প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা হয়েছে; তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

কোন বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাবে, সেই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বই শুধু পণ্য নয়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য নির্বাচিত বই তাদের চিন্তা, কল্পনা, ইতিহাসবোধ, সমাজবোধ ও মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রাখে। তাই বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে যথাযথ মানদণ্ড ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রশ্ন হলো, কীভাবে, কোন নীতিমালা বা মানদণ্ডের ভিত্তিতে বই নির্বাচন করা হয়েছে। নির্বাচিত বইগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করাও প্রয়োজন। এতে বোঝা যাবে, কোন ধরনের বইকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও জ্ঞানভিত্তিক বইয়ের ক্ষেত্রে কতটা বৈচিত্র্য রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, কীভাবে, কোন নীতিমালা বা মানদণ্ডের ভিত্তিতে বই নির্বাচন করা হয়েছে। নির্বাচিত বইগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করাও প্রয়োজন। এতে বোঝা যাবে, কোন ধরনের বইকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও জ্ঞানভিত্তিক বইয়ের ক্ষেত্রে কতটা বৈচিত্র্য রাখা হয়েছে।

বই নির্বাচনের সঙ্গে প্রকাশকের বিষয়টিও যুক্ত। বহু প্রকাশক দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য বই প্রকাশ করছেন। কেউ বড় পরিসরে কাজ করছেন, আবার কেউ সীমিত সামর্থ্য নিয়ে নতুন বই প্রকাশ করছেন। জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি কর্মসূচিতে এসব প্রকাশকের অংশগ্রহণের সুযোগ কতটা উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক ছিল, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বই নির্বাচন করে, প্রকাশক নির্বাচন করে না। বইটি কর্মসূচির জন্য যথাযথ কিনা, সেটিই বিবেচনা করা হয়। বইটির প্রকাশক কে, তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় বা চরিত্র কী; এসব জানা বা বিবেচনা করা সম্ভব হয় না।

সূচীপত্র প্রকাশনার প্রধান নির্বাহী ও সৃজনশীল বই প্রকাশক সমিতির সভাপতি সাঈদ বারী বলেন, সৃজনশীল প্রকাশকদের দাবি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। যোগ্যতা, মান ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বই নির্বাচন করতে হবে। বই নির্বাচনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।

সাঈদ বারী বলেন, নির্বাচিত বইয়ের তালিকা ও ক্রয়সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশ করলে বিতর্কের অবসান হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সরকারি বই ক্রয় ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার কর্মসূচিতে স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।

কলি প্রকাশনার প্রকাশক এস এম মহির উদ্দিন কলি বলেন, প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচি’, কিন্তু ভেতরে চলছে নিজেদের আখের গোছানোর মহোৎসব। আটটি প্রকাশনীর মধ্যে ২৯টি বই-ই যদি বাস্তবায়নকারী নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের হয়, তবে এটাকে ‘বইপড়া প্রকল্প’ না বলে ‘নিজের বই বেচা বরাদ্দ’ বলাই ভালো। ‘পাইলট প্রজেক্ট’-এর অজুহাত দেখিয়ে উন্মুক্ত বিজ্ঞাপন না দিয়ে কোটি কোটি টাকার বই কিনে সরকারি অর্থ লুটপাটের এ এক পুরাতন কায়দা।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকারি বই ক্রয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু প্রকাশক সুবিধা পেয়েছেন, আবার কেউ বঞ্চিত হয়েছেন। এবারও রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু প্রকাশক সুযোগ পেয়েছেন বলে আলোচনা রয়েছে।

বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে কোনোভাবেই বিবেচনার বিষয় করা উচিত নয়। কোনো লেখকের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ভালো বই বাদ পড়বে না, আবার ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে মানহীন বইও তালিকায় স্থান পাবে না। বইয়ের মান, বিষয়বস্তু ও শিক্ষার্থীদের উপযোগিতাই হওয়া উচিত বই নির্বাচনের প্রধান ভিত্তি।

এই কর্মসূচি যেন কোনো বিশেষ লেখক, প্রকাশক বা প্রতিষ্ঠানের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগে পরিণত না হয়। সরকারি উদ্যোগে বই কেনার পরিধি স্বাভাবিকভাবেই বড়। ফলে এতে সুযোগ পাওয়া একজন প্রকাশকের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া প্রকাশকদের জন্য তা উদ্বেগের কারণ।

জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি কর্মসূচিতে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি নতুন ও সম্ভাবনাময় লেখকদের বইও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা সমকালীন লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং প্রকাশনা জগতেও নতুন সৃষ্টিশীলতার উৎসাহ তৈরি হবে। পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার একটি জাতীয় কর্মসূচিতে এই বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি ভালো উদ্যোগের সাফল্য শুধু তার উদ্দেশ্যের ওপর নয়, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপরও নির্ভর করে। বই নির্বাচনে স্বচ্ছতা, প্রকাশকদের জন্য সমান সুযোগ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ‘দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচি’ শুধু একটি সরকারি প্রকল্প হয়ে থাকবে না; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার একটি স্থায়ী জাতীয় উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।

  • হানিফ রাশেদীন: কবি ও সাংবাদিক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত